শনিবার। ভোর ৪টে ২১ মিনিট (আমেরিকার স্থানীয় সময়)। ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বার্তা— ‘দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে বন্দি করা হল।’ তত ক্ষণে গোটা বিশ্ব জেনে ফেলেছিল, লাতিন আমেরিকার ওই দেশ ‘দখলে’ চলে গিয়েছে আমেরিকার। তবে এই অভিযান যে নিছকই কয়েক দিনের মহড়ায় হয়েছে, তেমনটা কিন্তু নয়। অন্তত মার্কিন প্রশাসনের এক সূত্রে তেমনই দাবি করা হয়েছে। দুঃসাহসিক তো বটেই, এই অভিযানের ‘ব্লুপ্রিন্ট’ তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। সেইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ভাগ্যও নির্ধারণ করে ফেলেছিলেন স্বয়ং ট্রাম্প।
মার্কিন প্রশাসনের এক সূত্র বলছে, এই সামরিক অভিযান ঝটিতি মনে হলেও, এর পরিকল্পনা কিন্তু অনেক দিন আগে থেকেই চলছিল। শুধু তা-ই নয়, ওই সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক কালের মধ্যে এই অভিযান আমেরিকার সবচেয়ে দুঃসাহসিক অভিযান। ৩০ মিনিটেরও কম সময়ে মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে সেফ হাউস থেকে বন্দি করে দেশের বাইরে নিয়ে আসে মার্কিন সেনা।
ভেনেজ়ুয়েলায় কী ভাবে অভিযান চালানো হবে তার জন্য আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কয়েক জনকে নিয়ে একটি ছোট দল তৈরি করেছিল। লক্ষ্য ছিল মাদুরোর ডেরায় ঢুকে তাঁর সমস্ত খবর বার করে আনা। গত বছরের অগস্ট থেকেই গোপনে শুরু হয়েছিল সেই অভিযানপর্ব। সেই অফিসারেরা মাদুরোর ঘনিষ্ঠবৃত্তে এমন ভাবে মিশে গিয়েছিলেন যে কাকপক্ষীতেও টের পায়নি। সেই সময় থেকেই মাদুরোর ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল একপ্রকার। সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে এক মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, মাদুরোর ঘনিষ্ঠবৃত্তে মিশে যাওয়া সিআইএ-র সেই অফিসারেরাই খবর আদানপ্রদানের প্রধান সম্পদ এবং অন্যতম শক্তি হয়ে উঠেছিল। তাঁরা সর্ব ক্ষণ মাদুরোর গতিবিধি, তাঁর জীবনযাপন, নিরাপত্তা, তাঁর খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে প্রতি মুহূর্তের পদক্ষেপে নজরদারি চালাতেন। আর সেই নজরদারির ভিত্তিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য একত্রিত করে মাদুরোর সেফ হাউসে অভিযান চালানোর ‘ব্লুপ্রিন্ট’ বানানো হয়েছিল বলে ওই সূত্রের দাবি।
মার্কিন সেনা সূত্রে খবর, কারাকাসের একটি সেফ হাউসে সস্ত্রীক থাকতেন মাদুরো। দুর্ভেদ্য ছিল সেই সেফ হাউস। কিন্তু সেই দুর্ভেদ্য নিরাপত্তাকে ফালফালা করে দেওয়ার জন্যই অন্তর্ঘাতের প্রয়োজন ছিল। আর সেটা খুব সুচারু ভাবে করে ফেলেছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারা। মাদুরোর সেফ হাউসের পুরো ব্লুপ্রিন্টও তৈরি করা হয়েছিল। একটি প্রতিকৃতি বানানো হয় সেই সেফ হাউসের। অভিযানের আগে সেই সেফ হাউসের প্রতিকৃতি নিয়ে বার বার মহড়া দেয় মার্কিন সেনা। হুবহু মাদুরোর সেফ হাউসের মতো বানানো হয়েছিল সেটি। কোথা দিয়ে সেই সেফ হাউসে ঢোকা হবে, কোন ঘরে মাদুরো থাকেন, কী ভাবে বন্দি করা হবে, বন্দি করার পর কী ভাবে তাঁকে সেফ হাউস থেকে বার করে একেবারে দেশের বাইরে নিয়ে আসা হবে, সব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শুধু ছিল সময়ের অপেক্ষা। শুক্রবার রাতে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পুরো কারাকাসকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ১৫০টি সামরিক বিমানকে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তার মধ্যে ছিল এফ-২২, এফ-৩৫, এফ-১৮, ইএ-১৮, ই-২ এবং বি-১ বম্বারের মতো যুদ্ধবিমান। এ ছাড়াও ড্রোনও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে আমেরিকার জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ ড্যান কেন।
তিনি জানান, স্থানীয় সময় রাত ১টা ১ মিনিটে মাদুরোর সেফ হাউসে অভিযান শুরু করে মার্কিন সেনা। প্রথমে একটি দল নিশ্চিত করে কোথা থেকে মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে বার করা হবে। হাতে সময় অত্যন্ত কম। মাদুরোর সেফ হাউসে ঢোকা থেকে মাদুরোকে বার করে নিয়ে আসা— এই সময় ছিল অত্যন্ত কম। আধ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ওই অভিযান শেষ করার লক্ষ্য ছিল। মাদুরোকে শোয়ার ঘর থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়। সঙ্গে আটক করা হয় তাঁর স্ত্রীকেও। এত কম সময়ের মধ্যে গোটা অভিযান সফল ভাবে করা হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘‘আমেরিকা আজ যা করে দেখাল, কোনও দেশ তা পারবে না।’’
তবে মাদুরোকে গ্রেফতার এবং উৎখাতের জাল বোনা হয়েছিল অনেক বছর আগেই। গত কয়েক বছর ধরেই সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু পারেনি। ২০২০ সালে আমেরিকার এক আদালত মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাস-সহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে অভিযোগ তুলোছিল। ট্রাম্প প্রশাসনও মাদুরোর মাথার দাম বাড়িয়ে পাঁচ কোটি ডলার ঘোষণা করে। টানা পাঁচ বছর ধরে মাদুরোকে গ্রেফতারের পরিকল্পনা অবশেষে বাস্তবায়িত হল। শুক্রবার গভীর রাতে মাদুরোর সেফ হাউসে ঢুকে সস্ত্রীক তাঁকে বন্দি করে নিয়ে আসা হয় নিউ ইয়র্কে।