E-Paper

‘ত্রুটিপূর্ণ নকশা’র দায়ে সঙ্কট-শঙ্কা সিলিকন ভ্যালির

মেটা ও ইউটিউবের আসক্তি তাঁকে অবসাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মামলা করেছিলেন ২০ বছর বয়সি এক তরুণী। আদালত তাঁকে মোট ৬০ লক্ষ ডলার (৫০ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, যার মধ্যে ৪২ লক্ষ ডলার মেটা এবং ১৮ লক্ষ ডলার ইউটিউবকে দিতে হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৭:৩৮

—প্রতীকী চিত্র।

আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির দীর্ঘদিনের আইনি সুরক্ষা কবচ লস অ্যাঞ্জেলেস আদালতের সাম্প্রতিক রায়ে অনেকটা আলগা হয়ে গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ১৯৯৬ সালের যোগাযোগ সুরক্ষা আইনের ২৩০ নম্বর ধারা অনুযায়ী সাধারণত প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর প্রকাশ করা বিষয়বস্তুর জন্য সংস্থাগুলি দায়ী থাকে না। কিন্তু আদালত এ বার স্পষ্ট জানিয়েছে, সমাজমাধ্যমে আসক্তির জন্য ব্যবহারকারীর পোস্ট নয়, বরং অ্যাপের আসক্তি সৃষ্টিকারী ত্রুটিপূর্ণ নকশা বা ডিজাইন দায়ী।

মেটা ও ইউটিউবের আসক্তি তাঁকে অবসাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মামলা করেছিলেন ২০ বছর বয়সি এক তরুণী। আদালত তাঁকে মোট ৬০ লক্ষ ডলার (৫০ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, যার মধ্যে ৪২ লক্ষ ডলার মেটা এবং ১৮ লক্ষ ডলার ইউটিউবকে দিতে হবে। বিশ্লেষকদের একাংশের পর্যবেক্ষণ, লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টের এই রায় কেবল একটি বিচ্ছিন্ন জরিমানা নয়, বরং বড় আইনি নজির হয়ে উঠল।

মেটা ও ইউটিউবের মতো সংস্থাগুলির আয়ের প্রধান উৎস ব্যবহারকারীকে দীর্ঘ ক্ষণ অ্যাপে আটকে রাখা। আর এই আটকে রাখার কাজে ব্যবহৃত ‘অবিরাম স্ক্রল’ বা ‘অ্যালগরিদম’-এর মতো কৌশলগুলিকেই আদালত এ বার সরাসরি ‘ত্রুটিপূর্ণ নকশা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ওই তরুণীর আইনজীবীরা প্রমাণ করেছেন যে, আসক্তি কোনও নির্দিষ্ট ভিডিয়োর জন্য নয় বরং অ্যাপের বিরতিহীন নির্মাণশৈলীর কারণে তৈরি হয়। ফলে এত দিন যা ছিল নিছক বিতর্ক, তা এখন আইনি ভাবে স্বীকৃত দায়বদ্ধতা। এই ব্যাখ্যা আগামী দিনে বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির জন্য গভীর সঙ্কট তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্য দিকে, নিউ মেক্সিকো আদালতও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার দায়ে মেটাকে ৩৭ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার (প্রায় ৩১৫০ কোটি টাকা) জরিমানা করেছে। আমেরিকার আদালতে এমন আরও বেশ কয়েকটি পথপ্রদর্শক মামলার শুনানি রয়েছে সামনেই। তার মধ্যে রয়েছে আমেরিকার প্রায় ২৫০টি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এবং ৪০টিরও বেশি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের করা মামলাও। স্কুলগুলির অভিযোগ, সমাজমাধ্যমের আসক্তির ফলে পড়ুয়াদের মানসিক অস্থিরতা সামাল দিতে তাদের বিপুল অর্থ ও সময় নষ্ট হচ্ছে। ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে শুরু করে জনস্বাস্থ্য সঙ্কটের দায়ে শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে কতটা মূল্য চোকাতে হয়, সেটা এই নমুনা-মামলাগুলির রায়েই শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট হবে।

একটি সাক্ষাৎকারে এই সংক্রান্ত মামলার অন্যতম আইনজীবী জেন কনরয় মন্তব্য করেছেন, লস অ্যাঞ্জেলেস আদালতের সাম্প্রতিক রায়ে পরে মেটা, গুগল বা টিকটকের মতো সংস্থাগুলির বোর্ডরুমে এখন নজিরবিহীন ‘হিসাব কষা’ শুরু হয়েছে। আমেরিকায় বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার সমগোত্রীয় মামলা চলছে। যদি প্রতিটি মামলায় এটির মতো একই হারে, অর্থাৎ ৬০ লক্ষ ডলার (৫০ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা) করে জরিমানা দিতে হয়, তবে শুধুমাত্র এই আড়াই হাজার মামলা থেকেই মোট দায়ভারের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার (১ লক্ষ ২৬ হাজার কোটি টাকা)। আর সামগ্রিকভাবে এই দায় ১ লক্ষ কোটি ডলার (৮৪ লক্ষ কোটি টাকা) ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞেরা। মূলত এই বিশাল আর্থিক বিপর্যয় এবং ২৩০ নম্বর ধারার রক্ষাকবচ ভেঙে পড়ার আশঙ্কাই এখন সিলিকন ভ্যালির বোর্ডরুমগুলিতে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে।

মেটা ও গুগল এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা করেছে। তবে বিশেষজ্ঞেরা পুরো বিষয়টিকে তামাক বা ওষুধ শিল্পের ঐতিহাসিক জবাবদিহিতার সঙ্গে তুলনা করছেন। এক সময়ে তামাক সংস্থাগুলি যেমন আসক্তির কথা লুকিয়ে ব্যবসা করত, সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলি এখন তেমনই পরিস্থিতিরই মুখে, পর্যবেক্ষণ তাঁদের।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

US Supreme court Silicon Valley Los Angeles

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy