তিন দিকে বিরোধী ঘাঁটির মাঝে ভিড় জমানো বলে কথা! তাই মাসখানেক ধরে একাধিক ছোট ছোট সভা করে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। মহকুমার প্রতিটি বিধানসভা এলাকা থেকে সাত হাজার করে লোক আনার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল দলের নেতাদের। এত প্রস্তুতির শেষে শুক্রবার উত্তর ২৪ পরগনার ন্যাজাটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক সভায় ভিড় দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন তৃণমূল নেতারা।
পুলিশ জানিয়েছে, এ দিনের সভায় ভিড় হাজার পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, এসেছিলেন লক্ষাধিক মানুষ। বিধানসভা ভোটের আগে জেলার এই প্রান্তে এই আকারের জমায়েত তৃণমূলকে বাড়তি মনোবল জোগাবে বলে মনে করছেন জেলা রাজনীতির গতিপ্রকৃতির পর্যবেক্ষকেরা।
সন্দেশখালির বিধায়ক সিপিএমের। হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভা সিপিআইয়ের হাতে। বসিরহাট দক্ষিণে জিতেছেন বিজেপি প্রার্থী। কিছুটা দূরে বাদুড়িয়া আবার কংগ্রেসের দীর্ঘ দিনের ঘাঁটি। গোটা উত্তর ২৪ পরগনার ৩৩টি আসনের মধ্যে যে চারটি বিরোধীদের হাতে, তা সবই বসিরহাট মহকুমায়। বিশেষত, ন্যাজাটের অবস্থান একেবারে বিরোধী শিবিরবেষ্টিত। তাই শাসক দলের তরফে বাড়তি তাগিদ ছিল চোখে পড়ার মতো।
ভিড় যে উপচে পড়বে, তার ইঙ্গিত সকাল থেকেই মিলছিল। মুখ্যমন্ত্রী আসার কথা ছিল দুপুর আড়াইটেয়। কিন্তু সকাল ৮টার পর থেকে বসিরহাট, হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি, হাসনাবাদ, বাসন্তী-গোসাবার মতো দক্ষিণ ২৪ পরগনার নানা প্রান্ত থেকে লোক জড়ো হতে শুরু করে। প্রচুর ছোট গাড়ি, বাস, ম্যাটাডোর ঢুকতে থাকে ন্যাজাটে। নদীপথে আসতে থাকে অসংখ্য ভুটভুটি। শুধু সন্দেশখালির নানা প্রান্ত থেকেই প্রায় ৯০০ গাড়ির মিছিল ঢুকেছে ন্যাজাটে।
রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণমন্ত্রী উপেন বিশ্বাস মঞ্চ থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে যানজটে আটকে পড়েন। সভার দিকে যাওয়ার রাস্তা একটাই। সেই রাস্তার বেশ খানিকটা অংশে গাড়ি চলতে দেয়নি পুলিশ। এক পুলিশকর্মী মন্ত্রীকে পরামর্শ দেন, ‘‘স্যার, হেঁটে না গেলে সময়ে পৌঁছতে পারবেন না।’’ গাড়ি ছেড়ে ভিড় ঠেলে দ্রুত হাঁটতে গিয়েও সমস্যা। কাতারে কাতারে লোক। ভ্যানরিকশা করে একটু তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন উপেন। কিন্তু ভিড় ঠেলে এগোতে গিয়ে ভ্যানচালকও গলদঘর্ম। সভাস্থলের কয়েক কিলোমিটার আগেই যানজটে আটকে পড়েন বিধায়ক সুজিত বসুও। মঞ্চ থেকে অনেক দূরে কেন গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে হচ্ছে, তা নিয়ে পুলিশকর্মীদের দু’-চার কথা শুনিয়েও দেন তিনি। তবে তার পরেই দ্রুত পায়ে হাঁটা দেন সভাস্থলের দিকে।
মন্ত্রী, বিধায়কেরা মোটামুটি সময়মতো পৌঁছলেও ভিড়ের চাপে পরিস্থিতি এমনই হয়েছিল, বহু মানুষ সভার ধারেকাছে পৌঁছতেই পারেননি। বসিরহাটের এক নেতা দেড়শো ছোট গাড়িতে কর্মী-সমর্থক জোগাড় করে সকালে রওনা হয়েছিলেন ন্যাজাটের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী সভাস্থলে পৌঁছনোর আধ ঘণ্টা পরে, দুপুর ২টো নাগাদ সেই নেতা ও তাঁর সঙ্গীরা মঞ্চ থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পৌঁছেছিলেন। ততক্ষণে ভাষণ শুরু করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ভিড়ে আর এগোনোর উপায় নেই। হতাশ নেতা রাস্তার ধারেই বসে পড়লেন মাথায় হাত দিয়ে।
দলের লোকেদের টুকরো ‘ভোগান্তি’তে গুরুত্ব দেননি তৃণমূলের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সভাপতি তথা খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। তাঁর মন্তব্য, ‘‘এটা জন-জোয়ার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে উন্নয়ন দেখতে দলমত নির্বিশেষে মানুষ এসেছে, তাই এত ভিড়।’’
বিরোধীরা অবশ্য মনে করাচ্ছেন, রাজনীতির সেই আপ্তবাক্য, ‘‘ভিড় আর ভোট সমার্থক নয়।’’ বসিরহাট দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘এ রাজ্যে কয়েক মাসের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে। সন্দেশখালিতে যে ভিড় হয়েছে, তা সরকারের জনভিত্তি বা জনপ্রিয়তার প্রকৃত প্রতিফলন নয়। সন্দেশখালি দ্বীপের শান্তিপ্রিয় মানুষ শাসক দলের সভায় আসতে বাধ্য।’’