Advertisement
E-Paper

ধুলো-দূষণ নিয়ে ফের আন্দোলনে পাঁচামি

পাঁচামি আছে পাঁচামিতেই। মহম্মদবাজারের এই পাথর শিল্পাঞ্চলে ধুলোদূষণের জন্য পাথর খাদান মালিকদের বিরুদ্ধে মজুরদের ক্ষোভ ফের ধোঁয়াচ্ছে। সম্প্রতি এলাকার কয়েকশো আদিবাসী পুরুষ-মহিলা মিছিল করে ‘পাঁচামি মাইন্স এন্ড ক্রাশার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ অফিসে গিয়ে স্মারকলিপি দেয়। থানা ও বিডিও দফতরেও তা জমা দেওয়া হয়।

ভাস্করজ্যোতি মজুমদার

শেষ আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:৪৬
ধুলোয় ভরেছে রাস্তা। মহম্মহদবাজারের পাঁচামির সাগরবাঁদিতে ছবিটি তুলেছেন অনির্বাণ সেন।

ধুলোয় ভরেছে রাস্তা। মহম্মহদবাজারের পাঁচামির সাগরবাঁদিতে ছবিটি তুলেছেন অনির্বাণ সেন।

পাঁচামি আছে পাঁচামিতেই। মহম্মদবাজারের এই পাথর শিল্পাঞ্চলে ধুলোদূষণের জন্য পাথর খাদান মালিকদের বিরুদ্ধে মজুরদের ক্ষোভ ফের ধোঁয়াচ্ছে। সম্প্রতি এলাকার কয়েকশো আদিবাসী পুরুষ-মহিলা মিছিল করে ‘পাঁচামি মাইন্স এন্ড ক্রাশার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ অফিসে গিয়ে স্মারকলিপি দেয়। থানা ও বিডিও দফতরেও তা জমা দেওয়া হয়। তারপরও প্রশাসনের তরফে ধুলো দূষণ কমানোর কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক মহলে আশঙ্কা, ফের ২০০৯-১০ সালের মতো অশান্তি শুরু হতে পারে এই পাথর শিল্পাঞ্চলে।

আদিবাসীদের যে সংগঠনের নেতৃত্বে তখন থমকে গিয়েছিল পাথর শিল্পাঞ্চল, সেই ‘বীরভূম জেলা আদিবাসী গাঁওতা’-র সম্পাদক রবিন সোরেন বলেন, ‘‘ঠিক মতো জল না দেওয়া, ও নিয়ম মেনে খাদান-ক্রাশার না চালানোয় দূষণ বেড়েই চলেছে। তাই ফের আন্দোলনের পথ বেছে নিতে হচ্ছে।’’ সাগরবাঁধি এলাকার পঞ্চায়েত সদস্যা মানি হাঁসদাও (গাঁওতা সমর্থিত নির্দল) বলেন, ‘‘ক্রাশার ও ট্রাকের ধুলো রোধে পর্যাপ্ত জল দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। এতে কাজ না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে হবে।’’

বাম জমানার শেষের দিকে পাথর খাদানে বিস্ফোরণে এক শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার জেরে প্রায় অচলাবস্থা তৈরি হয় পাথর শিল্পাঞ্চলে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর বেশ কিছু অবৈধ খাদান বন্ধ করে দেওয়া হয়। আন্দোলনের আগে প্রায় ২৭-৩০টা খাদান ও ৪০০-র কিছু বেশি ক্রাশার কাজ করছিল। বর্তমানে খাদানের সংখ্যা ১৩-১৫, ৬০-৭০টা ক্রাশার চলছে।

Advertisement

গাঁওতার দাবি, সরকার দূষণ রোধ করার, এবং অবৈধ খাদান ও ক্রাশার বন্ধ করার যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কাজে তা করেনি। ফলে দূষণ-সহ সব সমস্যাই রয়ে গিয়েছে। পাঁচামি এলাকার বাসিন্দা জোসেফ মাড্ডি, রুবি সোরেন, ছেলু সোরেন, বিশ্বনাথ টুডু, রামেশ্বর বাস্কে, সকলের অভিযোগ, এই এলাকার মানুষদের জন্য কেউ ভাবেন না। ‘‘পাথর ভাঙা ধুলোয় নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। রাত অবধি ক্রাশার চলে, গাড়ি লোড হয়। রাতে ঘুমোতে পারি না,’’ দাবি তাঁদের।

গাঁওতা সদস্যদের অভিযোগ, সম্প্রতি হাইকোর্টের এক আইনজীবী পাথর খাদানের ধুলো দূষণের বিষয়ে মামলা করায় জাতীয় পরিবেশ আদালত প্রশাসনকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি।

পঞ্চায়েত সদস্যা মানি হাঁসদা জানান, ধুলোর জন্য এলাকার কৃষি কাজ এক রকম শিকেয় উঠেছে। ধান-সহ অন্যান্য ফসল লাগালেও তা ঠিক মতো হয় না। দূষণে এলাকার মানুষ কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন। যক্ষ্মা, সিলিকোসিসের মতো রোগে ভুগছেন। পাশাপাশি এলাকায় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ‘‘রাস্তাঘাট থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, সব কিছুতেই এই শিল্পাঞ্চল যেন প্রশাসনের কাছে দুয়োরানি। সর্বস্তরে প্রসাসনকে বলেও কোন লাভ হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে এলাকার প্রায় সাতশো মানুষ মিছিল করি,’’ বলেন মানি হাঁসদা।

কী বলছেন পাথর খাদান মালিকরা?

তাঁদের বক্তব্য, দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই নিয়েছেন অধিকাংশ খাদান মালিক। পাঁচামি তালবাঁধ মাইন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কমল খান জানান, মাস দুয়েক আগে একটি বৈঠক হয়। তাতে ছিলেন দুর্গাপুরের পরিবেশ দফতরের আধিকারিক, বীরভূম জেলাশাসক, জেলা ভূমি ও ভূমি রাজস্ব আধিকারিক-সহ জেলা, ব্লক ও পুলিশ প্রশাসনের আধিকারিক, এবং জেলার সমস্ত পাথর শিল্পাঞ্চলের সংগঠনগুলির কর্তৃপক্ষ। ওই বৈঠকে দূষণ রোধে দুটি মডেল তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। অধিকাংশ ক্রাশার মালিক ইতিমধ্যে ওই মডেল মানছেন। যা দেখে দূষণ পর্ষদ ছাড়পত্র দেওয়া শুরু করেছে।

দূষণ নিয়ন্ত্রণে ঠিক কী করছেন খাদান মালিকরা? কমলবাবু বলছেন, ‘‘তালবাঁধ এলাকায় পাঁচটি ট্যাঙ্কে করে জল দেওয়া হয়। পাঁচামি এলাকায় তিনটি ট্যাঙ্কে। আদিবাসীদের দাবি মেনে পাঁচামিতে আর একটি ট্যাঙ্ক কেনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর ধুলোর সমস্যা থাকবে না।’’

মহম্মদবাজারের বিডিও তারাশঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘‘এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে দূষণ নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পরে পাথর শিল্প কর্তৃপক্ষকে সাবধান করা হয়েছে। আগের চেয়ে দূষণ অনেকটা কম। যদি নিয়মিত জল না দেয়, ফের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ জেলাশাসক পি মোহন গাঁধী বলেন, ‘‘দূষণের ব্যাপারে প্রশাসন যথেষ্ট সজাগ। উপযুক্ত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।’’ তাঁর দাবি, পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভাল। তবে এ কথা মানতে পারছেন না গাঁওতার সদস্যরা। বৃদ্ধা গাঁওতা নেত্রী বুধনি মুর্মু ঘরের ভিতর থেকে বাসনপত্র বার করে এনে দেখালেন, তাতে পড়ে রয়েছে পুরু ধুলোর আস্তরণ। ‘‘ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে সকলেই এই বিষাক্ত ধুলো খাচ্ছে। অকালে মারা যাচ্ছে। কী করে সুস্থ ভাবে বাঁচব?’’ প্রশ্ন তাঁর।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy