গতকাল ভোরে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের চেয়ে কিছুটা দূরে ভারত মহাসাগরে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজকে ডুবিয়েছে আমেরিকার ডুবোজাহাজ। আজও সে দেশের উপকূলে ইরানের অন্য একটি জাহাজকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছিল। আগেরটির মতো এটিও উদ্ধার-বার্তা পাঠিয়েছিল শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা দফতরের কাছে। শেষ পর্যন্ত সেই জাহাজ থেকে ২০৮ জন সেনা, নাবিক ও কর্মীকে উদ্ধার করে সে দেশের নৌসেনা এবং বায়ুসেনা। জাহাজটিকে উত্তর-পূর্ব উপকূলের ত্রিনকোমালি বন্দরে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াশুরু হয়েছে।
এ দিকে, ইরানের জাহাজে আমেরিকার আক্রমণের ২৪ ঘণ্টারও বেশি কেটে যাওয়ার পরে মুখ খুলেছে ভারত। আজ নৌসেনা জানিয়েছে, উদ্ধার-বার্তা পেয়ে তারাও সক্রিয় হয়েছিল। গতকাল সকাল ১০টা নাগাদ তাদের একটি নজরদারি বিমান উদ্ধারের কাজে সহায়তার জন্য যায়। আরও একটি যুদ্ধবিমান রবারের ভেলা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বিকেলে গিয়েছিল দু’টি জাহাজ। তার আগেই অবশ্য শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা বিভাগ উদ্ধারের কাজ শুরু করে দিয়েছে। অন্য দিকে আমেরিকা দাবি করেছে, ইরানের ২০টি যুদ্ধজাহাজকে ডুবিয়েছে তারা। তার মধ্যে একটি বিখ্যাত ‘কাসেম সোলেমানি’। ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি, যুদ্ধস্থল থেকে প্রায় দু’হাজার কিলোমিটার দূরে জাহাজ ধ্বংস করার দাম চোকাতে হবে আমেরিকাকে। জাহাজটি অস্ত্রহীন ছিল।
ইরানের ‘আইরিস দেনা’ নামের যুদ্ধজাহাজটি ভারতের আমন্ত্রণে বিশাখাপত্তনমে এসেছিল আন্তর্জাতিক যৌথ প্রদর্শনী ও মহড়ায় যোগ দিতে। সেখান থেকে ফেরার সময়ে টর্পেডো দেগে আক্রমণ করে সেটিকে ডুবিয়েছে আমেরিকার ডুবোজাহাজ। গতকাল ভোরে ইরানের জাহাজটি থেকে উদ্ধারের জন্য বার্তা আসে শ্রীলঙ্কার উপকূলরক্ষী বাহিনীর কাছে। সে দেশের বায়ুসেনা ও নৌসেনা ৩২ জনকে উদ্ধার করে। অন্তত ৮৭ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। অনেকে নিখোঁজ। তবে এতক্ষণ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তাঁদের বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আজ ইরানের দ্বিতীয় একটি জাহাজ শ্রীলঙ্কার কাছে উদ্ধারের জন্য বার্তা পাঠায়। জানায়, তাদের একটি ইঞ্জিনে যান্ত্রিক বিঘ্ন রয়েছে। তা ছাড়া বাড়ছে ফের আক্রমণের আশঙ্কাও। এর পরেই শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমার দিশানায়েকে তাঁর সরকারের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। তাঁর নির্দেশেই নৌসেনা ও বায়ুসেনা সক্রিয় হয়ে ইরানের জাহাজে থাকা প্রত্যেককে উদ্ধার করে। এক বার্তায় দিশানায়েকে বলেছেন, ‘‘এই সংঘর্ষে আমরা কোনও পক্ষ নিচ্ছি না। নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেই জীবন বাঁচানোর দায়িত্ব পালন করছি। এই ধরনের যুদ্ধে কারও প্রাণহানি হওয়া উচিত নয়। প্রত্যেকটি জীবনই সমান দামি।’’
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, উপসাগরীয় যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব অর্থনীতির উপরে পড়লেও, এর ভৌগোলিক অবস্থান অন্তত ভারতের থেকে অনেকটা দূরে ছিল। এ বার তা-ও হাজির হয়েছে দোরগোড়ায়। এর তাৎপর্য গভীর। আবার হরমুজ় প্রণালীতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। যেখানে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৭০০ জাহাজ দাঁড়িয়ে। তার মধ্যে ভারতের ৩৬টি। কোনও রকম বিপত্তি ঘটলে জ্বালানির বাজারে তার প্রভাব পড়বে।
এ দিকে, যুদ্ধের থেকে অনেক দূরে থাকা জাহাজের উপরে আক্রমণ ঘিরে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তাদের বক্তব্য, ভারতীয় নৌসেনার অতিথি হয়ে এসেছিল জাহাজটি। কোনও রকম সতর্কবার্তা না দিয়েই তার উপরে আমেরিকা হামলা চালিয়েছে। আজ এক্স-এ ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘাচি লিখেছেন, ‘ইরান উপকূলের থেকে ২০০০ মাইল দূরে আমেরিকা বর্বরতা ঘটিয়েছে। ভারত থেকে আমন্ত্রিত জাহাজে ১৩০ জন ছিলেন। কোনও রকম সতর্কবার্তা না দিয়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় সেটির উপরে হামলা চালিয়েছে তারা। আমার কথা মনে রাখুন। আমেরিকাকে এর জন্য অনুশোচনা করতে হবে’।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)