আমেরিকার ম্যানহাটনের আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো বলেছেন, ‘‘আমিই আমার দেশের প্রেসিডেন্ট। আমাকে অপহরণ করা হয়েছে।’’ তখন কক্ষে হাজির তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও। নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করে, মাদুরো জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অসত্য।
মাদুরোর শূন্যস্থানে আজ ভেনেজ়ুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন রাজনীতিতে তাঁরই ‘ডান হাত’ বলে পরিচিত ডেলসি রদ্রিগেস। শপথের আগেই তাঁকে হুমকি দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একটি সাক্ষাৎকারে রাখঢাক না করেই তিনি বলেছেন, ‘‘উনি যদি ঠিক কাজ না করেন, ওকে বড় দাম দিতে হবে। হয়তো মাদুরোর থেকেও বেশি দাম দিতে হবে।’’ রদ্রিগেস যে ট্রাম্পের হুমকিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তা স্পষ্ট তাঁর আজকের বক্তব্যে। শপথ গ্রহণের পরে তিনি বলেছেন, ‘‘আমাদের মাতৃভূমি আগ্রাসনের শিকার। তার পর থেকে ভেনেজ়ুয়েলার জনগণের উপর দুর্ভোগ নেমে এসেছে। গভীর শোক নিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছি।’’
আজ জেলের নীল পোশাক পরিয়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে নিউ ইয়র্কের আদালতে হাজির করানো হয়েছে। আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে মাদুরো বলেছেন, তিনি অপরাধ করেননি ও এক জন ‘ভদ্র ব্যক্তি’। মাদক পাচারে যুক্ত থাকার যে অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে, সে নিয়ে মাদুরো বলেন, ‘‘আমাকে অপহরণ করা হয়েছে। আমি নিষ্পাপ, দোষী নই।’’
মাদুরোর সহযোদ্ধারা যে তাঁর মতোই মানসিক ভাবে দৃঢ় রয়েছেন, তা ডেলসি আজ স্পষ্ট করে দিয়েছেন। জানিয়েছেন, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর ভেনেজ়ুয়েলা। তিনি বলেন, ‘‘কিছুতেই কোনও দেশের উপনিবেশ হব না।’’ তিনি নিজেদের টেলিগ্রাম হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘‘আমি শান্তি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের বিশ্বাস প্রতিটি দেশে শান্তি আসলে তবেই বিশ্ব জুড়ে শান্তি আসবে।’’ তবে এ সবের পাশাপাশি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘সরাসরি বাগ্যুদ্ধ’ এড়িয়ে রদ্রিগেস বলেন, ‘‘আমরা আমেরিকাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, আমাদের সঙ্গে জোট বাঁধুক ওরা। সহযোগিতা করুক। আন্তর্জাতিক আইন-ব্যবস্থার মধ্যে থেকে দু’দেশ একে অন্যের উন্নতিতে সাহায্য করুক।’’
আমেরিকার দীর্ঘদিনের অভিযোগ, মাদক পাচার, জঙ্গি কার্যকলাপ ও নানা অপরাধে ব্যবহার করা হয় ভেনেজ়ুয়েলার বিপুল তেলের ভান্ডার। সম্প্রতি ট্রাম্প অভিযোগ তোলেন, ভেনেজ়ুয়েলার অপরাধচক্রের মাথা খোদ মাদুরো। সেই ‘অপরাধেই’ তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘‘তেল ও অন্য সম্পদ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য আমাদের পেতে হবে। সেটা পেলে আমরা দেশটাকে (ভেনেজ়ুয়েলাকে) পুনর্গঠন করতে পারব।’’
ভেনেজ়ুয়েলার সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে ১৬১ মেট্রিক টন সোনা রয়েছে। লাতিন আমেরিকায় এ পরিমাণ সোনা আর কোনও দেশে নেই। বর্তমান বাজারে এর মূল্য প্রায় ২২০০ কোটি ডলার। ভেনেজ়ুয়েলার ‘দ্য ওরিনোকো মাইনিং আর্ক’-এ ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টন মূল্যবান খনিজ মজুত রয়েছে, যারা বাজারমূল্য লক্ষ কোটি ডলার। কূটনীতিকদের মতে, ইরাকে এবং অন্য দেশে যে কাজটা আমেরিকা করেছিল, এ ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হবে না বলে আশঙ্কা। সমালোচকদের মতে, ওদের লক্ষ্য ‘স্রেফ তেল, সোনা চুরি’।
আজ একাধিক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে, ভেনেজ়ুয়েলা শেষ নয়। আরও কিছু দেশ তাঁর চাই। ট্রাম্প বলেন, ‘‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের চাই।’’ এই হুমকি আগেও দিয়েছিলেন তিনি। যে ‘আবদার’ হেসেই এত দিন উড়িয়ে দিয়েছে ইউরোপের একাংশ। ভেনেজ়ুয়েলা দখলের পরেও দ্বিধাবিভক্ত ইউরোপ। কিছু দেশ ট্রাম্পের সমর্থনে, কিছু বিরুদ্ধে। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের নাম উঠতেই নড়ে বসেছে ডেনমার্ক। ট্রাম্পের বক্তব্য, ডেনমার্কের অংশ এই দ্বীপটিকে ঘিরে রেখেছে রুশ ও চিনা জাহাজ। তাই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ চাই আমেরিকার। জবাবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটা ফ্রেডরিকসেন বলেছেন, ‘‘ড্যানিশ রাজত্বের কোনও অংশ দখল করার অধিকার নেই আমেরিকার।’’ গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিকও বলেন, ‘‘যথেষ্ট হয়েছে।... এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খোয়াব দেখছে ওরা।’’
তবে আপাতত ট্রাম্পের ‘পাখির চোখ’ ভেনেজ়ুয়েলা। আগে তিনি হুমকি দিতেন, ভেনেজ়ুয়েলার সরকার তিনি উল্টে দেবেন। কিন্তু এখন ট্রাম্প বলছেন, ‘‘পুনর্গঠন বা শাসনক্ষমতা পরিবর্তন, আপনারা যা কিছু বলতে পারেন,... কিন্তু এখন যা হচ্ছে, সেটা সবচেয়ে ভাল হচ্ছে। দেশটার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।’’
কূটনীতিক বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, ট্রাম্প যে ভেনেজ়ুয়েলাকে নিজের বশে আনতে চাইছেন, তা দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হয়েই তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। গত নভেম্বরে, হোয়াইট হাউসের তরফে প্রকাশ করা হয়েছিল ‘আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’ সংক্রান্ত ৩৩ পাতার নথি। তাতে বলা হয়েছে, আমেরিকার বাণিজ্যিক ও সামরিক সুবিধার লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে কোনও পদক্ষেপ নিতে পারেন। ভেনেজ়ুয়েলার নাম না করে বলা হয়েছে, ‘আমেরিকার প্রয়োজনে সামরিক ঘাঁটি বা বন্দর বা অন্য কোনও পরিকাঠামো তৈরির কাজে বহির্বিশ্বের কোনও দেশ বাধা দিতে পারে। এবং সেই কাজে লাতিন আমেরিকার কিছু দেশকে তাদের ‘মিত্র’ রাষ্ট্রগুলি সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আমেরিকার সেই বাধা সামলানোর অভিজ্ঞতা ও ক্ষমতা আছে’। সস্ত্রীক মাদুরোকে অপহরণ ও বন্দি করার আগে ট্রাম্প প্রশাসন হামলা শুরু করেছিল ভেনেজ়ুয়েলার উপকূলে, তাদের জাহাজগুলির উপরে। ওয়াশিংটনের যুক্তি ছিল, এই সব জাহাজে করে আমেরিকায় মাদক পাচার করা হয়। হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা কৌশল সংক্রান্ত নথিতেও একাধিক বার মাদক পাচারের উল্লেখ করা হয়েছে, এবং বলা হয়েছে, “জাতীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে দেশে মাদক ঢোকা বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)