পুজো মিটে গিয়েছে। শহরের মাঠগুলির সর্বাঙ্গে এখন ক্ষত। যেখানে-সেখানে পড়ে আবর্জনা। ছড়িয়ে রয়েছে পেরেক, বাঁশের টুকরো। তৈরি হয়েছে ছোট-বড় গর্তও।
শহর মেদিনীপুরে প্রায় সব বড় পুজোই হয় মাঠে। পুজোর পর সেই মাঠগুলো নোংরা-আবর্জনায় ভরে থাকায় সমস্যায় পড়ছে এলাকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাই। তারা বিকেল হলেই মাঠে খেলতে আসে। পুজো শেষে মাঠগুলোর এখন যা অবস্থা তাতে খেলাধুলো করা বিপদ। যে কোনও সময় পড়ে গিয়ে চোট-আঘাত লাগতে পারে। সমস্যার কথা মানছেন পুর-কর্তৃপক্ষও। তবে মেদিনীপুরের উপ-পুরপ্রধান জিতেন্দ্রনাথ দাসের বক্তব্য, “সবে পুজো শেষ হয়েছে। তাই সব আবর্জনা সরানো সম্ভব হয়নি। কাজ অবশ্য শুরু হয়েছে। সব আবর্জনা দ্রুত সরানো হবে।” উপপুরপ্রধানের দাবি, “মাঠ সাফাইয়ে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শহরের কাউন্সিলরদের প্রয়োজনীয় নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, নিজ নিজ এলাকার মাঠগুলো থেকে জমে থাকা নোংরা-আবর্জনা সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে।”
পুজো উদ্যোক্তাদের আবার দাবি, মাঠ সাফাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। শহরের অরবিন্দনগর সর্বজনীনের অন্যতম উদ্যোক্তা কার্তিক ধর বলেন, “বুধবার থেকে আবর্জনা সরানো শুরু হয়েছে। এই সপ্তাহের মধ্যেই মাঠ সাফাইয়ের কাজ হয়ে যাবে।” কার্তিকবাবু মানছেন, “মাঠে নোংরা-আবর্জনা পড়ে থাকলে সমস্যা হবেই। বিকেলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এখানে খেলাধুলো করে। মণ্ডপ খোলার কাজ চলছে। মণ্ডপ খোলার কাজ শেষ হলে পুরো মাঠই সাফাই করা হবে।” প্রায় একই বক্তব্য রাঙামাটি সর্বজনীনের অন্যতম উদ্যোক্তা গোপালচন্দ্র কর্মকারের। তাঁর কথায়, “এ দিনই মাঠের কিছুটা অংশ সাফাই করা হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুরো মাঠ সাফাই করা হবে।” তিনি বলেন, “মাঠে আবর্জনা থাকলে এলাকার ছেলেমেয়েদের সমস্যা হয়। সবে পুজো শেষ হয়েছে। এ বার বিসর্জনও দেরিতে হল। তাই সব আবর্জনা সরানোর সময় পাওয়া যায়নি।” মেদিনীপুর শহরে খেলাধুলোর মাঠ কমে গিয়েছে। শহরবাসীও চাইছেন, যত দ্রুত সম্ভব মাঠগুলো আগের চেহারায় ফিরুক। এখন শহরে খেলাধুলোর উপযোগী মাঠের সংখ্যা খুব বেশি নয়। সব থেকে বড় মাঠ রয়েছে গোলকুয়াচকের কাছে, কলেজ মাঠ।
পুজো যেতেই জীর্ণ দশা খেলার মাঠের। মেদিনীপুর শহরের অরবিন্দনগর (বাঁ দিকে)
ও বার্জটাউনের (ডান দিকে) মাঠ ভরেছে জঞ্জালে।
কলেজ মাঠে সকাল-বিকেল অনেকে খেলতে আসেন। প্রাতর্ভ্রমণ করেন। এখানে অবশ্য দুর্গাপুজো হয় না। তবে মহরমের মেলা বসে। শহরের অন্য বেশ কয়েকটি মাঠে দুর্গাপুজো হয়। যেমন রাঙামাটি, বার্জটাউন, বিধাননগর, শরত্পল্লি, অরবিন্দনগর, জুগনুতলা, অশোকনগর প্রভৃতি। পুজোর শহরে এই সব মাঠে মেলাও বসে। মেলা মানে হরেক রকম স্টল। এক-একটি স্টলে এক-এক রকম খাবার। পুজো দেখতে বেরিয়ে অনেকেই মেলার মাঠে ভিড় করেন। জমিয়ে আড্ডা দেন। যে সব মাঠে মেলা বসে, সেই সব এলাকার পুজোর বাজেটের একটা ভাল অংশও আসে এই সব স্টল থেকে। স্টলগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেন পুজো উদ্যোক্তারা। কোনও স্টল থেকে দিনপিছু ৩ হাজার টাকা আদায় হয়। কোনও স্টল থেকে ৫-৬ হাজার টাকা। বড় স্টলগুলো থেকে আবার ১০-১২ হাজার টাকা। শহরের বড় পুজোগুলোর মণ্ডপের আশপাশে অন্তত ২৫- ৩০টি স্টল থাকে। বৃষ্টি হলে মেলা পণ্ড হয়। এ বার অবশ্য পুজোর দিনগুলোয় রোদ ঝলমলে আকাশ ছিল। ফলে, কমবেশি সব স্টলে বিক্রি ভালই হয়েছে। বিক্রি ভাল হওয়ায় মাঠগুলোয় নোংরা-আবর্জনাও জমেছে বেশি। কারণ, বেশির ভাগ স্টলই তো হয় ফাস্ট ফুড, আইসক্রিম, ফুচকা, ভেলপুরি, ঠান্ডা পানীয় প্রভৃতি। প্রায় সকলেই খাবার খেয়ে ঠোঙা, প্যাকেট মাঠের মধ্যে ফেলে দেন। আড্ডার সময় অন্যত্র গিয়ে প্যাকেট ফেলে আসার দিকে খেয়ালই থাকে না।
পুজো মিটে গিয়েছে। পুজোর গন্ধও মুছে গিয়েছে। এখন মাঠে জমে থাকা আবর্জনা কবে সরে, কবে মাঠের হাল ফেরে, সে দিকেই তাকিয়ে শহরবাসী!
ছবি: রামপ্রসাদ সাউ।