সবং-কাণ্ড দৃশ্যতই তাঁদের বিরোধ মুছে দিয়েছিল। সেই ঘটনাই ফের পাশাপাশি আনল প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী এবং প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি মানস ভুঁইয়াকে। একই সভামঞ্চ থেকে দু’জনে হুঁশিয়ারি দিলেন, ‘‘এই ঘটনায় শেষ দেখে ছাড়ব।’’
সবং কলেজে ছাত্র পরিষদ কর্মী কৃষ্ণপ্রসাদ জানাকে পিটিয়ে খুনের ঘটনায় পুলিশি ভূমিকার প্রতিবাদে মঙ্গলবার মেদিনীপুর শহরে সভা করে কংগ্রেস। সেখানেই সবং-আন্দোলনের পাশে থাকার জন্য অধীরবাবুকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মানসবাবু বলেন, “আমি কৃতজ্ঞ প্রদেশ কংগ্রেসের কাছে। অধীরবাবুর কাছে। কৃষ্ণপ্রসাদ জানা শুধু সবং কলেজের ছাত্র নয়, সারা ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদী ছাত্র আন্দোলনের প্রতীক। আমি অধীরবাবুকে বলছিলাম, আমাদের শেষ দেখে ছাড়তে হবে।’’ অধীরবাবুরও বক্তব্য, “মানস ভুঁইয়া আন্দোলন করছেন। আমাদের আন্দোলন চলছে, চলবে। সবং নিয়ে যতদূর যেতে হয় যাব।”
ছাত্র খুনের প্রতিবাদে এর আগে সবংয়ে অবস্থান করেছেন মানসবাবু। কলকাতায় অনশন করেছেন। গোটা-পর্বেই মানসবাবুর পাশে থেকেছেন অধীরবাবু। সবং-কাণ্ডের প্রতিবাদে কংগ্রেসের ‘নবান্ন অভিযান’ হয়েছে। দু’জনের সম্পর্কের টানাপড়েনে দাঁড়ি পড়ায় উজ্জীবিত হয়েছেন কংগ্রেস কর্মীরাও। মেদিনীপুরের সভাতেও সেই পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। সভা চলাকালীন হাল্কা বৃষ্টি হয়। তখন মাথা ঢাকার জন্য অধীরবাবুর দিকে তোয়ালে বাড়িয়ে দিতে দেখা যায় মানসবাবুকে।
গত ৭ অগস্ট কৃষ্ণপ্রসাদ খুনের পর থেকেই গোটা ঘটনায় জেলা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরব কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, ঘটনার পরই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্র পরিষদের কোন্দলের দিকে ইঙ্গিত করায় সেই তত্ত্বে মান্যতা দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মমতা-ঘনিষ্ঠ পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের দোষীদের আড়াল করতে ছাত্র পরিষদের নিরীহ ছেলেদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ কংগ্রেস নেতৃত্বের।
এ দিনও এক সুরে মুখ্যমন্ত্রী এবং পুলিশ সুপারের সমালোচনা করেন অধীরবাবু ও মানসবাবু। সভায় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির কটাক্ষ, “পুলিশ সুপার ভারতী, দু’বেলা করছেন মা মমতার আরতি। কারণ, ভারতী জানেন আরতি না করলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজরে জমিদার থেকে জমাদার হয়ে যেতে হবে। তবে মমতা আর ভারতীর রক্তচক্ষুকে আমরা ভয় করি না।’’ সবং মামলায় পুলিশ সুপার নিজেই আইনের ফাঁদে পড়বেন বলেও মন্তব্য করেন অধীরবাবু। একই সঙ্গে তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘মেদিনীপুরেরই একটা গ্রামের নাম পিছাবনি। পুলিশের গুলির মুখে পড়েও ওই গ্রামের মানুষ পিছিয়ে যাননি। ভারতীদেবী আর তাঁর প্রোমোটার মমতাদেবী, দুই দেবীকেই বলছি, কংগ্রেস পিছাবনি। আমরা পালাব না। শেষ দেখে ছাড়ব।’’ মুখ্যমন্ত্রীর ভুটান সফর নিয়ে অধীরবাবুর কটাক্ষ, “কিছু দিন আগে উনি সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন শিল্পপতি ধরে আনতে। লন্ডনে গিয়েছিলেন। কেউ আসেনি। ভুটানে কী শিল্প আছে আমার জানা নেই।”
মমতা ও পুলিশ সুপারকে আগাগোড়া আক্রমণ করেছেন মানসবাবুও। সবংয়ের বিধায়কের কথায়, “বলা হল, ছাত্র পরিষদের গোলমালে খুন। আমি আমার বাচ্চাকে মারব? এই নাটকের ডিরেক্টর ভারতী ঘোষ। আর প্রোডিউসর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’’ ভারতীদেবীকে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারও চ্যালেঞ্জ ছোড়েন মানসবাবু। তিনি বলেন, ‘‘শ্রীমতী ভারতী ঘোষ মহোদয়া আপনি অনুগ্রহ করে আমাদের প্রস্তাবটি গ্রহণ করুন। পুলিশের পোশাক খুলে ফেলে সুন্দর পোশাক পরে কিংবা দিদির মতো শাড়ি পরে পায়ে চপ্পল লাগিয়ে তৃণমূল ভবনে গিয়ে তৃণমূলের সদস্যপদ নিয়ে ২০১৬ তে বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুন। ওটাই আপনার আসল জায়গা।’’
তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেস নেতৃত্বের মন্তব্য নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন ভারতীদেবী। তিনি বলেন, ‘‘সবং নিয়ে রোজ ওরা মিটিং-মিছিল করছেন। একজন আইপিএসকে কটূক্তি করছেন। সবংয়ের এই মামলা হাইকোর্টের বিচারাধীন। ওঁরাই হাইকোর্টে গিয়েছেন। এই কটূক্তি-ব্যক্তিগত আক্রমণের মানে বিচার ব্যবস্থার উপর ওঁদের কোনও ভরসা নেই।’’