Advertisement
E-Paper

কলঙ্কের বোঝা নিয়েই প্রয়াত জাতির জননী

১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি-র এই ফ্রেমটি ছাড়া বিশ শতকের অ্যালবাম সম্পূর্ণ হয় না। নেলসন মারা গিয়েছেন সাড়ে চার বছর আগেই। সোমবার চলে গেলেন উইনি ম্যান্ডেলা (৮১)। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম তার জনক ও জননীকে হারাল।

সংবাদ সংস্থা

শেষ আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০১৮ ০১:৩৭
লড়াকু: ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০। জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন স্বামী নেলসন ম্যান্ডেলা। পাশে উইনি ম্যান্ডেলার উচ্ছ্বাস। ফাইল ছবি

লড়াকু: ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯০। জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন স্বামী নেলসন ম্যান্ডেলা। পাশে উইনি ম্যান্ডেলার উচ্ছ্বাস। ফাইল ছবি

সাতাশ বছর পর জেল থেকে বেরোচ্ছেন নেলসন ম্যান্ডেলা। তাঁর ঠিক পাশটিতে বিজয়িনীর হাসি নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়েছেন উইনি।

১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি-র এই ফ্রেমটি ছাড়া বিশ শতকের অ্যালবাম সম্পূর্ণ হয় না। নেলসন মারা গিয়েছেন সাড়ে চার বছর আগেই। সোমবার চলে গেলেন উইনি ম্যান্ডেলা (৮১)। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম তার জনক ও জননীকে হারাল।

জাতির জনক ও জননী— এই নামে বাস্তবিকই দেশবাসীর কাছে পরিচিত ছিলেন ওঁরা। ম্যান্ডেলার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ, ব্যক্তিগত দুর্নীতি এবং অপরাধের দায় উইনির সেই আসনকে কলঙ্কিত করেছিল পরবর্তী কালে। কিন্তু তাই বলে কৃষ্ণাঙ্গদের স্বাধীনতার লড়াইয়ে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকাটি অস্বীকৃত হয়নি। ২০১৬ সালে জুমা সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করে।

উইনি অতএব সেই নেত্রী, ইতিহাস এবং মানবচরিত্রের প্রায় সব রকম স্ববিরোধ, দোষগুণ, উত্থান ও পতনকে যিনি স্ব-শরীরে ধারণ করেছেন। বাবা নাম রেখেছিলেন, নমজামো উইনিফ্রেড মাদিকিজেলা। আফ্রিকার জনজাতীয় ভাষায় নমজামো মানে, যাকে জীবনভর পরীক্ষা দিতে হয়! উইনি সেটাই করেছেন আমৃত্যু।

জোহানেসবার্গের হাসপাতালে ফ্লু-এর সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন গত সপ্তাহান্তে। আজ তাঁর প্রয়াণের খবরটি প্রথম জানান তাঁর ব্যক্তিগত সচিব। পরে পরিবারের তরফেও একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। গত কয়েক বছর ধরে কখনও কিডনি, কখনও হাঁটুর অসুখ, কখনও বা ডায়াবিটিসে ভুগছিলেন। বারবারই হাসপাতালে যেতে হচ্ছিল। যদিও জীবনীশক্তি ছিল অটুট।

আরও পড়ুন: গান শুনে হাততালি কিমের, খুশি সোল

মা মারা গিয়েছিলেন আট বছর বয়সেই। বাবা ছিলেন শিক্ষক। উইনির ছোটবেলা কেটেছিল ইস্টার্ন কেপের পন্ডোল্যান্ড অঞ্চলে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে তিনি জোহানেসবার্গে চলে আসেন সমাজসেবা নিয়ে পড়াশোনা করতে। ভাল ছাত্রী, আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার স্কলারশিপও পেয়েছিলেন। যাননি। উইনির সঙ্গে তখনই ধীরে ধীরে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস, বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। নেলসন তখনই আন্দোলনের নেতৃপদে, বিবাহিত, তিন সন্তানের পিতা। প্রথম দর্শনেই প্রেম। প্রথম যেদিন আলাদা করে দেখা করলেন, সেদিনই বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে নেলসন-উইনির বিয়ে হল ১৯৫৮ সালে। দু’টি মেয়ে হয় ওঁদের। কিন্তু সংসার করা হয়নি বেশিদিন। কারণ ১৯৬৪ সালেই আজীবন কারাবাসের শাস্তি হয়ে গেল নেলসনের আর উইনির জন্য শুরু হল এক কঠিন লড়াইয়ের পর্ব।

নেলসন জেলে যাওয়ার দিনে উইনি শান্ত গলায় বলেছিলেন, ‘‘তবু ভাল! মৃত্যুদণ্ড দেয়নি!’’ এ রকম ঠান্ডা মাথা, জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা আর কট্টর লড়াকু মন— নেত্রী হয়ে ওঠার অনেক গুণ উইনির সহজাত। ম্যান্ডেলার বন্দিদশায় উইনিই হয়ে উঠলেন দলের মুখ। ১৯৬৯ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে পাঠিয়ে দেওয়া হল ঘুপচি সলিটারি সেল-এ। সঙ্গে মারধর, নির্যাতন। ১৭ মাস পরে মুক্তি। আবার গ্রেফতার ১৯৭৬-এ। এ বার একেবারে নির্জন দুর্গে নির্বাসন। পাঁচ মাস পরে মুক্তি। উইনি পরে লিখেছেন, পুলিশের নির্যাতনই তাঁর নিজের নিষ্ঠুরতাকে উস্কে দিয়েছিল, বুনে দিয়েছিল ঘৃণা। সেই ঘৃণাই উইনিকে পরে বক্তৃতায় বলিয়ে নিয়েছিল, ‘‘দেশলাই আর নেকলেস দিয়েই আমরা স্বাধীনতা আনব!’’ নেকলেস মানে, গলায় জ্বলন্ত টায়ার পরিয়ে দেওয়া!

এই হিংস্রতা উইনিকে কম নিন্দার মুখে ফেলেনি। ম্যান্ডেলা ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাব নামে একটা সংগঠন করেছিলেন। যারা আপাত ভাবে উইনির দেহরক্ষী, আসলে দলের মধ্যে চর খোঁজার বাহিনী। তাদের হাতেই চার যুবকের অপহরণ ও হত্যার (১৯৮৮) মামলায় উইনি দোষী সাব্যস্ত হন। পাঁচ বছরের কারাদণ্ড আপিলে কমে গিয়ে জরিমানায় দাঁড়ায়। কিন্তু ভাবমূর্তির ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গিয়েছিল।

পাশাপাশি নেলসন আর উইনির সম্পর্কেরও অবনতি হচ্ছিল দ্রুত। এক দিকে উইনির নামে নানা দুর্নীতির অভিযোগ, অন্য দিকে এক তরুণ আইনজীবীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে চর্চা। ম্যান্ডেলা উইনিকে সরিয়ে দিলেন মন্ত্রিসভা থেকে, বিয়েও ভেঙে গেল। কিন্তু সেই নেলসনই যখন মারা গেলেন, উইনিই শেষকৃত্যের আসরে যেন অঘোষিত ফার্স্ট লেডি! নেলসন আর উইনি, এমন এক আখ্যান যা ভেঙে গেলেও মুছে যায়নি। উইনির মৃত্যু এত দিনে সেই আখ্যানকে হয়তো অমর করল।

Winnie Madikizela-Mandela Death South Africa Nelson Mandela Anti-Apartheid Movement Black White উইনি ম্যান্ডেলা নেলসন ম্যান্ডেলা video
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy