প্রাথমিক ‘আশঙ্কা’ কেটেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ভোটে কট্টরপন্থী দল ‘জামায়াতে ইসালামী’ (‘জামাত’ নামেই যা পরিচিত) অভূতপূর্ব শক্তিবৃদ্ধি ভারতকে আপাতত উদ্বেগমুক্ত হতে দেবে না বলেই মনে করছেন রাজনীতি এবং কূটনীতির জগতের অনেকে। তাঁদের মতে, ক্ষমতা দখল করতে না পারলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন জয়ের নতুন নজির গড়েছে জামাত। এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৮টি আসনে জিতেছিলেন দাঁড়িপাল্লার (জামাতের নির্বাচনী প্রতীক) প্রার্থীরা। এ বার তার অন্তত চার গুণ আসন তাদের ঝুলিতে আসতে চলেছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজনীতিতে যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলিতেই জামাতের জয়ের হার বেশি। দক্ষিণবঙ্গ লাগোয়া সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙা, ঝিনাইদহের ‘পুরনো ঘাঁটি’র পাশাপাশি মধ্যবঙ্গ ঘেঁষা মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা এমনকি, উত্তরবঙ্গ লাগোয়া রংপুর ডিভিশনেও ভাল ফল করেছে জামাত ও তার সহযোগীরা। হাসিনার জমানায় যুদ্ধাপরাধে একাধিক নেতার ফাঁসির পরে হতোদ্যম জামাত নেতৃত্ব হাঁপ ছেড়েছিলেন ২০২৪ সালের ক্ষমতার পালাবদলের পরে। এ বারের ভোটের ফল মূলস্রোতের রাজনীতিতে প্রথম বার বড় শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে তাঁদের। অতীতে খালেদা জিয়া, এমনকি, শেখ হাসিনার জমানাতেও ভারতবিরোধী কট্টরপন্থী জঙ্গি সংগঠনগুলিকে মদত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামাতের বিরুদ্ধে। ফলে নয়াদিল্লির কাছে জামাতের উত্থানের বিষয়টি উদ্বেগেরই হওয়ার কথা।
এ বারের ভোটে জামাতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলের জোটের অংশ ছিল ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের একাংশের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মতো ইসলামপন্থী দলগুলি। ভোটের পরে কেন্দ্রওয়াড়ি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অন্তত তিন ডজন কেন্দ্রে জয়ী বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে কড়া টক্কর দিয়েছে এই জোট। আসনরফা নিয়ে জামাতের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ‘বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল’ হিসাবে পরিচিত ‘ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ’-এর প্রধান সৈয়দ রেজাউল করিম (‘চরমোনাই পীর’ নামে পরিচিত ধর্মগুরু) আলাদা ভাবে আড়াইশোর বেশি আসনে প্রার্থী না দিলে বিএনপি এ বার আরও চাপে পড়ত বলে ভোটপণ্ডিতদের অনেকের ধারণা।
কে কোথায় জয়ী বাংলাদেশে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
অথচ মাত্র আট বছর আগে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই জামাত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল বিএনপির ‘ধানের শিষ’ প্রতীকে! বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সে দেশের নির্বাচন কমিশন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামাতের ‘রাজনৈতিক দল’ হিসাবে স্বীকৃতি বাতিল করায় তৎকালীন বিএনপি প্রধান তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জ়িয়া ২২টি আসন ছেড়েছিলেন জামাতকে। সেই আসনগুলিতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মুখ জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপির প্রতীকে লড়েছিলেন ‘মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি’ হিসাবে পরিচিত জামাতের প্রার্থীরা। বস্তুত, এ বারের নির্বাচনেও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যবাহী প্রধান শক্তি আওয়ামী লীগের উপর জামাত ‘ভর’ করেছে বলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। ভোটের ফল দেখে অনেকে মনে করছেন, ‘নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের একাংশের ভোট জামাতের দিকে গিয়েছে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এ বার ছিল একেবারে ভিন্ন। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ থেকে জন্ম নেওয়া হিংসাত্মক গণবিক্ষোভের জেরে ২০২৮ সালের ৫ অগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ছাত্র-যুবদের সেই আন্দোলনের মূল মদতদাতা ছিল জামাত। এর পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বতী সরকারের জমানায় নির্বিচারে আক্রমণ হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উপর। পাশাপাশি, লীগের অনেক নেতাকে গ্রেফতারও করা হয়। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের একাংশের দাবি, ভোটের আগে স্থানীয় স্তরের অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিনে মুক্ত করাতে তৎপর ছিলেন জামাত নেতারা! লক্ষ্যটা ছিল খুব স্পষ্ট— আওয়ামী লীগ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না-পারার কারণে ওই নেতা এবং তাঁর অনুগামীদের ভোট যেন জামাত শিবিরের দিকে আসে। হাসিনার ভোট বয়কটের আহ্বান সত্ত্বেও স্থানীয় স্তরে ‘আমির’ (জামাতের প্রধানকে এই নামেই সম্বোধন করা হয়) শফিকুর রহমানের এই কৌশল আংশিক কাজে লেগেছে বলে ভোটের ফলাফল দেখে মনে করছেন অনেকে।
রাজনৈতিক কৌশলে বদল আনার এই পদক্ষেপের অংশ হিসাবেই গত বছর প্রথম বার জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা ঢাকার রায়েরবাজার গণহত্যা স্মৃতিসৌধে গিয়ে ১৯৭১ সালের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। যা মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে দলের অবস্থানের সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিয়েছিল। নতুন ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টায় সংখ্যালঘু, বিশেষত হিন্দুদের সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব এবং সৌভ্রাতৃত্বের কথাও ভোটের আগে বার বার বলেছেন জামাতের নেতারা। এমনকি, খুলনা-৩ আসনে কৃষ্ণ নন্দী নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকেও প্রার্থী করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু মহিলাদের নেতৃত্বে এনে ‘নারীবিরোধী’ তকমা মোছার কোনও চেষ্টা হয়নি দলের তরফে। এ বার জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনে লড়েছে জামাত। কিন্তু তাঁদের মধ্যে এক জনও নারী ছিলেন না! যদিও বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় নারীরা ৫০ শতাংশের বেশি।
ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের আমলে নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে গত এক বছর ধরে ধীরে ধীরে প্রভাব বেড়েছিল জামাতের। ইউনূস সরকারের কয়েক জন উপদেষ্টার সাহায্যে জামাতের প্রভাববৃদ্ধি নিয়ে বিএনপি, বিভিন্ন বামপন্থী শক্তি এবং অন্য ইসলামি দলগুলিও বিভিন্ন সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঢাকা, জাহাঙ্গিরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহি-সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে পর্যুদস্ত করে জয়ী হয়েছে জামাতের ছাত্র শাখা ইসলামি ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। যার নেপথ্যে ছিলেন জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের একাংশও। যুবসমাজের বড় অংশ যে এ বার জামাতের পাশে, বিভিন্ন জনমত সমীক্ষাতেও তা উঠে এসেছিল। ফলে ‘চাপ’ বাড়ছিল নয়াদিল্লির উপর।
যদিও ভোট ঘোষণার আগে থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানপন্থী জামাত ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের উপর জোর দিয়েছিল। তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে ফলাও করে নয়াদিল্লি-ঢাকা সহযোগিতা নিবিড় করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ইসলামাদের কোনও উল্লেখ ছিল না। জামাতের আমির শফিকুর যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য সংগঠনের সব শাখা এবং দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। যদিও গত বছরের গোড়ায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর ‘বন্ধু’ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আস্থা জানিয়েও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন শফিকুর। সমাজমাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ‘‘উনি বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অনাকাঙ্ক্ষিত নাক গলাচ্ছেন। আমাদের দেশপ্রেমিক জনগণ তা বরদাস্ত করবে না।’’
জাতীয় সংসদের ভোটে পরাস্ত হলেও উল্লেখযোগ্য শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে জামাতের। পাশাপাশি, ইউনূস সরকারের বদান্যতায় জুলাই সনদে ঠাঁই পাওয়া তাদের একাধিক প্রস্তাব ‘হ্যাঁ’ হয়ে গিয়েছে গণভোটে। ফলে শফিকুরদের আগামী দিনের কার্যকলাপ নিয়ে তাই এখন থেকেই জল্পনা তৈরি হয়েছে।