সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার। তার পর থেকে আজ অবধি কোথাও রাজ্যে জমি অধিগ্রহণের রাস্তায় হাঁটেনি সরকার। তবে কেউ জমি অধিগ্রহণ করলে, তাতে সাহায্য করা হবে বলে সরকার জানিয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে সরকার জমি অধিগ্রহণের বিরোধী বলেই পরিচিত।
সেই জমি জটেই আটকে পড়েছে বাগডোগরা বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ, আধুনিকীকরণের কাজও। এই বিমানবন্দরের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু বিমানবন্দরটি আধুনিকীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি এখনও পায়নি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। রাজ্য সরকারকে জানানো সত্ত্বেও জমি অধিগ্রহণ হচ্ছে না বিমানবন্দর এলাকায়। কবে জট খুলবে, তার আশা এখনও দেখতে পাচ্ছেন না এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (এএআই) অফিসারেরাও। তবে বিমানযাত্রীদের চাপ বাড়তে থাকায় শেষ অবধি পুরানো টার্মিনাল ভবনের অদলবদল, কিছু নির্মাণ কাজ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা শুরু করল এএআই কতৃর্পক্ষ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে নতুন কাজের শিলান্যাসের পরে এএআই-র রিজিওনাল এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর শুদ্ধসত্ত্ব ভাদুড়ি জানিয়েও দিয়েছেন, নতুন টার্মিনাল ভবন দ্রুত দরকার। কিন্তু কবে জমি মিলবে, তা নিয়ে কিছু বলতে পারেননি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। তাঁর কথায়, ‘‘বাগডোগরা বিমানবন্দর এখনই সম্প্রসারিত করা দরকার। যাত্রী এবং বিমানের চাপ বাড়ছে বিমানবন্দরটিতে। গত বছর যাত্রী সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়েছে। আমরা প্রকল্প তৈরি করে রাজ্য সরকারের কাছে জমির জন্য বলে দিয়েছি। গত অক্টোবরে মুখ্যমন্ত্রীকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’’
তিনি জানান, তাঁরা ৭৮ একরের উপরে নতুন টার্মিনাল ভবন, পার্কিং, ছোট হোটেল, এয়ার ব্রিজ-সহ নানা পরিকাঠামো তৈরি করবেন। ৩০০ কোটি টাকা কেন্দ্র বরাদ্দ করে দিয়েছে। কিন্তু রাজ্য সরকার অতটা জমি দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা নতুন করে ৫৮ একরের প্রকল্প তৈরি করি। দু’মাস আগে রাজ্য সরকারের কাছে তা জমাও দেওয়া হয়েছে। পিক আওয়ারে একই সময়ে এক হাজার যাত্রীর আসা ও যাওয়ার উপযুক্ত করে টার্মিনালটি তৈরি করা হবে। এখন তা মেরেকেটে ১৫০-২০০ থাকছে। এর পরে জানি না কী হবে। আমাদের প্রকল্পের সময়সীমা ২৮ মাস রাখা হয়েছে। দু’বছরে প্রকল্প খরচও বেড়ে যেতে পারে।’’ আর টাকা ফেরত চলে যাওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কে রিজিওনাল এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের বক্তব্য, ‘‘বেশি দেরি হলে তো মুশকিল। মন্ত্রক অন্য রকম চিন্তাভাবনাও করতে পারে। অনেক নতুন বিমানবন্দর, টার্মিনাল হচ্ছে। তখন কী হবে, বলতে পারছি না।’’
বাগডোগরায় জমি জটের সমস্যা নতুন কিছু নয়। বাম আমল থেকেই বিমানবন্দরের জমি নিয়ে জটিলতা চলছেই। বিশেষ করে রাতের বিমান ওঠানামা এবং কম দৃশ্যমানতার জন্য অ্যাপ্রোচ লাইট এবং ইনস্ট্রুমেন্টাল ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস) বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর জন্য ২১ একরের একটু বেশি জমি চিহ্নিত হয়। তার মধ্যে ১১ একর জমি বায়ুসেনার তরফ থেকে এএআইকে দিয়েছে। বাকি ১০ একরের মতো জমির মধ্যে মন্দির, বসতবাড়ি থাকায় তা নিয়েই জটিলতা শুরু হয়। ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসে। এতে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে পড়ে।
কয়েকমাস আগে দেড় একরের মতো জমির জট মিটেছে বলে প্রশাসন এবং এএআই-র অফিসারেরা দাবি করেন। যদিও সেই জমি এখনও পুরোপুরি দখলমুক্ত হয়নি। শুদ্ধসত্ত্ববাবুর কথায়, ‘‘আগামী জুন মাসে জমি আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। তার পরে আইএলএসের জন্য ছয় মাস মতো সময় লাগবে।’’
সরকারি সূত্রের খবর, এই জমির সঙ্গেই বিমানবন্দরটিকে আরও বড় করতে নতুন টার্মিনাল ভবন, পার্কিং-এর প্রকল্প তৈরি করে এএআই। এর মধ্যে আলাদা আলাদা ডোমেস্টিক, ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল ভবন তৈরি করা হবে। কিন্তু রাজ্য সরকারের জমির পরিমাণ কমাতে বলায় সমস্যায় পড়েছেন বলে এএআই-র অফিসারেরা জানিয়েছেন। নতুন পার্কিং এলাকাটি বাদই দেওয়া হয়। তাঁরা জানিয়েছেন, আপাতত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা দিয়ে বর্তমান ভবনেই দু’টি সিকিউরিটি হোল্ড এরিয়া, আর একটি এসকেলেটর, লাউঞ্জ, আরও কনভেয়ার বেল্ট বসবে। বাইরে রেস্তোরাঁ হবে। শুদ্ধসত্ত্ববাবু বলেন, ‘আমাদের আশা আরও আন্তর্জাতিক বিমান বাড়বে। গয়াকে কেন্দ্র করে যেমন বুদ্ধিস্ট ট্যুরিজম হচ্ছে। তেমনই এখানেও বাড়বে। চার্টাড ফ্লাইটও বাড়বে। তাই নতুন ব্যবস্থা দ্রুত দরকার।’’