বুধবারের জোড়া ভূমিকম্পে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজ়ুয়েলায় অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহতের সংখ্যা ৯৭১। বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছেন সে দেশের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ়। তিনি বলেন, ‘‘ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও কিছু মানুষ আটকে পড়ে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের সন্ধানে বিভিন্ন উদ্ধারকারী দল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে দিকে পৌঁছেছে।’’
বুধবার সন্ধ্যায় (স্থানীয় সময় অনুসারে) ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে পর পর দু’টি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল ভেনেজ়ুয়েলা। রিখটার স্কেলে প্রথমটির মাত্রা ছিল ৭.২। দ্বিতীয়টির ৭.৫। সে দেশের সরকার জানাচ্ছে, বিগত এক শতাব্দীর মধ্যে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলির মধ্যে অন্যতম এ বারের কম্পন। তার অভিঘাতে রাজধানী কারাকাসের সাইমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-সহ দেশের একাধিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে পড়েছে বহু বাড়িঘর, শিল্প পরিকাঠামো। বন্দরশহর লা গুয়াইরা পুরোপুরি বিধ্বস্ত। এমনকি, কারাকাস থেকে প্রায় ১,৭০০ কিলোমিটার দূরে ব্রাজিলের আমাজ়ন অঞ্চলেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাব বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৭৭ লক্ষ নাগরিক।
আরও পড়ুন:
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বলেন, ‘‘ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল ও বাড়িঘর পুনর্নির্মাণে ২০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি তহবিল গঠন করা হচ্ছে এবং অর্থ দফতর ও অর্থমন্ত্রীকে এই কর্মসূচি তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’’ আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা (ইউএসজিএস) বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, জোড়া কম্পনে দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশে ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে! ইউএসজিএস-এর তরফে বলা হয়েছে, প্রথম ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পটি ক্যারিবীয় উপকূলে মোরনের পশ্চিমে, কারাকাস থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে আঘাত হানে। এর গভীরতা ছিল ২২ কিলোমিটার। তার এক মিনিটের মধ্যেই ৭.৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়, যার গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার এবং কেন্দ্রস্থল ছিল মোরনের দক্ষিণ-পশ্চিমে ১৬ কিলোমিটার দূরে।
আরও পড়ুন:
বৃহস্পতিবার ভেনেজ়ুয়েলার সরকারি টেলিভিশন দেখিয়েছে, উদ্ধারকর্মীরা বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছেন। বহু সাধারণ মানুষও নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে হাত লাগিয়েছেন। ধুলো-কাদায় মাখামাখি জীবিত তিন শিশুকে লা গুইরা প্রদেশে ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশ লা গুইরার একটি হাসপাতালের বাইরে বহু আহত চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের বেডে সকলের স্থান সংকুলান না হওয়ায় মেঝেতেই ঠাঁই হয়েছে তাঁদের। নিরাপত্তার কারণে, কারাকাসে মেট্রো পরিষেবা মুলতুবি রাখা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে, পাইলপাইনে এলপিজি সরবরাহ। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট, ল্যান্ডলাইন টেলিফোন ও টেলিভিশন পরিষেবা বিনামূল্যে দেওয়ার ঘোষণা করেছে ভেনেজ়ুয়েলা সরকার। মার্কিন বিদেশসচিব রুবিও বৃহস্পতিবার ভোরে এক্স-এ পোস্ট করে জানান, আমেরিকা তাৎক্ষণিক ভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা-সহায়তা এবং মানবিক ত্রাণ ভেনেজ়ুয়েলায় পাঠাচ্ছে। ঘটনাচক্রে, ভেনেজ়ুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গত জানুয়ারিতে অপহরণ করেছিল মার্কিন সেনা। তিনি এখনও আমেরিকার জেলে বন্দি।
আরও পড়ুন:
ভেনেজ়ুয়েলা একাধিক ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থিত হলেও দক্ষিণ আমেরিকান ও ক্যারিবীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সেখানে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা তুলনামূলক ভাবে বিরল। ভেনেজ়ুয়েলায় ভূমিকম্প তুলনামূলক ভাবে বিরল হলেও মেক্সিকো ও চিলি-সহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী এলাকায় এটি নিয়মিত ঘটে। এ সব দেশ ভূকম্পনপ্রবণ টেকটোনিক বলয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর মধ্যে অবস্থিত। ইউএসজিএস-এর বিবৃতি বলছে বিশ্বের ৯০ শতাংশ ভূমিকম্পের জন্য এই অঞ্চল দায়ী। বৃহস্পতিবার ভেনেজ়ুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো মানুষকে বাইরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ আফটার শকের ফলে বড় ভবনগুলির আরও ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, বিপর্যয়ের এই আবহে আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে তাঁর সরকার। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ভেনেজ়ুয়েলায় আসতে শুরু করেছে। বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতে সরকারের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছেন বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো।