গোটা রাতটা ভয়ঙ্কর কাটল! এত প্রিয় শহর প্যারিসে শেষে এমন অভিজ্ঞতায় পড়তে হল!
আমি আর্মেনিয়া থেকে এসেছি প্যারিস সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্যুরিজম নিয়ে মাস্টার্স করতে। প্রায় দু’বছর হতে চলল। থাকি প্যারিসের দক্ষিণ শহরতলিতে। পড়াশোনার পাশাপাশি মধ্য প্যারিসের হোটেল লো ক্লো নোত্র দাম-এর রিসেপশনে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করি। আমার কাজের জায়গাটা একেবারে প্যারিসের মাঝামাঝি, প্লাস দো স্যাঁ মিশেল-এ (নোত্র দাম গির্জার কাছে)।
প্রতি শুক্রবার নাইট শিফ্ট থাকে আমার। আমাদের রিসেপশনে সব সময়েই শব্দ কমিয়ে টিভি চালানো থাকে। তখন সময়টা খুব ভুল না করলে, রাত ১০টা বেজে ১০ মিনিট হবে। হঠাৎ খুব শোরগোল পড়ে গেল। টিভি, রেডিও, মোবাইলে সর্বত্র খবর আসতে শুরু করল, বাতাক্লাঁ থিয়েটারে সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে। রাস্তায় পুলিশে পুলিশ ছয়লাপ হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। সকলে বলতে শুরু করল, ১৮ জন মারা গিয়েছে। পরে তো শুনলাম সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে আকাশ ছুঁয়েছে।
খবর আসতে লাগল, মেট্রো রুটগুলো সব কেটে কেটে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাস রুটও তা-ই। এমনিতে প্যারিসে বেশ রাত পর্যন্ত বাস, মেট্রো চলে। রাতের জন্য আলাদা পরিষেবা। সেই সব যানবাহনগুলোর পথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে শুনলাম।
এ দিকে, আমাকে তো থাকতে হবে সকাল ৭টা পর্যন্ত। তেমনই ডিউটি, কিছু করার নেই। আর যা শুনছি, রাস্তাঘাটে তখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে হামলাবাজরা। বেরোনোটাও নিরাপদ নয় মোটেই। কাছেই শাতলে এলাকায় আবার একটা বিস্ফোরণের গুজব ছড়াল। তার পরে আরও, আরও অনেক বিস্ফোরণের খবর! বাস্তিল থেকে রেপুবলিক চত্বরটা খুব জমজমাট। পরপর রেস্তোরাঁ ওইখানে। ছুটির দিনগুলোয় বা কাজের শেষে ওই সব জায়গাতেই তো যাই আমরাও। সেখানকার দু’টো বার-এ ওই রকম হামলা হল আবার। ভাবতেই কেমন যেন লাগছিল!
এমন আতঙ্কে কোনও দিন থাকিনি। গত জানুয়ারিতেও এ রকম হামলা হয়েছিল শার্লি এবদো পত্রিকার অফিসে। কিন্তু সেটার সময়ে সরাসরি কোনও অভিজ্ঞতা হয়নি আমার। কিন্তু আজ যেন রাতটা কাটতেই চাইছিল না। তার পরে ধীরে ধীরে আলো ফুটতে শুরু করল। তখনও রাস্তায় ভর্তি পুলিশ। বিভিন্ন চ্যানেলে ঘোষণা করা হচ্ছে, স্কুল কলেজ বন্ধ। এলাকায় এলাকায় ‘রেড অ্যালার্ট’। সরকার থেকে সকলকেই বাড়ি থেকে না বেরোনোর জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। কিন্তু আমায় তো বাড়ি ফিরতে হবে। মেট্রো ধরার জন্য রওনা হলাম।