Advertisement
E-Paper

‘ভুয়ো’ চিঠিতেই বন্ধ ষোলোটি পত্রিকা

গত জুলাইয়ে দেশে পত্রপত্রিকা প্রকাশের নিয়ামক সংস্থা ‘রেজিস্ট্রার অব নিউজপেপারস ফর ইন্ডিয়া’-র (আরএনআই) নাম লেখা চিঠিতে নদিয়ার ষোলোটি ছোট পত্রিকা বন্ধের নির্দেশ এসেছিল।

সুস্মিত হালদার

শেষ আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:৫৬
ও চিঠি ভুয়ো, জেলা প্রশাসনকে পাঠানো চিঠিতে দাবি আরএনআইয়ের।

ও চিঠি ভুয়ো, জেলা প্রশাসনকে পাঠানো চিঠিতে দাবি আরএনআইয়ের।

গত জুলাইয়ে দেশে পত্রপত্রিকা প্রকাশের নিয়ামক সংস্থা ‘রেজিস্ট্রার অব নিউজপেপারস ফর ইন্ডিয়া’-র (আরএনআই) নাম লেখা চিঠিতে নদিয়ার ষোলোটি ছোট পত্রিকা বন্ধের নির্দেশ এসেছিল। সেই চিঠি আসল কি না, এমন নির্দেশের পিছনে কারণ কী, আর কোথাও এমন চিঠি গিয়েছে কি না, কোনও খবরই নেয়নি জেলা প্রশাসন। রাতারাতি ষোলোটি পত্রিকা বন্ধ করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। অভিযোগ, এ ভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপরে হস্তক্ষেপ করছে প্রশাসন।

যা দেখে স্তম্ভিত জেলার সাংবাদিক তথা প্রকাশক মহল। কৃষ্ণনগর প্রেস ক্লাবের সম্পাদক হালিম মণ্ডল বলেন, ‘‘ইংরেজ আমলেও কখনও এতগুলো কাগজ এক সঙ্গে বন্ধ করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। কোনও বিচার-বিবেচনা কাজ করেছে বলে তো মনে হয় না!’’

বিভিন্ন জায়গায় দরবার করেও কোন লাভ না হওয়ায় তথ্য জানার অধিকার আইনে আরএনআই-এর কাছে গোটা বিষয়টি জানতে চেয়েছিল নদিয়া জেলা পত্রপত্রিকা পরিষদ। গত নভেম্বরে আরএনআই চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, তারা আদৌ এমন কোনও নির্দেশ দেয়নি। আগের চিঠি ‘ভুয়ো’। পরিষদের সম্পাদক শিবনাথ চৌধুরী বলেন, ‘‘আমাদের সন্দেহ হওয়াতেই তথ্য জানার অধিকার আইনে বিষয়টি আরএনআই-এর কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তারা জানিয়ে দিয়েছে, আগের চিঠি ভুয়ো।’’ তাঁর আক্ষেপ, ‘‘আমাদের সন্দেহ হল, অথচ প্রশাসনের কর্তাদের কিছু মনেই হল না? অন্য জেলাগুলিতেও এমন চিঠি গিয়েছে কি না, খোঁজ নিয়ে দেখা তো উচিত ছিল।’’

প্রত্যাশিত ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এমন একটি ‘ভুয়ো’ চিঠির ভিত্তিতে কী ভাবে ফতোয়া জারি করল জেলা প্রশাসন? সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের আগে কেন ঠিক করে খোঁজ নেওয়া হল না? এর আগে খবর সংগ্রহে গিয়ে বহু বার আক্রান্ত হয়েছেন ‘রশ্মি বাংলা’ পাক্ষিক পত্রিকার সম্পাদক সুধাংশুশেখর সরকার। তাঁর সন্দেহ, ‘‘আমরা নির্ভীক ভাবে খবর করি বলেই বারবার আক্রমণ নেমে আসছে। কখনও বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, কখনও শারীরিক ভাবে নিগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু এ ভাবে আমাদের থামানো যাবে না।’’

সুধাংশুবাবু তাঁর পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ করেননি। যেমন করেননি নাকাশিপাড়া থেকে প্রকাশিত ‘সংবাদ জনকথা’র সম্পাদক আনারুল হকও। তাঁর বক্তব্য, ‘‘আমার বিরুদ্ধে অনিয়মিত ভাবে কাগজ প্রকাশ করার কথা বলা হয়েছে। এটা মোটেই ঠিক নয়। ওই চিঠিতে আমার কাগজের রেজিস্ট্রেশন নম্বরও ভুল আছে।’’ তাঁর দাবি, ‘‘চিঠিটা দেখেই মনে হয়েছিল, কোনও গণ্ডগোল আছে। আমি তো কোনও বেনিয়ম করিনি। তাই কাগজ বের করছি। তাতে যা হওয়ার হবে।’’

আবার জেলা প্রশাসনের নির্দেশ মাথায় নিয়ে পুরনো পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়ার নজিরও আছে। প্রায় ৪২ বছর ধরে প্রকাশ হয়ে আসা মাজদিয়ার ‘কৃষিসাহিত্য’ পাক্ষিক পত্রিকা যেমন। সেটির সম্পাদক স্বপন ভৌমিকের আক্ষেপ, ‘‘এত বছর ধরে সব রকম শর্ত মেনেই কাগজ বের করে আসছি। অথচ কোনও কারণ না দেখিয়েই আমাকে কাগজ বন্ধ করে দিতে বলা হল! এতে আর্থিক ক্ষতি তো আছেই, পাশাপাশি ভাবমূর্তিরও ক্ষতি হল। সেটা কি কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে?’’

জেলার সাংবাদিক মহলের একটা বড় অংশের আক্ষেপ, ‘ভুয়ো’ চিঠির ভিত্তিতে বারোটি পত্রিকা বন্ধ করার ফতোয়া জারির পরে এখন কার্যত ‘শিশুসুলভ বিস্ময়’ প্রকাশ করছেন প্রশাসনের কিছু কর্তা। কেউ আবার মান বাঁচাতে এই দ্বিতীয় চিঠির সত্যতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। তাঁদের মতে, বিষয়টি ফের গো‌ড়া থেকে যাচাই করে দেখা উচিত।

অতিরিক্ত জেলাশাসক (সাধারণ) শঙ্কর নস্কর বলেন, ‘‘আমরাই তো অবাক। আরএনআই-এর নামে কেউ যে ভুয়ো চিঠি দিতে পারে, সেটা কী করে আমাদের মাথায় আসবে? এখনও বুঝতে পারছি না, কোন চিঠিটা আসল। প্রথম চিঠিটা যদি আরএনআই না পাঠিয়ে থাকে তা হলে কে পাঠাল? কেনই বা পাঠাল?’’ জেলাশাসক বিজয় ভারতী বলেন, ‘‘আমরা প্রকৃত ঘটনা জানতে চেয়ে আরএনআই-কে চিঠি দিয়েছি। এখনও উত্তর পাইনি। নির্দিষ্ট উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত পরবর্তী পদক্ষেপ করতে পারছি না।’’

সাংবাদিক তথা প্রকাশকেরাও বিষয়টির শেষ দেখতে চান। প্রেস ক্লাবের তরফে হালিম দাবি করেন, ‘‘কী করে এই ঘটনা ঘটল, তা সামনে আসা প্রয়োজন। আমরা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চাইছি। এতে যারাই জড়িত থাক, তাদের শাস্তি চাই।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy