ছোট বিমানে ইতিমধ্যেই লোকসান হয়েছে বিস্তর। গত মে মাসে চালু হওয়ার পর থেকে কলকাতা-অন্ডাল রুটে ৪২ আসনের বিমানে গড়ে যাত্রী হয়েছে ১২ থেকে ১৪ জন। ভর্তুকি দিয়ে সেই বিমান এখনও চালিয়ে যাচ্ছে অন্ডাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু, তা থেকে যে অন্ডাল কর্তারা শিক্ষা নেননি তার প্রমান মিলল মঙ্গলবার। কলকাতায় এসে এয়ার ইন্ডিয়া কর্তা জানিয়ে গেলেন, অন্ডাল থেকে এ বার ১২৫ আসনের বড় বিমান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঠিক হয়েছে দিল্লি থেকে বিমান নামবে অন্ডালে। সেখান থেকে কলকাতা ঘুরে আবার অন্ডাল। তারপর ফিরে যাবে দিল্লি। জানা গিয়েছে, এ ক্ষেত্রেও বিমান চালানোর ন্যুনতম খরচ টিকিট বিক্রির টাকায় না উঠলে ভর্তুকি দেবেন অন্ডাল কর্তারা। এয়ার ইন্ডিয়ার ওই কর্তা অনিল মেটার কথায়, ‘‘আমাদের কী আছে? লোকসান হবে না এই শর্তেই আমরা রাজি হয়েছি। বিমান চালানোর খরচ উঠে গেলেই হল।’’
কেন এ ভাবে ভর্তুকি দিয়ে একের পর এক বিমান চালানো হচ্ছে অন্ডাল থেকে? বিশেষত যখন পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না? এ প্রশ্নের উত্তর নেই অন্ডাল কর্তাদের কাছে। কলকাতা বিমানবন্দর সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবারের উড়ানে কলকাতা থেকে অন্ডাল গিয়েছেন ৭ জন। ফিরেছেন ১১ জন।
সূত্রের খবর, প্রধানত রাজ্য সরকারের চাপেই পর পর ভর্তুকি দিয়ে এ ভাবে উড়ান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অন্ডাল কর্তৃপক্ষ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইচ্ছা, কলকাতা-বাগডোগরা ছাড়াও রাজ্যের অন্য ছোট শহর থেকে নিয়মিত বিমান চালাতে হবে। এ কারণে, কোচবিহার বিমানবন্দরের রানওয়ে বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য সরকার। কিন্তু, সেখান থেকে বড় বিমান চালানো আপাতত সম্ভব নয় বুঝে পিছিয়ে এসেছে সরকার। এখন বালুরঘাট, মালদহ থেকে নিয়মিত বিমান পরিষেবা চালু করার জন্য নিজেরাই টাকা ঢেলে বিমানবন্দরের পরিকাঠামো উন্নয়নে নেমেছে রাজ্য।
অন্ডাল পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি এক বিমানবন্দর। সেখান থেকেও যাতে নিয়মিত বিমান চলে তার জন্যও রাজ্য সরকার সচেষ্ট। এমনকী সম্প্রতি অন্ডাল থেকে ছোট বিমান কোচবিহার, বাগডোগরায় চালানোর জন্য একটি সংস্থাকে বরাতও দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রেও ভর্তুকি দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। সেই ভর্তুকির টাকা অন্ডাল যেমন দেবে তেমনই দেবে রাজ্য সরকারও। যদিও এয়ার ইন্ডিয়ার দিল্লি-অন্ডাল উড়ানের ক্ষেত্রে ভর্তুকি শুধু অন্ডাল কর্তৃপক্ষই দেবে।
রাজ্যের বাণিজ্যিক মহল মনে করছে, যত ক্ষণ না পর্যন্ত রাজ্যে ভারী শিল্পের প্রসার হচ্ছে, তত দিন অন্ডাল, কোচবিহার, বালুরঘাট থেকে উড়ান চালিয়ে লাভ করতে পারবে না কোনও সংস্থাই। বিমান পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত এই শিল্পের অভাবেই কলকাতা শহর থেকেও সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকায় কোনও উড়ান নেই। মূলত মধ্যবিত্ত-যাত্রীর কল্যাণে সস্তার বিমানসংস্থাগুলি এখান থেকে ভাল যাত্রী পায়। ঠিক সেই কারণেই, ইন্ডিগো কলকাতা থেকে সবচেয়ে ভাল ব্যবসা করে।
তবু রাজ্য সরকারের উদ্যোগেই মে মাসের মাঝামাঝি চালু হয়েছিল কলকাতা-অন্ডাল উড়ান। ঠিক হয়েছিল, সপ্তাহে ছ’দিন যাতায়াত করবে বিমানটি। অন্ডাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এয়ার ইন্ডিয়ার সহযোগী সংস্থা অ্যালায়েন্সের চুক্তি হয়েছিল, বিমান চালানোর খরচ যদি টিকিট বিক্রির টাকায় উঠে আসে তো ভাল। নয়তো, যত টাকা কম পড়বে তত টাকা দেবেন অন্ডাল কর্তারা।
‘ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং’ বা ভর্তুকি দিয়ে এ ভাবে বিমান চালানোর জন্য সে বার সমালোচনার মুখে পড়েন অন্ডাল কর্তারা। অন্ডাল বিমানবন্দর চালু হওয়ার পরে সেখান থেকে উড়ান চালানোর জন্য সমস্ত বিমানসংস্থাকেই আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু, বেসরকারি কোনও সংস্থাই এখনও পর্যন্ত রাজি হয়নি। কারণ, তাদের যুক্তি ছিল, বিমান চালানোর খরচই উঠবে না, লাভ তো পরের কথা। কিন্তু, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্যোগ নেন। ভর্তুকির শর্তে রাজি হয়ে যায় অ্যালায়েন্স। সূত্রের খবর, প্রতি দিনের উড়ানের জন্যই ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে অন্ডাল কর্তাদের। কারণ, কোনও দিনই বিমান চালানোর ন্যুনতম খরচও উঠছে না।
এ বার অন্ডাল থেকে ভর্তুকি দিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার বড় বিমান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র সরকার। প্রশাসনের একাংশের মতে, সম্প্রতি বিমানমন্ত্রী গজপতি রাজু এসেছিলেন কলকাতায়। তাঁকেই এই উড়ানের জন্য ব্যক্তিগত ভাবে অনুরোধ করেন মমতা। তারপরেই ফাইল চালাচালি শুরু। অনিল মেটা জানান, দু’সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তি হয়ে যাবে।
৪২ আসনের বিমানে গত সোমবার কলকাতা থেকে অন্ডাল গিয়েছেন ৩ জন। ১২৫ আসনের বিমানে কত যাত্রী হয় সেটাই এখন লক্ষ্যনীয়।