প্রতিবন্ধকতা শরীরে, প্রতিবন্ধকতা সংসারে। তবু লড়াই চলছে। দৌড়ে চলেছেন শ্রীকৃষ্ণ।
গোয়ালতোড়ের শ্রীকৃষ্ণ মাহাতো মূক ও বধির। ছোট থেকেই সাঁতার, দৌড়ের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তাঁর। যোগ দিয়েছেন নানা জাতীয় প্রতিযোগিতায়। এ বার অষ্টম এশিয়া প্যাসিফিক ডেফ গেমসে ষষ্ঠ স্থান পেয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ। ৩-১১ অক্টোবর তাইওয়ানে ওই প্রতিযোগিতায় এ রাজ্যেরই বিশ্বজিত্ সাইনি, অভিষেক সাইনি ও দিল্লির অঙ্কিত কুমারের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ যোগ দিয়েছিলেন ১০০ মিটার রিলে দৌড়ে।
প্রশিক্ষণ তো দূর, পেট ভরে খাওয়া জোটে না মাহাতো পরিবারে। শ্রীকৃষ্ণেরর বাবা ভরত মাহাতোর সামান্য জমি, কাজ করেন অন্যের জমিতেও। দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। সেখানে পুষ্টিকর খাবার অসম্ভব। তবু হাল ছাড়েননি ভরতবাবু। তিনি বলেন, ‘‘অনেকের সহযোগিতায় ছেলেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়িয়েছি। সাঁতার ও দৌড়ের জন্য এ দিক সে দিক ঘুরে বেড়াই। সাই-এও আবেদন করেছিলাম।’’ সাই দিয়েছে শুধু মাঠটুকু। ভরতবাবু জানান সাই জানিয়েছে মূক-বধিরদের জন্য কোনও আর্থিক অনুদান নেই। তবে মাঠে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে শ্রীকৃষ্ণ।
ছেলেকে নিয়ে কখনও ফুটপাতে, কখনও অন্যের বাড়ির রোয়াকে থেকেছেন ভরতবাবু। সাফল্যও পেয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ। গুজরাত, নাগপুর, ঝাড়খণ্ড— কখনও দৌড় আবার কখনও সাঁতারে জাতীয় পুরস্কার এনেছেন। ২০১২ সালে আমেরিকাতে বিশ্ব ডেফ অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়নশিপের জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সাফল্য আসেনি সেখানে। ভরতবাবুর কথায়, “বিশ্বের বহু প্রতিযোগীর ভিড় সেখানে। শুনছি সরকার বিভিন্ন খেলোয়াড়দের আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে, কিন্তু আমার ভাগ্যে কিছু জোটেনি।”
আফশোস ঝরে পড়ে ২১ বছরের শ্রীকৃষ্ণের শরীর জুড়ে। আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন, একটু সাহায্য পেলেই আগামী বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে কিছু একটা করে দেখাবেন। আরও বোঝান, ভাল খাবার প্রয়োজন। খিদের চোটে বেশি ছুটতে পারেন না। প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। চাই ভাল জুতোও। তবে দৌড়ের থেকে সাঁতারটাই বেশি পছন্দ শ্রীকৃষ্ণের। “কিন্তু সাঁতারে ওকে সুযোগই দিতে চান না কেউ’’ আক্ষেপ ভরতবাবুর গলায়। তা হোক। সাঁতার আর দৌড় মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মূক-বধিরদের বিভাগে প্রায় ১৪টি স্বর্ণপদক রয়েছে শ্রীকৃষ্ণের ঝুলিতে। “এরপরেও যদি সরকার না তাকায়, কী করব! হয়তো অভাব-অনটনেই হারিয়ে যাবে আমার ছেলের প্রতিভা’’ চোখ ছলছল করে ওঠে আসহায় বাবার।
তবু আনন্দ গ্রাম জুড়ে। সম্প্রতি গোয়ালতোড়ে ফিরেছেন শ্রীকৃষ্ণ। এলাকাবাসী তাঁকে সংবর্ধনা দিয়েছে। জেলা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি আশিস চক্রবর্তী বলেন, ‘‘শ্রীকৃষ্ণ জেলার গর্ব। যাতে কিছু সরকারি সাহায্যের ব্যবস্থা করা যায় সে চেষ্টা নিশ্চয়ই করব।”