Advertisement
E-Paper

ওভাল অফিসে জামাইরাজ আসতে চলেছে

‘‘যম, জামাই, ভাগনা তিন নয় আপনা’’। বাংলার প্রাচীন প্রবাদটি শুনলে তোড়ের মুখে উড়িয়ে দিতে পারেন সদ্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারণ, জেরার্ড কুশনারের মতো ‘সোনার টুকরো’ জামাই রয়েছে তাঁর। যে জামাই-এর চালে মাত হলেন হিলারি ক্লিন্টন। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে আগামী চার বছর ওভাল অফিসে ‘জামাইরাজ’ হতে চলেছে।

রত্নাঙ্ক ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৬ ১৪:১০
মুখোমুখি ট্রাম্প, কুশনার। ছবি: এএফপি।

মুখোমুখি ট্রাম্প, কুশনার। ছবি: এএফপি।

‘‘যম, জামাই, ভাগনা

তিন নয় আপনা’’।

বাংলার প্রাচীন প্রবাদটি শুনলে তোড়ের মুখে উড়িয়ে দিতে পারেন সদ্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারণ, জেরার্ড কুশনারের মতো ‘সোনার টুকরো’ জামাই রয়েছে তাঁর। যে জামাই-এর চালে মাত হলেন হিলারি ক্লিন্টন। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে আগামী চার বছর ওভাল অফিসে ‘জামাইরাজ’ হতে চলেছে।

কূটনীতির জগতে প্রবাদপ্রতিম হেনরি কিসিঙ্গারও মনে করেন, আগামী চার বছর ট্রাম্পের অন্যতম ভরসার পাত্র হয়ে থাকবেন কুশনার।

ভরসার কিছু নমুনা ইতিমধ্যেই পাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের এই অধ্যায়ে দায়িত্বে ছিল ক্রিস ক্রিস্টি। নিউ জার্সির গভর্নর ক্রিস্টি রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদের দৌড়ে নেমেছিলেন। পরে সরে যান। জয়ের পরে ক্রিস্টিকে পরিবর্তনের সময়ে কাণ্ডারী হিসেবে রাখবেন বলেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে সরিয়ে দিয়ে ভাইস-প্রেসিডেন্ট পেনসকে দায়িত্ব দিলেন ট্রাম্প। এমনিতে ট্রাম্পের মেজাজের সঙ্গে এই হুটহাট পরিবর্তন ভাল মতোই যায়। কিন্তু বিষয়টি বোধহয় আর একটু গভীর। তা হলে একটু ফিরে তাকাতে হয়। ২০০৫-এ মার্কিন অ্যাটর্নি থাকার সময়ে চার্লস কুশনারকে কর ফাঁকির দায়ে জেলে পাঠিয়েছিলেন ক্রিস্টি। চালর্স হলেন জেরার্ডের বাবা। জেরার্ড অবশ্য ক্রিস্টিকে সরিয়ে দেওয়ার দায় নিতে চাননি।

কিন্তু জেরার্ড কুশনার কে? ৩৫ বছর বয়সী কুশনার শুধু ইভাঙ্কার স্বামী নন, ট্রাম্পের মতো রিয়েল এস্টেট ব্যবসাও রয়েছে তাঁর। আড়ে-বহরে ট্রাম্পের সমান না হলেও সেই ব্যবসায়ই থেমে থাকেননি কুশনার। ২০০৬-এ নিউ ইয়র্ক অবজারভার পত্রিকা কিনে নেন। এ ছাড়াও ডিজিট্যাল ব্যবসাও বিনিয়োগ করেছেন। আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মা, থিইয়েল-এর সঙ্গে মিলে ক্যাডরে-তে বিনিয়োগ করেন। কুশনারের বিস্তৃত ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য আছে। সঙ্গে আছে আমেরিকার এলিট বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার তকমাও।

দুর্জনে বলে, ধনী বাবার দৌলতে হাভার্ডে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন কুশনার। সেই সূত্রে মার্কিন দেশের ক্ষমতাবানদের সঙ্গেও কুশনারের সখ্যতা রয়েছে আগে থেকেই। কুশনারের পরিবার বরাবর ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট নির্বাচন তহবিলে বড় অঙ্কের চাঁদা দেয়। ফলে ডেমোক্র্যাট মহলেও কুশনারের যাতায়াত আছে।

নীরবে সক্রিয় থাকতে পচ্ছন্দ করেন কুশনার। নিজের ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্টটি বেশ কয়েক বছর আগে খোলা হলেও সে ভাবে টুইট করেন না কুশনার। তবে সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কে তার সতর্ক নজর রয়েছে। নজরটি কেমন তার প্রমাণ ট্রাম্পের জয়। কী ভাবে? উত্তর দিচ্ছেন এরিক স্কিমিড। গুগ‌্ল-এর প্রাক্তন সিইও এরিক স্কিমিডের মতে, এ বারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বিস্ময় কুশনার। প্রায় কপর্দক শূন্য অবস্থায় নির্বাচনী প্রাচর চালিয়ে জয় নিয়ে এলেন কুশনার। আর এ কাজে নিবিড় ভাবে ব্যবহার করা হয় সোশ্যাল মিডিয়াকে।

কিন্তু শ্বশুরের এ লড়াই-এ প্রথম থেকে কিন্তু জড়িয়ে ছিলেন না কুশনার। খানিকটা বাইরে থেকেই লক্ষ রাখছিলেন। কর ব্যবস্থা এবং ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে শ্বশুরকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন। কিছুটা গবেষণার কাজে সাহায্য করছিলেন।

কিন্তু ক্রমেই কুশনার শ্বশুরের সঙ্গে আগ্রহীদের যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠছিলেন। রিপাবলিকান প্রাইমারির লড়াই-এ যতই এগিয়ে যাচ্ছিলেন ট্রাম্প ততই তার সঙ্গে রিপাবলিকান দলের হত্তাকর্তাদের বিরোধ বাড়ছিল। রিপাবলিকানদের মধ্যে অনেকে এমন ছিলেন যাঁদের পক্ষে সরাসরি ট্রাম্পকে সমর্থন করা সম্ভব ছিল না। তা হলে দলের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যেত।


নির্বাচনে জেতার পর মেয়ে ইভাঙ্কা এবং কুশনারের সঙ্গে ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স।

কুশনার বুঝেছিলেন ট্রাম্প নির্মাণ শিল্পের মহারাজ হলেও ট্যাঁকের জোরে হিলারির সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা নেই। তার ভিন্ন পথ। তবে একটা বিষয়ে ট্রাম্প প্রথম থেকে জোর দিয়েছিলেন। নির্বাচনী তহবিলে যা চাঁদা উঠছে তার প্রত্যেকটি ডলারের যেন উপযুক্ত ব্যবহার হয়। কিন্তু কোন পথে? ভাবনার দরজা খুলে যায় আগের বছর নভেম্বরে ট্রাম্পের প্রাইভেট জেটে ফিস স্যান্ডুইচ খেতে খেতে আড্ডায়। নির্বাচনী প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়াকে কম ব্যবহার করা হচ্ছে বলে শ্বশুরের কাছে অনুযোগ করছিলেন কুশনার। বদলে ট্রাম্প কুশনারকেই তার ফেসবুকে প্রচারের দায়িত্ব নিতে বলেন।

কুশনার বুঝেছিলেন মার্কিন এলিট সমাজে ট্রাম্প ব্রাত্য হলেও অন্য অংশে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’-এর আবেদন রয়েছে তা সে যতই বিতর্কিত হোক না কেন। সেটাকে সুকৌশলে আরও চাগিয়ে দিতে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ট্রাম্পের প্রথাগত নির্বাচনী প্রচারের ভোল বদলে দেন। তথ্যপ্রযুক্তি জগতের বিশেষজ্ঞদের ব্যবহার করতে থাকেন। ধীরে ধীরে ট্রাম্পের প্রচারের সিইও হয়ে ওঠেন কুশনার। অন্য দিকে, হিলারি তাঁর বিপুল তহবিল এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে অনেকটা ২০০৮-এ ওমাবার ধাঁচে প্রচার চালাতে থাকেন। কিন্তু গত আট বছরে অনেক কিছু বদলেছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যে বিপুল উত্থান হয়েছে সে দিকে বিশেষ নজর দেননি। সেই খামতির পূর্ণ সুযোগ নিয়েছেন কু‌শনার।

ট্রাম্পের প্রতিটি বিতর্কিত মন্তব্যকে মার্কিন জনতার ঠিক অংশের কাছে পৌঁছে গিয়েছে কুশনারের কৌশলে। জেরার্ড যে ভাবে অন-লাইনে প্রচারকে বুঝেছেন তা প্রথাগত মিডিয়ার পণ্ডিতদের পুরো বোকা বানিয়েছে বলে মনে করেন এরিক স্কিমিড। একটা উদাহরণ। ফেসবুকের মাইক্রো-টার্গেটিং-কে ব্যবহার করে কুশনারের দল ট্রাম্পের প্রচারের লাল টুপি বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ দিনে আট হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে দিনে ৮০ হাজার ডলারে নিয়ে গিয়েছিল। মাত্র এক লক্ষ ৬০ হাজার ডলার ব্যবহার করে ট্রাম্পের ছোট ছোট ভিডিও অন-লাইনে প্রচার করা হয়েছিল। প্রায় সাত কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ সেই ভিডিও দেখেছেন।

ট্রাম্প রিপাবলিকান দলের প্রার্থী পদ পাওয়ার পর থেকে পুরোদস্তুর তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের মতো ডে়টা হাব বানিয়ে ফেলেছিলেন কুশনার। সেই হাবে প্রায় ১০০ জন কর্মী ছিলেন। অর্থ সংগ্রহ, প্রচারের জায়গা স্থির করা, কোন অংশের কাছে কোন বার্তা পাঠানো হবে— সবই হাবে স্থির হত। প্রতিটি পয়সা যাতে ঠিকঠাক ব্যয় হয় তার দিকে কুশনারের কড়া নজর ছিল। কী ভাবে সব চেয়ে কম খরচে ভোটারদের কাছে পৌঁছন যায় সে দিকেও নজর রাখা হত। প্রতিটি বিজ্ঞাপনের দিকে নজর দেওয়া হত। যে বিজ্ঞাপন সাড়া ফেলতে পারত না তৎক্ষণাৎ তা সরিয়ে দেওয়া হত। জনতার কোন অংশে ট্রাম্পের বার্তা কী ভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় তা নিয়েও নানা সমীক্ষার সাহায্য নেওয়া হত। প্রকাশিত হিসেবে দেখা যাচ্ছে এর ফলে হিলারির তুলনায় ট্রাম্পের নির্বাচনী ব্যয় প্রায় অর্ধেক। আর সেই খরচেই কিস্তি মাত করে গেলেন ট্রাম্প।

স্বজনপোষণ বিরোধী আইনে কুশনারকে কোনও পদে বসাতে পারবেন না ট্রাম্প। কিন্তু তাঁর প্রেসিডেন্টের আসনের পিছনে, পর্দার আড়ালে, নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে চলেছেন কুশনার, এই বিষয়ে প্রায় সবাই একমত।

আরও পড়ুন:
ইভাঙ্কা ট্রাম্প! ভাবী প্রেসিডেন্ট কন্যার জীবনও কিন্তু কম বর্ণময় নয়
মার্কিন কূটনীতি ভেঙে ট্রাম্পের ফোন তাইওয়ানে, তীব্র ক্ষোভ বেজিঙের

Jerad Kushner Donald Trump White House
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy