শুধু ভাঙার গল্প। শুরু সেই ষাটের দশকে। সিপিআই ভেঙে সিপিআই (এম)। কয়েক বছর পর সিপিআই (এম) ভেঙে সিপিআই (এমএল)। সাতের দশকের শেষ থেকে সিপিআই (এমএল)-এ ভাঙন শুরু। ছোট থেকে আরও ছোট একাধিক দল তৈরি হয়েছে সিপিআই (এমএল) ভেঙে। ভাঙার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এই ছোট দলগুলিও। লাভের লাভ কী হয়েছে? কেউ কিছু করায় উদ্যোগী হলেই রাষ্ট্র তা হেলায় ভেঙে দিয়েছে। এ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বয়স সত্তর পেরিয়ে গিয়েছে। পাল্লা দিয়ে শক্তি বাড়িয়েছে রাষ্ট্রও। এখন সে যা খুশি করতে পারে। প্রশ্ন উঠছে, এখনও কি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার লগ্ন আসেনি বাম দলগুলির?
ঐক্য দূর-অস্ত্! কলকাতা পুরসভা এবং রাজ্যের অন্যান্য পুরসভা ভোটে এসইউসি এবং সিপিআই (এমএল) লিবারেশন-কে বামফ্রন্ট কিছু আসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ওই দুই বাম দল-ই জানিয়ে দিল, সিপিএম-এর সঙ্গে কোনও নির্বাচনী সমঝোতা নয়। ক্ষমতায় থাকাকালে সিপিএম-কে তার কৃতকর্মের জন্য আগে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দুই বাম দলই গোঁ ধরল। এটা কতটা নীতিগত বা নেহাৎ-ই ইগো-র ব্যাপার কি না তা ভেবে দেখা উচিত। বৃহত্তর বাম ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে সিপিএমের যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তেমনই অন্য বাম দলগুলিরও একটা দায় রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে লিবারেশন, এসইউসি-র মতো দল মনে করছে, সার্বিক বাম ঐক্য জরুরি। অর্থাৎ, বৃহত্তর বাম ঐক্য। সিপিএম বৃহত্তর বাম ঐক্যের বিষয়ে একটি কথাও না বলে খুব কৌশলে একটা কথা ব্যবহার করছে। তা হল, বর্ধিত বামফ্রন্ট। কী এই বর্ধিত বামফ্রন্ট? বর্তমানে বামফ্রন্টে ১১টি বামপন্থী দল রয়েছে। তার সঙ্গে আরও ৬টি দলকে যুক্ত করে বর্ধিত বামফ্রন্ট গঠন করতে চাইছে সিপিএম। কোন ৬টি দল? এসইউসি, লিবারেশন, সিআরএলআই, পিডিএস, সিপিআই (এমএল) সন্তোষ রাণা এবং কমিউনিস্ট পার্টি অফ ভারত বা সিপিবি। সত্যি কথা বলতে কি, এসইউসি, লিবারেশন বাদে অন্য চারটি দলের অস্তিত্ব সাইনবোর্ডে-ও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। জনভিত্তি তো দূরের কথা। যাঁরা রাজ্যে বাম রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন তাঁরা ছাড়া সাধারণ মানুষ ওই দলগুলির নামের সঙ্গেও পরিচিত নন। যাঁরা জানেন তাঁরাও সিআরএলআই বলতে অসীম চট্টোপাধ্যায়, সিপিআই (এমএল) সন্তোষ রাণা বলতে সন্তোষ রাণা বা পিডিএস বলতে সমীর পুততুণ্ড এবং প্রয়াত প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ সইফুদ্দিন চৌধুরী-র নাম জানেন।
বামফ্রন্টের ১১টি শরিক দলের মধ্যেও এমন কয়েকটি দল রয়েছে যাদের সংগঠন বলতে কার্যত কিছুই নেই। অস্তিত্ব শুধুমাত্র বামফ্রন্টের শরিক তালিকাতেই সীমাবদ্ধ। যে সব বাম দলের বস্তুত কোনও সংগঠনই নেই তাদের নিয়ে ফ্রন্ট করতে সিপিএম এত আগ্রহী কেন? লিবারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কল্যাণ গোস্বামীর কথায়: ‘‘ওরা সংখ্যায় বিশ্বাসী। আগে ১১টি দল নিয়ে ফ্রন্ট ছিল তা বাড়িয়ে ১৭ দলের ফ্রন্ট করতে চায়। নামেই ফ্রন্ট, আসলে নিজেদের কর্তৃত্ব কায়েম করতেই অস্তিত্বহীন বাম সংগঠনগুলিকে নিয়ে একটা ‘বড়’ ফ্রন্ট গড়তে চায় সিপিএম। মানুষকে বলতে চায়, দেখ ‘এতগুলি’ দলের ফ্রন্ট নিয়ে আমরা চলি!’’
ভোট ছাড়া সিপিএমের ভাবনায় আর কিছু নেই। আর এ ব্যাপারে সিপিএম সংগঠনে নয়, সংখ্যায় বিশ্বাসী। তার প্রমাণ পাওয়া যায়, কিছু দিন আগে শতাধিক বামপন্থী গণ-সংগঠনের যৌথ মঞ্চ গড়ার প্রয়াসে। এ ক্ষেত্রে সিপিএম ১৭ দলের বৈঠকে কিছু আলোচনা না করেই ওই মঞ্চ গড়তে উদ্যোগী হয়। সিপিএম নেতৃত্ব ঘোষণা করেন, ওই শতাধিক গণ-সগঠনের যৌথ মঞ্চ বুথ-স্তর থেকে গঠন করা হবে। এসইউসি, লিবারেশনের গণ-সংগঠনগুলি ওই প্রয়াসে সামিল হয়নি। তার কারণ, তাদেরকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই সিপিএম একতরফা ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অর্থাৎ, সিপিএমের সেই বড়দা-সুলভ আচরণ। সরকারে থাকাকালীন যেমন আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক বা সিপিআই-কে যে ভাবে উপেক্ষা করত তা সুযোগ পেলে এখনও বেরিয়ে পড়ে। আর এখানেই যত সমস্যা।
ক্ষমতায় থাকাকালীন সিপিএম অন্য বামপন্থী দলগুলিকে সংগঠন তৈরি করতে নানা ভাবে বাধা দিয়েছে। বেশ কিছু দলের সংগঠনকে কার্যত শেষ করে দিয়েছে। নকশালপন্থী দলগুলিকে তো কাজ করতেই দেয়নি। কোনও এলাকায় কোনও এক জনও যদি নকশালপন্থী কোনও সংগঠনের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখিয়েছে তো তাকে নানা ভাবে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর মুখে বাম ঐক্যের কথা বললেও সিপিএম আদতে আচরণ পাল্টাতে পারেনি। তা সত্ত্বেও তথাকথিত ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং আনুবীক্ষণিক বামপন্থী সংগঠনগুলি সিপিএমের বর্ধিত বামফ্রন্টের তত্ত্বে লালায়িত। এমপি-এমএলএ বা কপালে থাকলে ছোটখাটো মন্ত্রিত্বের স্বপ্নে বিভোর সেই সব নেতা-নেত্রী এখন আর সিপিএমের সঙ্গে তাঁদের কোনও রাজনৈতিক বিরোধ আছে বলে মনেই করেন না। এঁরা আসলে সিপিএমের বর্ধিত ‘পরিবারের সদস্য’।
বর্ধিত বামফ্রন্ট গঠনের ডাক দিয়ে সিপিএম তার ভোটকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই তুলে ধরতে চাইছে। যেখানে নিহিত রয়েছে সিপিএমের আধিপত্যের মনোভাব। কিন্তু বৃহত্তর বাম ঐক্য বামপন্থার কয়েকটি মৌলিক দিককে তুলে ধরে। ভোট নয়, বৃহত্তর বাম ঐক্য লড়াই এবং সংগ্রামের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। বামপন্থার বুনিয়াদি দাবিগুলির উপর ভিত্তি করে শ্রেণি সংগ্রাম এবং তীব্র গণ-আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই বাম দলগুলি ঐক্যবদ্ধ হবে। বিভিন্ন বাম দলের মধ্যে যে নীতি ও কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে সেগুলি মেটাতে হবে। বুর্জোয়া দলগুলির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক বাম আন্দোলনের পরিপন্থী এবং সেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে না পারলে বাম ঐক্য সম্ভব নয় বলেই মনে করে বৃহত্তর বাম ঐক্যের দাবিদার লিবারেশন, এসইউসি-র মতো দলগুলি।
গোঁড়া বামপন্থী পথে যদি সমাজ পরিবর্তন করা না যায় তা হলে তা খোলসা করে বলতে হবে সিপিএমকে। অন্য বাম দলগুলিকেও এই প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্য স্পষ্ট করে বলতে হবে। লাল পতাকা, মার্কস, এঙ্গেলস্, লেনিন, স্তালিন বা মাওয়ের ছবি থাকলেই যে আজকের বিশ্বেও কাঁধে রাইফেল নিয়ে বিপ্লব করতে হবে এমন মাথার দিব্বি কেউ দেয়নি। বাস্তবতা মানতে গিয়ে যদি দেখা যায়, ইতিহাসে বর্ণিত পথে সমাজ পরিবর্তন আজ আর সম্ভব নয়, তা মানুষকে বললে কোনও ‘দাস ক্যাপিটাল’-এর অ-কল্যাণ হবে না।