বনানী থেকে পায়ে হেঁটে কামাল আতাতুর্ক মার্গ হয়ে গুলশনে পৌঁছতে মিনিট পনেরোর বেশি লাগার কথা নয়। কিন্তু ভোট নিয়ে যেখানে উত্তেজনা প্রায়শই লাগামছাড়া সেখানে রাস্তায় ভিড় ইদের উৎসবের মতোই। স্থানে স্থানে ম্যাটাডোর দাঁড় করিয়ে হাতে মাইক নিয়ে ছোট ছোট বক্তৃতা শুনতে শুনতে এগিয়ে যাওয়া ছিল কাল পর্যন্তও। আজ থেকে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে প্রচার বন্ধ, কিন্তু চোরাগোপ্তা চলছেই। প্রচারের এ যেন ‘রিল’-এর কৌশল! বেশি ক্ষণ কারও মনোযোগ ধরে রাখতে হচ্ছে না, সার কথাটি বলে আবার এগিয়ে যাওয়া। ঢাকার মোড়ে মোড়ে জটলা নিছকই ভোট গুলতানির, যা কলকাতার দোসর!
গত বছরই নতুন দল গড়ছে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ভাসানী জনশক্তি পার্টি। আসলে বিএনপির-ই মঞ্চ, তারা ভোট চাইছে ধানের শিসে, জামায়েতে ইসলামীকে নিশানা করে। গুলশনের আকাশ আঁচড়ানো বহুতল, ব্যাঙ্ক, বিপণি আর কাফে অধ্যুষিত ছ’মাথার মোড়ে পথচারীরা দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে শুনছেন মাইক হাতে নেতার বক্তৃতা। ‘‘কারণ, এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু দিন পরে ঘটল।’’ খেজুরের পাহাড়ের মধ্যে বসে বললেন সেলিম জাহিদ। নাভানা টাওয়ার্সের একতলায় তাঁর দোকান। সৌদি থেকে খেজুর আমদানি করে বিক্রি করেন। বলছেন, ‘‘ইদের মতোই উৎসবের পরিবেশ। ছুটিও পড়ে গিয়েছে। অনেক দিন পর ভোট হচ্ছে। মানুষও বদল চেয়েছিল। সব মিলিয়েই আর কী।’’
পেশাসূত্রে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে আসার সুযোগ হয়েছে। চড়ুই, শালিক ছেড়ে দিন একটি ফড়িংও উড়তে দেখিনি এই দু’বার মুখে ইস্তাহার নিয়ে। রাস্তায় দেখিনি ভোট নিয়ে গরম আলোচনা, রেষারষি। সবই ছিল পূর্বনির্ধারিত। ২০২৪-এর জাতীয় নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। আর এখন এই লেখাটি তৈরি করার সময় অভিজাত পাড়ার নৈঃশব্দ্য ভেদ করে বাংলাদেশের কার্যত জাতীয় বাহন সাইকেল রিকশ থেকে ভেসে আসছে টুকরো টুকরো বাক্য— ‘দেশকে ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেবেন না’, ‘উন্নয়নকে জঙ্গিবাদের হাতে তুলে দেবেন না’। ‘সাতচল্লিশ, একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধীদের পরাজিত করতে ধানের শিষে ভোট দিন’।
এই টুকরো টুকরো ছবি খালি চোখে দেখলে মনে হচ্ছে বিএনপি-রই তো ক্ষমতায় আসার কথা। তাদের পিছনে সমর্থন রয়েছে সংখ্যালঘুর। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বড় অংশ এখন বিএনপিপন্থী। তাদের পুরনো ভোটভিত্তিও রয়েছে। জামাতকে ঠেকাতে আসরে নেমেছেন মুসলমান ধর্মপ্রাণ নেতাদের বড় অংশ। তাদের মধ্যে যেমন রয়েছে হেফাজতে ইসলামি, তেমনই সাহারানপুরের দারুল উলুম দেওবন্দ আদলে গড়া বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলি। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সর্বজন শ্রদ্ধেয় খতিব জামায়েতে ইসলামীর পক্ষে নন। এঁদের প্রভাব ধর্মপ্রাণ মুসলমান জনজীবনে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে দেওয়ালে লেখা নিষেধ থাকায় পথে ঘাটে ল্যাম্পপোস্টে ফ্লেক্স টাঙানো। ভোট শেষ হলেই যাতে খুলে ফেলা যায়। পরিবেশ ও দৃশ্যদূষণের প্রশ্নে অভিনন্দনযোগ্য এই সিদ্ধান্তের পরেও অদৃশ্য দেওয়াল লিখনে কিন্তু জামাত ঘাড়ের কাছেই নিঃশ্বাস ফেলছে বিএনপি-র। সাংগঠনিক শক্তি এবং মুসলিম ধর্মগুরুদের বড় অংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও। এটাই এ বারের বাংলাদেশের ভোটে সবচেয়ে বড় ধাঁধা। বহু সমীক্ষক এবং বিশেষজ্ঞের বক্তব্য, মনে করা হচ্ছে যে দলই জিতুক, জেতা হারার মধ্যে ব্যবধান হবে পঁচিশ থেকে তিরিশটি আসনের মধ্যে।বাংলাদেশের থিংক ট্যাঙ্ক, ‘সেন্টার ফর গর্ভনমেন্ট স্টাডিজ়’-এর প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের কথায়, ‘‘জামাতের শক্তিশালী হয়ে ওঠার কারণ রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিএনপি যখন চাঁদাবাজি ও জুলুমের মতো অনেক ঘটনা ঘটিয়েছে, তখন জামাত নিঃশব্দে তাদের প্রভাব বাড়িয়ে গিয়েছে। সম্বিৎ ফিরতে বিএনপি নেতৃত্ব দলের প্রায় ৭ হাজার কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও পুরো বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এটাও ঘটনা, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বহু বিএনপি নেতা কর্মীর দোকান-পাট, জমি জায়গা কেড়ে স্থানচ্যূত করেছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেই জমি দখলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বিএনপির সদস্যেরা। গ্রামের মানুষের কাছে গিয়ে (শহরাঞ্চলেও) জামাতের গত দেড় মাসে প্রথম বক্তব্যটিই ছিল, ‘‘আপনারা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-র দুর্নীতি এবং অপশাসনও ভোগ করেছেন। তা হলে এক বার জামাতকে সুযোগ দিতে ক্ষতি কী?’’
মগবাজারের সরু গলিতে জামাতের অফিস এখন ভিড়ে ছয়লাপ। সামনের অপ্রশস্ত চত্বরে দিনে দু’বেলা সাংবাদিক সম্মেলন করছেন দলের সহ সাধারণ সম্পাদক এবং মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত আহসানুল মাহবুব জুবের। বলছেন, ‘‘বারবার নির্বাচন কমিশনকে বলছি, বিশেষ একটি দলের দিকে হেলে থাকলে চলবে না। এই জাতি তা মেনে নেবে না। বিপুল অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে রয়েছে। বিগত সময়ে যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন, তাঁরা এই অস্ত্র বিতরণ করেছিলেন। সেগুলির উদ্ধার হওয়া প্রয়োজন। জনগণ যেন ভোটের সময় আতঙ্কে না থাকেন।’’ জানতে চাইলাম, তাঁদের ইস্তাহারে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির কথা উল্লেখ করে কী বার্তা দিতে চাইছে জামাত? বলছেন, ‘‘ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশীই শুধু নয়, উন্নয়নের অংশীদারও বটে। আমরা সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে সব দেশের সঙ্গে কাজ করতে চাই। চাই যে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক যে সমস্যার জায়গা রয়েছে সেগুলির সমাধান করা হোক। অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের সুযোগ ছিল না। কিন্তু এ বারের ভোটে জিতে যে সরকার গঠিত হবে তার সেই সুযোগ থাকবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)