Advertisement
E-Paper

বকেয়ার পাহাড় জমে ওষুধ অমিল ইএসআইয়ে

নানা ধরনের সাধারণ রোগব্যাধি থেকে দুরারোগ্য অসুখে অনেক খেটে-খাওয়া মানুষেরই ভরসা ইএসআই হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে বিষম টান পড়েছে ওষুধে। কারণ সেই একটাই— ভাঁড়ারের অবস্থা করুণ। তাই ওষুধের বকেয়া দাম মেটানো যাচ্ছে না। ২৫ কোটি টাকা বকেয়ার ভারে ডুবতে বসেছে রাজ্য ইএসআইয়ের মেডিক্যাল বেনিফিট বা চিকিৎসা সুরাহা প্রকল্প।

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:২২
টাকা না-পেয়ে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রাখার কথা সরকারকে লিখিত ভাবে জানিয়ে দিচ্ছে সংস্থাগুলি।

টাকা না-পেয়ে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রাখার কথা সরকারকে লিখিত ভাবে জানিয়ে দিচ্ছে সংস্থাগুলি।

নানা ধরনের সাধারণ রোগব্যাধি থেকে দুরারোগ্য অসুখে অনেক খেটে-খাওয়া মানুষেরই ভরসা ইএসআই হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে বিষম টান পড়েছে ওষুধে। কারণ সেই একটাই— ভাঁড়ারের অবস্থা করুণ। তাই ওষুধের বকেয়া দাম মেটানো যাচ্ছে না। ২৫ কোটি টাকা বকেয়ার ভারে ডুবতে বসেছে রাজ্য ইএসআইয়ের মেডিক্যাল বেনিফিট বা চিকিৎসা সুরাহা প্রকল্প।

স্বাস্থ্য সূত্রের খবর, ইএসআই হাসপাতালে যারা ওষুধ সরবরাহ করে, গত পুজো থেকে সেই সব সংস্থার কোনও পাওনা মেটানো যায়নি। আর প্রাপ্য টাকা না-পেয়ে গত ডিসেম্বর থেকে একের পর এক সংস্থা ওষুধ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার রাস্তা নিচ্ছে। গরিব রোগীরা ইএসআই হাসপাতাল থেকে জীবনদায়ী ওষুধ, ইঞ্জেকশন, এমনকী অ্যান্টিবায়োটিকও পাচ্ছেন না। সব চেয়ে খারাপ অবস্থা কলকাতার শিয়ালদহ ও মানিকতলা ইএসআই হাসপাতালে। কারণ, ওই দুই জায়গায় রোগীর সংখ্যা সব চেয়ে বেশি।

চলতি আর্থিক বছরে জানুয়ারি পর্যন্ত রাজ্যের ইএসআই মেডিক্যাল বেনিফিট প্রকল্পে ওষুধ সরবরাহকারী সংস্থাগুলির বিল হয়েছে ৩৪ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা। তার মধ্যে মেটানো গিয়েছে মাত্র ১৬ কোটি ৪৮ লক্ষ। অর্থাৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলির পাওনার অর্ধেকেরও বেশি, প্রায় ১৮ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে গিয়েছে। পাইকপাড়ার একটি ওষুধ সংস্থার প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের একটি সংস্থার তিন কোটি, বেহালার সংস্থার পাঁচ কোটি, গিরিশ পার্কের সংস্থার প্রায় তিন কোটি, এ জে সি বোস রোডের একটি সংস্থার দু’‌কোটি বাকি পড়েছে।

Advertisement

বর্তমান অর্থবর্ষের বাকি আরও দেড় মাস। ফেব্রুয়ারি আর মার্চের ওষুধ মিলিয়ে বকেয়া প্রায় ২৫ কোটিতে পৌঁছবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ দিকে রাজ্য ইএসআইয়ের তহবিলে পড়ে আছে সাকুল্যে পাঁচ লক্ষ টাকা। কর্তাদের বক্তব্য, অক্সিজেন ও নাইট্রাস গ্যাস কিনতে এবং অ্যাম্বুল্যান্সের ভাড়া মেটাতেই এই টাকা খরচ হয়ে যাবে। চিকিৎসার জন্য প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ ইএসআই হাসপাতালগুলির উপরে নির্ভরশীল। এবং তাঁদের প্রায় সকলেই মূলত গরিব শ্রমিক, খেটে-খাওয়া মানুষ। ওষুধ বাড়ন্ত হওয়ায় সব চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাঁদেরই।

পরিস্থিতি কতটা সঙ্গিন, শিয়ালদহ ইএসআই হাসপাতালের ছবিতেই সেটা পরিষ্কার। সেখানে এই মুহূর্তে হিমোফিলিয়া রোগীদের প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর-৮ ওষুধ একটিও নেই। ফ্যাক্টর-৭ আছে ১০-১২টি আর ফ্যাক্টর-৯ রয়েছে ১০৯টি। অথচ ওখানকার ওষুধের উপরে নির্ভর করে আছেন অন্তত ৯০ জন হিমোফিলিয়া রোগী। এ ছাড়া ওই হাসপাতালে বছরে অন্তত ১৬০০ রোগীর কেমোথেরাপি হয়। ছ’হাজারের বেশি ক্যানসার আক্রান্তের অস্ত্রোপচার হয় প্রতি বছর। কেমোথেরাপির ওষুধ ফুরোতে বসেছে। ইএসআই অধিকর্তার দফতরে ওষুধের তালিকা পাঠিয়ে হাপিত্যেশ করে বসে আছেন হাসপাতালের কর্তারা। টাকা নেই বলে তা কেনা যাচ্ছে না।

রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের অধীন সরকারি হাসপাতালগুলিতে নিখরচায় ওষুধ দিতে এবং সব রকম পরিষেবা চালাতে সরকার তো কোটি কোটি টাকা দিচ্ছে। তা হলে সেই সরকারই শ্রম দফতরের অধীন ইএসআই মেডিক্যাল বেনিফিট স্কিমে ওষুধের জন্য বকেয়া মেটাতে পারছে না কেন?

মন্তব্য করতে রাজি হননি শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক। তবে রাজ্যে ইএসআই মেডিক্যাল বেনিফিট স্কিমের অধিকর্তা মৃগাঙ্কশেখর করের ব্যাখ্যা, রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে টাকা ভাগাভাগি হয়ে যাওয়াতেই যত সমস্যা।

কী রকম ভাগাভাগি?

অধিকর্তা জানান, ইএসআই মেডিক্যাল বেনিফিট প্রকল্পে কেন্দ্রের ইএসআই কর্পোরেশন দেয় ৭৫ শতাংশ টাকা আর রাজ্য দেয় ২৫ শতাংশ। ‘‘কেন্দ্র বছরে আমাদের ২০০ কোটি টাকা দেয় চার ভাগে। শুধু ওষুধেই চলে যায় প্রায় ৪৮ কোটি টাকা। ওষুধের দাম বেড়েই চলেছে। রোগী বাড়ছে। এই টাকায় চালানো অসম্ভব। বারবার দিল্লিতে গিয়ে দরবার করলেও কেউ শুনছে না,’’ অসহায় শোনাল মৃগাঙ্কবাবুর গলা।

দিল্লির ঘাড়ে দোষ চাপানোর প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন ইএসআই কর্পোরেশনের পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সিনিয়র মেডিক্যাল কমিশনার। ইএসআই চিকিৎসা সুরাহা প্রকল্পে টাকা জোগানোর পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, অন্যান্য রাজ্যকে যে-টাকা দেওয়া হয়, পশ্চিমবঙ্গকেও তো তা-ই দেওয়া হচ্ছে। ‘‘অন্যেরা সেই টাকায় চালাতে পারলে বাংলা কেন পারছে না,’’ প্রশ্ন তুলছেন ওই ইএসআই-কর্তা।

রাজ্য সরকারের তরফে সরাসরি জবাব মিলছে না।
তবে স্বাস্থ্য সূত্রের ব্যাখ্যা, মানিকতলা বা শিয়ালদহের মতো বেশ কিছু হাসপাতালে রাজ্য সরকার নিজেদের মতো করে সুপার স্পেশ্যালিটি
কিছু পরিষেবা (অঙ্কোলজি, হেমাটোলজি, ইউরোলজি, নেফ্রোলজি ইত্যাদি) চালু করেছে। এই ‘ইনহাউস’ পরিষেবায় দিল্লি টাকা দেয় না।
নিয়ম অনুযায়ী ইএসআই হাসপাতালগুলি সুপার স্পেশ্যালিটি চিকিৎসা পরিষেবা চালাতে পারে একমাত্র তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কোনও বেসরকারি হাসপাতালের মাধ্যমেই। তাতে যা খরচ হবে, সেই টাকা কর্পোরেশন সরাসরি ওই চুক্তিবদ্ধ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। নিয়ম ভেঙে ইনহাউস সুপার স্পেশ্যালিটি চিকিৎসা চালু করে দিল্লির দেওয়া টাকা সেই খাতে খরচ করে ফেলছে রাজ্য। এবং সেটা করতে গিয়েই আর প্রয়োজনীয় ওষুধের টাকা মেটাতে বা জোগাতে পারছে না।

টাকা নিয়ে এই টানাটানির মাসুল গুনতে হচ্ছে গরিব রোগীদের।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy