জল-জঙ্গলে ঘেরা হিঙ্গলগঞ্জের গ্রামের মাটি খুঁড়লেই উঠে আসে নানা পৌরাণিক স্থাপত্য। মেলে মন্দিরের ভগ্নাংশ, ছোট-বড় কালো পাথর। পাথরের উপরে পদ্ম-চক্র, বিষ্ণু মূর্তি। ইতিহাসের চিহ্ন বহন করা এই সব বহু মূল্যবান ভাস্কর্য রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশই হয় নষ্ট হতে বসেছে, নয় তো চুরি করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
হিঙ্গলগঞ্জের মাটির তলায় চাপা পড়ে থাকা সভ্যতাকে জানার খুব একটা চেষ্টা হয়েছে, এমনটা নয়। ইতিহাস ঘেঁটে যত দূর জানা যায়, এক সময়ে হিঙ্গলগঞ্জে ছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের গড়। মৌর্য যুগের অস্তিত্বেরও সন্ধান মিলেছে এখানে। তবে নানা সময়ে জলোচ্ছ্বাস এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক তথ্যই মাটির তলায় চাপা পড়ে গিয়েছে।
তারই খানিকটা এখনও নিজের হেফাজতে রেখেছেন দেবাশিস বর্মন। তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, কালো পাথরের উপরে তৈরি পদ্মের উপরে শঙ্খ হাতে বিষ্ণুর হাতের অংশ। সুন্দরবনের ইতিহাসের গবেষক দেবাশিসবাবু জানালেন, পুকুর কিংবা খাল খননের সময়ে এখানকার মাটির তলা থেকে অনেক পৌরাণিক জিনিসপত্র, দেবদেবীর মূর্তির অংশ মিলেছে। তবে এ সবের বেশির ভাগ গ্রামের মানুষই যে যার মতো নিয়ে গিয়েছেন। তিনি জানালেন, আমবেড়ে গ্রামে পুকুর খননের সময়ে অনেক প্রত্নসামগ্রী উদ্ধার হয়েছিল। সেখান থেকেই পদ্মের উপর শঙ্খ হাতে বিষ্ণুর হাতের অংশ এবং মাটির পাত্র নিজের কাছে রাখতে পেরেছেন।
একটি বিষ্ণুমূর্তি।
দেবাশিসবাবুর বাড়ির পুকুর ধারে রয়েছে বড় পাথরের উপরে চক্র এবং বিষ্ণুমূর্তির ভাঙা অংশ। তা দেখিয়ে দেবাশিসবাবু দাবি করলেন, গড়পাড়া এলাকায় খাল খননের সময়ে মিলেছিল এমন অনেক পাথর। যা গ্রামের অনেকে নিয়ে যায়। সংরক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেই।
হিঙ্গলগঞ্জ পথের দাবি গ্রামে বহু প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ আছে। ওই গ্রামে আছে শাহাবরনের দরগা। যত দূর জানা যায়, মানসিংহ এই দরগা স্থাপন করেছিলেন। তবে প্রামাণ্য কিছু দলিল নেই। প্রত্নসামগ্রী ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা লোকগাথাও। মানস নাথ, সাহাজান সাহাজিরা বললেন, ‘‘জাগ্রত এই দরগার মাঠে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ শুক্রবার তালের মেলা (মিলন মেলা) বসে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসেন।
রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আধিকারিকেরা এসে দেখে গিয়েছিলেন এলাকা। তাঁরাই পরীক্ষার পরে জানিয়েছিলেন, এখানকার প্রত্নসামগ্রী মৌর্য যুগের স্মৃতিবহন করে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তারপরে আর না হয়েছে সংরক্ষণ, না হয়েছে উপযুক্ত খনন। হিঙ্গলগঞ্জের রমাপুর গ্রামে রায়মঙ্গল নদীর ভাঙনের ফলে খালের আকার নেয়। সেখানে মাটির গভীরে ভগ্ন অট্টালিকার সন্ধান মিলেছে। যার ইটের গঠন এবং আকার বেশ প্রাচীন। দেবাশিসবাবু বলেন, ‘‘প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে হিঙ্গলগঞ্জে খননকার্য চালালে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে।’’
২০০৪ সালে হিঙ্গলগঞ্জ হাইস্কুলে গঙ্গারিডি ইতিহাস ও বঙ্গীয় সাহিত্য সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হিঙ্গলগঞ্জের প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রত্ন নিদর্শন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইতিহাস বিভাগের প্রধান অতুলকৃষ্ণ ভৌমিক, বাংলা প্রত্নসাহিত্যের গবেষক অক্ষয়কুমার কয়াল, গঙ্গারিডি গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নরোত্তম হালদার। ছিলেন রাজ্যের তৎকালীন প্রত্ন অধিকর্তা গৌতম সেনগুপ্তও। সে সময়ে হিঙ্গলগঞ্জের প্রত্নসামগ্রী সংরক্ষণ এবং আরও নিবিড় গবেষণা নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। কিন্তু তারপরে আর কাজ বিশেষ এগোয়নি।
নামের ইতিহাস
১৭৮১ সালে যশোহরের জেলা জজ ও ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন টিলম্যান হেঙ্কেল। আঠারো শতকের শেষে সুন্দরবনের বাদাবন কেটে এলাকার উন্নয়নে সচেষ্ট হন তিনি। জল-জঙ্গল সরিয়ে বেরোয় উর্বর কৃষিজমি। হেঙ্কেল সাহেব ইছামতীর ধারে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হেঙ্কেলগঞ্জ বাজার’। এক সময়ে ‘হেঙ্কেলগঞ্জ’ই পরিচিতি পায় ‘হিঙ্গলগঞ্জ’ নামে।