শেখ হাসিনার সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর আবার অশান্ত বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের জুলাই-অগস্ট মাসকে যদি হিংসার প্রথম পর্ব বলা যায়, তবে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে তার দ্বিতীয় পর্ব। ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড দিয়ে যার শুরু। ফের দিকে দিকে খুন, গণসন্ত্রাসের ঘটনা চলতে থাকে। নির্ধারিত দিনে নির্বাচন আদৌ হবে কি না, নির্বাচন করার মতো পরিবেশ রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও উঠতে শুরু করে বাংলাদেশেরই বিভিন্ন মহল থেকে। তবে শেষপর্যন্ত ভোট হচ্ছে। হচ্ছে, কিন্তু অশান্তির আশঙ্কা বুকে বয়েই। গত মাসের শেষ দিকেও একটি খুনের ঘটনা ঘটে গিয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনে অশান্তির আশঙ্কা করছে বিভিন্ন দেশ। সতর্ক আমেরিকাও। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ভোট হবে। নির্বাচনের সময় সহিংস বা উগ্রপন্থী হামলা ঘটতে পারে বলে মনে করেছে আমেরিকা। দুষ্কৃতীদের নজর থাকতে পারে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে, এমন সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছে তারা। বাংলাদেশে থাকা মার্কিন নাগরিকদের ইতিমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতীয় দূতাবাস এবং বিভিন্ন উপদূতাবাসের সব কর্মীর পরিবারকে বাংলাদেশ থেকে দেশে ফিরে আসার পরামর্শ দিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে এই উদ্বেগ একেবারে অমূলক নয়।
নির্বাচনের আগে হিংসাশ্রয়ী ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। গত পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত ব্যক্তির সংখ্যা ৩ হাজার ৬৫৭ জন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আশঙ্কা আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। নির্বাচন কমিশন ভোট ঘোষণা করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হন নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী তথা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। কয়েক দিন পর ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে মৃত্যু হয় তাঁর। সেই ঘটনার পরই নতুন করে অশান্ত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের নানা এলাকা। ঘটতে থাকে একটার পর একটা হত্যাকাণ্ড।
ঘটনা ১— ময়মসিংহ। ১৮ ডিসেম্বর। বাংলাদেশি যুবক দীপুচন্দ্র দাসকে পিটিয়ে খুন করে একদল উন্মত্ত জনতা। হত্যার পরে দেহ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনা ২— খুলনা। ১৮ ডিসেম্বর। আততায়ীদের গুলিতে খুন হন পেশায় সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন।
ঘটনা ৩— রাজবাড়ী। ২৪ ডিসেম্বর। জনরোষের মধ্যে পড়ে খুন হন অমৃত মণ্ডল। পিটিয়ে খুন করা হয় তাঁকে।
ঘটনা ৪— শরীয়তপুর। ৩১ ডিসেম্বর। কোপানোর পরে জ্যান্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয় খোকন দাসকে। তিন দিন পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় খোকনের।
ঘটনা ৫— যশোর। ৩ জানুয়ারি। গুলি করে হত্যা করা হয় স্থানীয় বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে। মাথা লক্ষ্য করে দু’টি গুলি করা হয়েছিল তাঁকে।
ঘটনা ৬— যশোর। ৫ জানুয়ারি। গুলি করে খুন করা হয় রানাপ্রতাপ বৈরাগীকে। হত্যার পরে কেটে দেওয়া হয় গলা। রানা ছিলেন পেশায় সাংবাদিক। পাশাপাশি ব্যবসাও করতেন।
ঘটনা ৭— নওগাঁ। ৬ জানুয়ারি। মিঠুন সরকার নামে এক যুবককে চোর সন্দেহে ধাওয়া করে উন্মত্ত জনতা। প্রাণ বাঁচাতে খালে ঝাঁপ দেন মিঠুন। অনেক পরে উদ্ধার হয় দেহ। তিনি আদৌ চুরি করেছিলেন কি না— তার কোনও প্রমাণ প্রাথমিক ভাবে পায়নি পুলিশ।
ঘটনা ৮— ঢাকা। ৭ জানুয়ারি। বাজারের মধ্যে গুলি করে খুন করা হয় আজিজুর রহমান নামে এক যুবককে। তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতা ছিলেন।
ঘটনা ৯— ফেণী। ১১ জানুয়ারি। সমীরকুমার দাস নামে এক অটোচালককে খুন করে একদল দুষ্কৃতী। হত্যার পরে তাঁর অটো নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
ঘটনা ১০— গাজীপুর। ১৭ জানুয়ারি। কলাচোর সন্দেহ তিন জন মিলে পিটিয়ে খুন করেন লিটনচন্দ্র ঘোষ নামে এক যুবককে।
ঘটনা ১১— কুড়িগ্রাম। ২৬ জানুয়ারি। জমি ‘দখল’ আটকাতে গিয়ে বচসায় জড়ান মধুচন্দ্র শীল। ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয় তাঁকে। মাথায় চোট লেগে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়।
ঘটনা ১২— শেরপুর। ২৮ জানুয়ারি। বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে বাধে। সংঘর্ষে নিহত হন জামায়াতের স্থানীয় নেতা রেজাউল করিম।
হাদির মৃত্যুর পর জায়গায় জায়গায় চলে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ। রেহাই পায়নি সংবাদপত্রের দফতরও। হাদি-মৃত্যুর পর থেকে গত ৪৯ দিনে পড়শি দেশে ‘গণসন্ত্রাস’-এর বলি হয়েছেন অন্তত ১২ জন। পড়শি দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতও। তবে ইউনূস সরকারের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। যা ঘটেছে সেগুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই ব্যাখ্যা করছে অন্তর্বর্তী সরকার।
পুলিশ কিছু ক্ষেত্রে পদক্ষেপ করেছে। গ্রেফতারও করেছে। কিন্তু বাংলাদেশি জনতার একটি অংশের মনে নির্বাচন ঘিরে চাপা ভয় রয়েই গিয়েছে। এই ১২টি ঘটনার পাশাপাশি আরও কিছু খুন এবং রহস্যমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত দেড় মাসের এই ঘটনাগুলিতে বার বার প্রশ্ন উঠেছে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে।
আরও যে ঘটনাগুলি ঘটেছে
গত ২৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে কর্তব্যরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হন ব্রজেন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বাংলাদেশের আনসার বাহিনীর সদস্য। অভিযুক্তও আনসার বাহিনীর সদস্য। অভিযুক্তের দাবি, ‘মজা করতে গিয়ে’ গুলি চলে গিয়েছে।
এর পরে ৫ জানুয়ারি নরসিংদীতে শরৎমণি চক্রবর্তী নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে। পরে অবশ্য পুলিশ দাবি করে, ব্যবসায়িক কারণেই খুন হয়েছেন তিনি। ৯ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় জয় মহাপাত্রের। অভিযোগ, তাঁকে জোর করে বিষ খাওয়ানো হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
১৬ জানুয়ারি রাজবাড়িতে পেট্রল পাম্পে গাড়ি চাপা দিয়ে খুন করা হয় রিপন সাহাকে। তাঁর মাথার উপর দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হয় গাড়ি। রিপন পেট্রল পাম্পে কাজ করতেন। তেলের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ঝামেলা বাধে ওই দিন। ঘটনায় অভিযুক্ত পেশায় ঠিকাদার। রাজবাড়ী জেলায় বিএনপি-র প্রাক্তন নেতা হিসাবেও পরিচিতি রয়েছে তাঁর।
আরও পড়ুন:
সম্প্রতি, ২৪-২৫ জানুয়ারির রাতে নরসিংদীতে গ্যারাজে ঘুমোনোর সময়ে আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয় চঞ্চলচন্দ্র ভৌমিকের। পরিবারের দাবি, কেউ আগুন লাগিয়ে হত্যা করেছে তাঁকে। পুলিশ পরে জানায়, সিসি ক্যামেরায় এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আশপাশ থেকে মোবিলমাখা কাগজ-কাপড় কুড়িয়ে এনে গ্যারেজের সামনে আগুন ধরাতে দেখা যায়। তাঁর আচার-আচরণ মানসিক প্রতিবন্ধীর মতো বলে দাবি বাংলাদেশের পুলিশের।
নিরাপত্তাহীনতায় প্রশ্ন
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরে কোন দল গড়বে সরকার? তা নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। একই সঙ্গে ইতিউতি উঁকি মারছে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ। সকলে নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ বলছেন, আসন্ন নির্বাচন হতে পারে রাজনীতির উপর তাঁদের আস্থা রাখার ‘শেষ পরীক্ষা’।
সম্প্রতি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এবং ইউনূস সরকারের কাছে সাত দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। প্রয়োজনে সেনা নামিয়ে ভোট করানোর দাবি উঠেছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ সম্প্রতি ‘আল জাজ়িরা’কে জানান, নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুরা গভীর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সকলের মধ্যেই আতঙ্ক রয়েছে বলে জানান তিনি।
গত মাসেই ঢাকার মার্কিন দূতাবাস সে দেশে থাকা আমেরিকানদের কিছু সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলেছে। জানানো হয়েছে, নির্বাচনের সময় সহিংস বা উগ্রপন্থী হামলা ঘটতে পারে। দুষ্কৃতীদের নজর থাকতে পারে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান। সেই সব বিষয় মাথায় রেখে মার্কিন নাগরিকদের সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এ-ও জানানো হয়েছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ থেকে অশান্তি ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনও ধরনের সভা-সমাবেশ থেকে দূরে থাকার জন্য মার্কিন নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছে তাদের দূতাবাস।
আরও পড়ুন:
এমনকি ভোটের সময়ে সে দেশে সাংবাদিকেরা কতটা নিরাপদ থাকবেন, তা নিয়েও চিন্তিত রাষ্ট্রপুঞ্জের শাখা সংগঠন ইউনেস্কো। ডিসেম্বরে ঢাকায় সংবাদপত্রের দফতরে তাণ্ডব এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রেক্ষিতে এই শঙ্কা দানা বেঁধেছে ইউনেস্কোর। রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ দূত আইরিন খানও সম্প্রতি জানিয়েছেন, ভোটের আগে জনরোষকে ‘হাতিয়ার’ হিসাবে ব্যবহার করা এক উদ্বেগের বিষয়। এই চাপা উত্তেজনা এবং দুশ্চিন্তার মাঝেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ হবে বাংলাদেশে।