গোটা দেশে প্রতি বছর সাত হাজারেরও বেশি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বলে একটি সমীক্ষায় জানা গিয়েছে। এবং ওই শিশুদের একটা বড় অংশ নির্যাতিত হয় স্কুলে এবং স্কুলবাসের মধ্যে।
সেই জন্য অভিভাবকদের একটি বড় অংশই এখন আর স্কুলবাস বা পুলকারকে নিরাপদ মনে করছেন না। অনেকেই স্কুলবাস বা পুলকারে ছেলেমেয়েদের স্কুলে না-পাঠিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন। এতে শহরে অন্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে পুলিশের অনুযোগ। তারা বলছে, এর ফলে যানবাহনের চাপ বাড়ছে।
স্কুলের পথে ছোটদের রক্ষা করতে একটি বিশেষ অ্যাপ নিয়ে এগিয়ে এসেছে খড়্গপুর আইআইটি। তাদের এক সমীক্ষায় অভিভাবকেরা জানিয়েছেন, ছেলে বা মেয়ে সকালে স্কুলে বেরোনোর পর থেকে বাড়ি ফেরা ইস্তক বুক ঢিপঢিপ করে। মনোবিদ জয়রঞ্জন রাম বলেন, ‘‘চার দিকে যে-ভাবে শিশু-নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে, তাতে বাবা-মায়ের ভয় পাওয়াটা তো স্বাভাবিক।’’ বাবা-মাকে সেই ভয় থেকে বাঁচাতেই বিশেষ অ্যাপ তৈরি করেছেন আইআইটি-র বিশেষজ্ঞেরা। স্কুলগাড়ি বা বাসে ছাত্রছাত্রীরা কত ক্ষণ থাকছে, বাস বা গাড়ি কোন কোন রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছে— সবই জানা যাবে ওই মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে।
মাস দুয়েকের মধ্যেই এই অ্যাপ কার্যকর হবে। ঠিক হয়েছে, প্রথমে এই অ্যাপ ব্যবহার করবে সাউথ পয়েন্ট স্কুল। ওই স্কুলের প্রচুর ছাত্রছাত্রী নিয়মিত স্কুলবাস ও পুলকার ব্যবহার করে। ওই অ্যাপ নিলে বাচ্চাদের স্কুলবাস বা পুলকারে তুলে দিয়ে অভিভাবকেরা অনেকটাই নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন বলে আশ্বাস দিচ্ছে আইআইটি। কেননা বাচ্চা যে-গাড়িতে উঠল, তার পুরো যাত্রাপথের ছবি নিজের মোবাইলে দেখতে পাবেন বাবা-মা। ফেরার পথেও একই ভাবে ছবি ফুটে উঠবে মোবাইলে। অর্থাৎ বাচ্চার যাতায়াতের পুরোটাই থাকবে অভিভাবকের নজরদারির আওতায়।
কী ভাবে নিরাপত্তা দেবে এই বিশেষ মোবাইল অ্যাপ?
আইআইটি খড়্গপুরের অধ্যাপক এবং এই প্রকল্পের প্রধান ভার্গব মৈত্র জানান, যে-সব স্কুল এই অ্যাপ ব্যবহার করবে, তাদের প্রত্যেক পড়ুয়ার পরিচয়পত্রের পিছনে একটি চিপ লাগিয়ে দেওয়া হবে। স্কুলবাস বা পুলকারে থাকবে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস)। যখনই কোনও ছাত্র বা ছাত্রী বাসে উঠবে এবং বাস থেকে নামবে, সঙ্গে সঙ্গে বার্তা পৌঁছে যাবে অভিভাবকের মোবাইলে। পাশাপাশি বাসের যাত্রাপথটি সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশের ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমে দেখতে পাবেন কর্মরত অফিসারেরা। বাসটি যদি কোনও দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অথবা কোনও এক জায়গায় বেশি ক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, তা-ও জানা যাবে অ্যাপে।
এই অ্যাপ ব্যবহার করার জন্য আইআইটি-র সঙ্গে হাত মিলিয়েছে কলকাতা পুলিশ। ডিসি (ট্রাফিক) সলোমন নেসাকুমার জানান, এই অ্যাপ ব্যবস্থা যথাযথ ভাবে বাস্তবায়িত করতে পারলে স্কুলের বাচ্চাদের নিরাপত্তার দিকটা অনেকটাই মজবুত হবে। আর চিকিৎসক জয়রঞ্জনবাবুর বক্তব্য, যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে বাচ্চাদের যাতায়াত সুরক্ষিত করা যায়, সেই ব্যবস্থাকে অবশ্যই স্বাগত জানানো উচিত।
স্বাগত জানাচ্ছেন ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়েরাও। অর্পিতা দত্তের ছেলে পৃথ্বীজিৎ ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। অর্পিতাদেবীর কথায়, ‘‘খুবই চিন্তায় থাকি। এ-রকম অ্যাপ এলে চিন্তা দূর হবে।’’ ববিতা রায়ের মেয়ে কণিকা একাদশ শ্রেণিতে পড়েন। ববিতাদেবী বলেন, ‘‘প্রযুক্তিকে এমন ইতিবাচক কাজে লাগাতে পারলে তো খুব ভালই হয়। আমাদের চিন্তা কমে।’’