বকেয়া বিল মেটালে বলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-কে চিঠি দিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুসারে, গৌতম আদানির সংস্থা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, বকেয়া না মেটালে বিদ্যুৎ সরবরাহ ধাক্কা খেতে পারে। পিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অনেক দিন ধরেই বিরোধ চলছে আদানি গোষ্ঠীর। তা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। তার মধ্যেই পিডিবিকে চিঠি দিয়েছে আদানি গোষ্ঠী।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুসারে, গত ২৯ জানুয়ারি পিডিবিকে চিঠি দেন আদানি পাওয়ার লিমিটেডসের ভাইস প্রেসিডেন্ট অবিনাশ অনুরাগ। তাতে লিখেছেন, চুক্তি অনুসারে তাদের পাওয়া প্রায় ৫৭ কোটি ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আদানি গোষ্ঠীর তরফে জানানো হয়েছে, এর মধ্যে ৩০ কোটি ডলার বকেয়া নিয়ে পিডিবির সঙ্গে কোনও বিরোধ নেই তাদের। ভারতীয় মুদ্রায় তার মূল্য প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বকেয়া ৭০ কোটি ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ছ’হাজার কোটি টাকা। আদানি গোষ্ঠীর সূত্রকে উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরে তাদের অনুরোধ করে কিছু বকেয়া মিলেছে। গত বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে নিয়মিত ভাবে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করেছে পিডিবি। আগের বকেয়ার কিছু অংশও শোধ করা হয় বলে খবর। এতে মোট বকেয়া কিছুটা কমে। তবে গত দু’মাস ধরে পিডিবি বিল পরিশোধ কমিয়ে দিয়েছে। এতে পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে উঠছে।
সূত্রের খবর, বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ চালিয়ে যেতে পিডিবি-কে ১১ কোটি ২৭ লক্ষ ডলার পরিশোধ করার অনুরোধ করেছে আদানি সংস্থা। ভারতীয় মুদ্রায় তার পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। সংস্থা জানিয়েছে, এই টাকা না পাওয়ায় কয়লা আমদানি করতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। পুরো বকেয়া কবে শোধ করা হবে, তার একটা সময়সূচি জানিয়ে দেওয়ার জন্য মুহাম্মদ ইউনূস সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছে। বকেয়ার কারণে মূল বিলের সঙ্গে যোগ হয়েছে সারচার্জও।
পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় আদানির বকেয়া শোধ করার পরিমাণ একটু কমেছে। শোধের পরিকল্পনা রয়েছে, মার্চ থেকে পরিমাণ বাড়তে পারে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি হয় ভারতের আদানি পাওয়ারের। চুক্তি অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে পরবর্তী ২৫ বছর ১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঢাকাকে সরবরাহ করার কথা আদানির সংস্থার। কিন্তু হাসিনা সরকারের পতনের পরে পরিস্থিতি বদলায়। আদানি গোষ্ঠীর দাবি, চুক্তি মেনে এ পর্যন্ত বকেয়া টাকাও মেটায়নি বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের চুক্তি অনুসারে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আদানি পাওয়ার। কিন্তু ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেই সরবরাহের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনে ইউনূস সরকার। আদানি পাওয়ারের কাছে বাংলাদেশের বকেয়াও বাড়তে থাকে। সেই নিয়ে আগেও বাংলাদেশকে চিঠি দিয়েছিল আদানি গোষ্ঠী। এ বার ফের দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, হাসিনার আমলে যে সমস্ত বিদ্যুৎ চুক্তি হয়েছিল, সেগুলিকে ঘিরে প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ। আদানি-চুক্তি নিয়েও পৃথক রিপোর্ট তৈরি করে সেই কমিটি। তারাই চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে জানায়, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে করা চুক্তিগুলির মধ্যে আদানি-চুক্তিই ‘নিকৃষ্টতম’! এ জন্য প্রতি বছরই পাঁচ থেকে ছ’হাজার টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। তাতে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশের। এই নিয়ে মামলাও চলছে বাংলাদেশে।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন সূত্রে খবর, ঘটনার পর আদানি গোষ্ঠী দাবি করেছে, বাংলাদেশের পর্যালোচনা কমিটির রিপোর্ট তারা পায়নি। বাংলাদেশের তরফেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। বিপুল পরিমাণ বকেয়া থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি বলেও জানিয়েছে আদানি গোষ্ঠী।