Advertisement
E-Paper

মানুষের মতো যন্ত্র, তবে মানুষ তো না!

সে দৃষ্টি অন্তর্ভেদী। উজ্জ্বল দু’টি চোখ তাকিয়ে আছে সরাসরি। মধ্যবয়সী চেহারা, হাল্কা ভাঁজ পড়েছে গালের চামড়ায়। কাঁধ পর্যন্ত সোনালি চুল। মুখে স্মিত হাসি। হাত বাড়িয়ে দিল সে— ‘হ্যালো’।

সায়ন্তনী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০২:১১
স্রষ্টা ও সৃষ্টি। যন্ত্রমানবী নাদিনের (ডান দিকে) সঙ্গে সুইডিশ-কানাডিয়ান বিজ্ঞানী নাদিয়া থ্যালমান। ছবি: বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌজন্যে

স্রষ্টা ও সৃষ্টি। যন্ত্রমানবী নাদিনের (ডান দিকে) সঙ্গে সুইডিশ-কানাডিয়ান বিজ্ঞানী নাদিয়া থ্যালমান। ছবি: বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌজন্যে

সে দৃষ্টি অন্তর্ভেদী। উজ্জ্বল দু’টি চোখ তাকিয়ে আছে সরাসরি। মধ্যবয়সী চেহারা, হাল্কা ভাঁজ পড়েছে গালের চামড়ায়। কাঁধ পর্যন্ত সোনালি চুল। মুখে স্মিত হাসি। হাত বাড়িয়ে দিল সে— ‘হ্যালো’।

যন্ত্রমানবী নাদিন! আক্ষরিক অর্থেই যন্ত্র ও মানুষ। কারণ এ যন্ত্রের ‘মান’ও আছে, ‘হুঁশ’ও আছে। রূপে-গুণে-কাজে-কর্মে মানুষের মতোই।

এ হেন ‘নাদিন’কে বানিয়েছেন সিঙ্গাপুরের ‘ন্যানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি’র সুইডিশ-কানাডিয়ান অধ্যাপিকা নাদিয়া থ্যালমান, অনেকটা নিজের চেহারার আদলেই। দু’জনকে পাশাপাশি দেখলে মিল চোখে পড়বেই। নাদিয়া সেটাই চেয়েছিলেন। এমন কাউকে চেয়েছিলেন, যে অনেকটা তাঁর মতো। নাদিন-কে দেখতে চেয়েছিলেন সঙ্গী হিসেবে!

Advertisement

রোবট বন্ধু? রক্ত-মাংসের বন্ধুত্ব ইতিমধ্যেই পা বাড়িয়েছে ভার্চুয়াল জগতে। এ বার কি তবে মানুষের বদলে বন্ধু হিসেবে রোবটের চাহিদাও তৈরি হবে অদূর ভবিষ্যতে?

সত্যজিৎ রায়ের ছোট গল্প ‘অনুকূল’-এর কথা মনে পড়তে পারে। দোকান থেকে ‘রোবট-চাকর’ ভাড়া করে এনেছিলেন এক ভদ্রলোক। দেখতে-শুনতে মানুষের মতো। রান্না ছাড়া ঘর-গেরস্থালির প্রায় সব কাজই পারত। মুখের কথাটি খসাতে হতো না, তার আগেই হাতে হাতে সব কাজ হয়ে যেত। নাদিন যেন অনেকটা অনুকূলের মতোই।

সংবাদপাঠিকা বা রিসেপশনিস্ট, অচিরেই যে কোনও ভূমিকা পালন করতে পারবে নাদিন। বাড়িতে শিশু বা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখাশোনা করতে পারবে। ‘‘সঙ্গী হিসেবে নাদিন অসাধারণ,’’ বললেন নাদিয়া। তাঁর কথায়, ‘‘ও একেবারে বন্ধুর মতো। এক বার যদি আলাপ হয়, ও ভুলবে না আপনার কথা। কী কী কথা হয়েছিল প্রথম সাক্ষাতে, তা-ও আউড়ে দিতে পারবে সে।’’

জাপান প্রথম যন্ত্র-মানুষ বানালেও নাদিন এখানেই অন্যদের থেকে আলাদা। আরও একটা বিশেষত্ব আছে তার। মন আছে, মন খারাপ হওয়াও আছে। ভাল লাগা আছে, খারাপ লাগাও আছে!

কিন্তু কী ভাবে?

‘‘সবটাই প্রযুক্তির কেরামতি,’’ বললেন নাদিয়া। সফ্‌টওয়্যারে ‘অনুভূতি’ পুরে দেওয়া হয়েছে নাদিনের শরীরে। রাখা হয়েছে স্মৃতিশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, আদবকায়দা, কথা বলা, অন্য কোনও ব্যক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মতো ক্ষমতাও। তাই ‘‘আপনি হেসে কথা বললে, ও হাসবে। খারাপ ব্যবহার করলে ও তা-ই করবে,’’ বলছেন বিজ্ঞানী।

এ তো গেল গুণের কথা। আর রূপ? নাদিয়া জানালেন, মানুষের চেহারা দিতে নাদিনের যান্ত্রিক দেহে বসানো হয়েছে কৃত্রিম চামড়া। পেশীর পরিবর্তে বসানো হয়েছে ‘এয়ার মোটর’। যা বজায় রাখবে চামড়ার টানটান ভাব। মুখে ফুটিয়ে তুলবে রাগ, দুঃখ, আনন্দ, উচ্ছ্বাস।

তা হলে মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের তফাৎ ঘুচে গেল? সমাজতত্ত্ববিদ রামানুজ গঙ্গোপাধ্যায়ের দাবি, কখনওই না। মানুষের জায়গা দখল করার ক্ষমতা যন্ত্রের নেই। কারণ সে কিছুতেই মানুষের মতো করে ভাবতে পারবে না যতই সফ্‌টওয়্যারে অনুভূতি পুরে দেওয়া হোক না কেন। ‘‘রাগের বদলে রাগ দেখাতে পারে সে, কিন্তু মানুষ তো সব সময় তা করে না,’’ বলছেন তিনি।

কিন্তু অনেক জায়গাতেই তো আজকাল মানুষের বদলে যন্ত্র নিয়োগ করা হচ্ছে কাজে। বেকারত্বের বাজারে তবে কি মানুষের নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী রোবটই? কিছু দিন আগেই তো খবরে এসেছিল চিন। শিরোনাম— ‘টিভিতে খবর পড়ছে রোবট। চাকরি যাওয়ার চিন্তায় সংবাদপাঠকরা।’ গত বছর ফোক্সভাগেনের কারখানায় রোবটের হাতেই ‘খুন’ হন এক কর্মী। পরে ফোক্সভাগেন কর্তৃপক্ষ দাবি করেন, ‘‘পুরোটাই দুর্ঘটনা। তবে রোবট নিয়োগ করায় চাকরি খুইয়েছেন অনেকেই। সুযোগ বুঝে তা-ই গোলমাল পাকাচ্ছে একাংশ।’’

সমাজতত্ত্ববিদদের মতে, প্রথম যখন কম্পিউটার আসে, চাকরি যাওয়ার আশঙ্কায় একই রকম হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। এখন কি তবে রোবটের পালা? নাদিয়ার জবাব, ‘‘যে কাজ করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব, শুধু্ সেই সব কাজের জন্যই নাদিনকে বানিয়েছি। সব আবিষ্কারেরই তো ভাল-মন্দ আছে।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy