অন্য কিছু কারণ থাকতে পারে। তবে চলতি মরসুমে শীতের মাথা তুলে দাঁড়াতে না-পারার মূলে যে ‘এল নিনো’, সেই বিষয়ে অনেক আবহবিদই একমত। সেই ‘দুষ্টু ছেলে’ এ বার সারা দেশের গ্রীষ্ম এবং বর্ষাকেও তালগোল পাকিয়ে দেবে কি না, সেই প্রশ্ন ভাবাচ্ছে আবহবিদদের।
এই দুষ্টু ছেলের দুরন্তপনায় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। সেই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধাক্কায় বিশ্ব জুড়ে ছন্দ নষ্ট হয়ে যায় গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতের। ‘এল নিনো’র প্রভাবে এলোমেলো হয়ে গিয়েছে আরবসাগর এবং বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়াও।
গত মরসুমে বর্ষার ছন্দপতন বা এ বার শীত নষ্ট হওয়ার পিছনে এল নিনো-র দুষ্টুমিকেই দায়ী করছেন আবহবিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদদের বড় অংশ। তাঁরা বলছেন, ‘এল নিনো’ তৈরি হলে প্রশান্ত মহাসাগরের বায়ুপ্রবাহের পরিস্থিতি বদলে যায়। তার ফলে এলোমেলো হয়ে যায় অন্য সব মহাসমুদ্রের হাওয়ার গতিপ্রকৃতিও। ফলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক চরিত্র যায় বিগড়ে। ছন্দ ভুল হয়ে যায় ঋতুচক্রের। আবহাওয়ার স্বাভাবিকতা নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট দেশের খাদ্যভাণ্ডারে টান তো পড়েই। সেই সঙ্গে মাত্রাছাড়া সক্রিয়তা দেখা যায় ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাসের মতো পরজীবীদের মধ্যেও। তার জেরে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গির প্রকোপ বাড়ে।
গত মে-জুনে পেরু উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। সেই থেকে তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত আছে। আবহবিদেরা বলছেন, গত বছর মে-জুন থেকে বাড়তে শুরু করেছিল এল নিনো-র দাপট। আমেরিকার আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা (ন্যাশনাল ওশেন অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা নোয়া) জানাচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগরে জলের গড় তাপমাত্রা এখন স্বাভাবিকের থেকে ৩.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস উপরে উঠে গিয়েছে। ১৯৯৭-’৯৮ সালে এই গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ২.৮ ডিগ্রি বেশি ছিল। সেই রেকর্ড ভেঙে এ বার নতুন নজির তৈরি হয়েছে। তাপমাত্রা আগামী দু’মাসে আরও বাড়তে পারে বলেই আবহবিদদের আশঙ্কা। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য বলছে, ২০১৫ ছিল গত ২০ বছরের মধ্যে উষ্ণতম বছর। এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠলে ২০১৬ ছাপিয়ে যেতে পারে ২০১৫-কে।
এ বার শীতের দফারফা করে দিয়েছে দুষ্টু ছেলে। গ্রীষ্ম ও বর্ষায় ঠিক কেমন ছাপ ফেলতে পারে সে?
এল নিনো-র দাপটে জিম্বাবোয়ে, ইথিওপিয়ায় তীব্র খরা হয়েছে। পাম তেলের উৎপাদন মার খেয়েছে মালয়েশিয়ায়। ভারতের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া মন্ত্রকের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনো তীব্রতর চেহারা নিলে গরমে তেতেপুড়ে যেতে পারে এই দেশও। এক আবহবিজ্ঞানী জানান, গত বছরই তীব্র তাপপ্রবাহে অন্ধ্রে প্রচুর লোকের মৃত্যু হয়। দুঃসহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল পূর্ব ভারতের অনেক জায়গাতেই। এল নিনো আরও শক্তিশালী হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
আবহবিদেরা কেউ কেউ বলছেন, ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই পশ্চিমবঙ্গ-সহ পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলেছে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে ৩২ ডিগ্রির মাত্রা। শুধু গ্রীষ্ম নয়, এল নিনোর দাপটে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে আগামী মরসুমের বর্ষা নিয়েও। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুগত হাজরা মনে করেন, ‘‘কেবল গরম নয়, আগামী বর্ষাকেও প্রভাবিত করতে পারে এল নিনো।’’ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক তপনকুমার জানার মন্তব্য, প্রশান্ত মহাসাগরে বায়ুপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি বিগড়ে গেলে তার প্রভাব বর্ষার উপরে পড়তেই পারে। ‘‘তবে ভারতের বর্ষার উপরে এল নিনো-র কতটা প্রভাব পড়ে বা পড়তে পারে, তা নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়নি। ফলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন,’’ বলছেন তপনবাবু। তাঁর মতে সায় দিচ্ছেন দিল্লির মৌসম ভবনের অনেক বিজ্ঞানীও।
এ দেশের ঋতুচক্রের স্বাভাবিক প্রবণতায় দেখা গিয়েছে, গ্রীষ্ম দুঃসহ হলে আনুপাতিক হারে বর্ষার দাপটও বাড়ে। তা হলে এল নিনো-র দাপটে গরম বেশি হলে বর্ষণ কৃপণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে কেন?
আবহবিজ্ঞানীদের একাংশের ব্যাখ্যা, গোটা দেশে বর্ষা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে জুনে আরবসাগর ও বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রার ফারাকটা বড় ভূমিকা নেয়। ওই সময় যদি বঙ্গোপসাগরের থেকে আরবসাগর বেশি গরম হয়, তা হলে দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বর্ষা। সুগতবাবু বলছেন, ‘‘২০১৫-র জুলাই-অগস্টে আরবসাগর ও বঙ্গোপসাগরের এই ফারাক বেশি হওয়ায় বর্ষা ভাল হয়েছিল। পরের দিকে ফারাক কমে যাওয়ায় বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।’’ আবহবিদেরা জানাচ্ছেন, এল নিনো তো আছেই। তার উপরে আরবসাগর ও বঙ্গোপসাগরে তাপমাত্রার ফারাক যদি কমে যায় বা প্রায় সমান হয়ে যায়, বর্ষা তা হলে ছত্রখান হয়ে যেতে পারে। সে-ক্ষেত্রে দেশের কোথায় কখন কতটা বর্ষণ হবে, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা ষোলো আনা।
গ্রীষ্ম ও বর্ষা নিয়ে এমন আশঙ্কার মধ্যে কিছুটা হলেও আশা দিচ্ছেন জাপানের আবহবিদদের একাংশ। তাঁরা বলছেন, পরিস্থিতি বদলের ইঙ্গিত মিলছে। এবং সেটার মূলে আছে দুষ্টু ছেলের চিত্তশুদ্ধির প্রবণতা। অর্থাৎ এল নিনো-পরিস্থিতি শোধরাতে চলেছে। জাপানি আবহবিদেরা এখনও তার জোরালো প্রমাণ দিতে পারেননি। তবে তাঁদের এই পূর্বাভাস যদি মিলে যায়, সেটাই আগামী গ্রীষ্ম ও বর্ষায় ভারতের মুখে হাসি ফোটাতে পারে।
এল নিনো কী
প্রশান্ত মহাসাগরে জলপ্রবাহের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়াই পৃথিবী জুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ। জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সেই ভৌগোলিক-প্রাকৃতিক ঘটনার নাম
‘এল নিনো’। স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’ মানে ছোট্ট ছেলে। জলস্তরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রাকৃতিক প্রবণতার সঙ্গে বিষয়টি জুড়ে যাওয়ায় এই শব্দবন্ধের অর্থ দাঁড়িয়েছে ‘দুষ্টু বা দুরন্ত ছেলে’। কারণ তারই দুষ্টুমিতে অনাবৃষ্টি বা খরা, অতিবৃষ্টি কিংবা অকালবৃষ্টিতে নাকাল হয় মানুষ।