Advertisement
E-Paper

ধর্ম-রাজ্যের পর নয়া নীতিতে শান আইএসের

বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল মসনদের দখল নিয়ে। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদকে সামনে রেখে সেই জেহাদি চোখরাঙানিই আলোড়ন তুলে দিল সারা পৃথিবীতে! মৌলবাদের অস্ত্রে ইরাক-সিরিয়ায় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করতে আল-কায়দার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে তৈরি হয় অধুনা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস)।

ঊষসী মুখোপাধ্যায় চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৬ নভেম্বর ২০১৫ ০৩:৩৪
হামলায় নিহতের স্মৃতিতে প্রার্থনা। প্যারিসে এএফপি-র তোলা ছবি।

হামলায় নিহতের স্মৃতিতে প্রার্থনা। প্যারিসে এএফপি-র তোলা ছবি।

বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল মসনদের দখল নিয়ে। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদকে সামনে রেখে সেই জেহাদি চোখরাঙানিই আলোড়ন তুলে দিল সারা পৃথিবীতে!

মৌলবাদের অস্ত্রে ইরাক-সিরিয়ায় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করতে আল-কায়দার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে তৈরি হয় অধুনা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস)। ইস্তাহার বলছে, এই জঙ্গিগোষ্ঠীর পাখির চোখ ধর্ম-রাজ্য। কিন্তু বাস্তবের ছবিটা অন্য। গত এক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এগারোশোরও বেশি হামলা চালিয়েছে এই জঙ্গিগোষ্ঠী। তার মধ্যে অন্যতম গত জানুয়ারিতে প্যারিসের ব্যঙ্গচিত্র পত্রিকা শার্লি এবদোর দফতরে হামলা, অক্টোবরে মিশরের সিনাই উপদ্বীপে রুশ বিমানকে গুলি করে নামানো এবং সাম্প্রতিকতম প্যারিস-হানা! ইয়েজেদি এবং সংখ্যালঘুদের উতখাৎ, মুণ্ডচ্ছেদ, গণকবর, ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে ধূলিসাৎ করেই সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল আইএস। যা তাদের ভাষায় ধর্ম-রাজ্য। তা হলে সেখান থেকে সরে প্রস্তাবিত ধর্ম-রাজ্যের বাইরে পা বাড়াচ্ছে কেন আইএস? এই প্রশ্নেই কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে বিশেষজ্ঞদের।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করে তাঁরা বলছেন, ধর্ম-রাজ্যের মতাদর্শ থেকে সরে বিশ্বজুড়েই সিরিয়া-ইরাকের পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় আইএস। এত দিন আইএসের হয়ে লড়াই করতে দেশ ছেড়ে পশ্চিম এশিয়ায় চলে আসছিল জঙ্গিরা। তবে আইএসের নীতি বদলে এ বার পশ্চিম এশিয়ার বাইরে অন্য দেশে লড়তে যাবে আইএস জঙ্গিরাই!

জঙ্গিগোষ্ঠীর এই নতুন মতাদর্শের আভাস দিয়েছেন ব্রুকলিনের ‘ইউএস রিলেশনস উইথ দ্য ইসলামিক ওয়ার্ল্ডে’র ডিরেক্টর উইল ম্যাকান্টস। তাঁর মতে, পুরনো রণনীতি ভেঙে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়েছে আইএস। প্যারিস হামলা সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। মুণ্ডচ্ছেদ-ফাঁসি-ধর্মীয় সালিশির ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে আইএস যে ভয় এত দিন দেখিয়েছে, এ বার সেই ভয়কেই অস্ত্র করে এগোচ্ছে তারা। কার্যত একই কথা বলছেন তুরস্কের ইপেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা রাষ্ট্র-সমাজের সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোখান বাসিক। তাঁর কথায়, ‘‘ধর্মীয় সাম্রাজ্যের নীতি নিয়ে শুরু করলেও এখন সেখানে আটকে নেই আইএস। বরং সিরিয়া ও ইরাকের ভয়াবহ পরিস্থিতিটাই বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোতে তুলে আনতে চাইছে।’’

মতাদর্শের পাশাপাশি আইএসের ট্যাঁকের জোরেই যে বড় সংখ্যক ভাড়াটে-জঙ্গি পশ্চিম এশিয়ায় ভিড় বাড়িয়েছে তা-ও মানছেন বিশেষজ্ঞরা। ইরাকের বহু তেল-খনি এখন আইএসের দখলে। তেল-পাচার করে দিনে ৩০ লক্ষ ডলার আসে তাদের পকেটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দু’বছরে এই প্রথম নিজের এলাকার বাইরে বেরিয়ে বড় একাধিক হামলা চালিয়েছে আইএস। জানুয়ারিতে ফরাসি পত্রিকা শার্লি এবদোর দফতরে হামলা, অক্টোবরে মিশরের সিনাই উপদ্বীপে রুশ বিমানে হানার দায় স্বীকার এবং নভেম্বরে ফের প্যারিস-হানা। এত কম সময়ে পশ্চিম এশিয়ার বাইরে এত বড় নাশকতা আগে করেনি আইএস। এত দিন ইন্টারনেটে মতাদর্শ প্রচার করেছে তারা। বিস্তর হুমকিও দিয়েছে। তাদের মতাদর্শে বিভ্রান্ত হয়ে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন-সহ বিভিন্ন দেশে ছোটখাটো হামলাও হয়েছে। আইএসের পতাকা উড়েছে খাস কাশ্মীরেই। তবে এ বার মার্কিন বিমান হানা এবং রুশ হানার জবাবে পাল্টা কৌশল নিয়েছে জঙ্গিরা। ক্ষমতা বোঝাতে এলাকা ছেড়ে হানাদারি চালিয়েছে পশ্চিমের বুকে।

উইল ম্যাকান্টসের বিশ্লেষণ— প্যারিস-হানার মূল কারণ দু’টি। এক, যে পশ্চিমী সংস্কৃতির বিরোধিতা আইএস প্রথম থেকে করে আসছে, প্যারিস সেই সংস্কৃতির পীঠস্থান। আর দ্বিতীয়, মার্কিন যৌথ বাহিনীর সদস্য ফ্রান্সে শরণার্থী-সমস্যার কারণে হামলা চালানো অপেক্ষাকৃত সহজ। যা রাশিয়া বা আমেরিকায় সম্ভব নয়। তিনি আরও বলছেন, নিজেদের ‘এলাকায়’ কোণঠাসা হয়ে তামাম বিশ্বের কাছে শক্তি প্রদর্শনের একটাও সুযোগ ছাড়ছে না জঙ্গিরা। ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যু, মোল্লা ওমরের মৃত্যুর কথা সামনে আসায় কোমর ভেঙেছে আল-কায়দা এবং তালিবানের। আর এই সুযোগ লুফে নিচ্ছে আইএস। উইলের কথায়, ‘‘সম্প্রতি হিজবুল্লার ঘাঁটি লেবাননে হামলা চালায় আইএস। আগে হলে হয়তো শরিকি করমর্দনের জায়গা তৈরি হতো। কিন্তু এখন পুরোটাই নিজেদের আয়ত্তে আনতে চাইছে আইএস।’’ আর অধ্যাপক বাসিক বলছেন, ‘‘এত দিন পশ্চিম এশিয়ায় আসা পশ্চিমী প্রতিনিধিদের সঙ্গে লড়ছিল আইএস। তবে এ বার ওরা চেষ্টা করছে পশ্চিমী দুনিয়ায় ঢুকে সরাসরি যুদ্ধঘোষণা করার।’’

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এই নতুন রণকৌশল যে বেশ আগে থেকেই ব্যবহার করছে জঙ্গিরা, তা বুঝিয়ে দিচ্ছে প্যারিসের সংগঠিত হামলা। তবে কি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলি এবং রাশিয়ার বিমান হানার মোকাবিলা করতেই এমন নীতি-বদল?

সতর্ক করলেন উইল। বললেন, ‘‘আমরা এখনও ওদের সংগঠনের বেশির ভাগটাই জানি না। ওরা নীতি বদলালে জঙ্গিনিধনের পুরনো কৌশল আর কাজে লাগবে না। দরকার নতুন জোট, নতুন অঙ্ক, নতুন কৌশল।’’ সন্ত্রাস ছড়ানোর ক্ষমতা যে আল কায়দার থেকে আইএসের যে অনেক বেশি তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমরা কিন্তু পাকিস্তানে গা ঢাকা দেওয়া আল-কায়দা নেতাদের কথা বলছি না। আমরা বলছি, এমন একটা গোষ্ঠীর কথা, যাদের আর্থিক জোর রয়েছে এবং যারা দু’টো দেশের রাজনৈতিক মসনদে বসে আছে!’’

তবে জঙ্গিনিধনে আশার আলো দেখালেন দুই বিশেষজ্ঞই। বললেন, আইএস সুর চড়ালে অস্ত্র শানাবে প্রতিপক্ষও। একটা প্যারিস-হামলা অনেক বড় বিপদ ডেকে আনবে একাধিপত্যের লড়াইয়ে নামা জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্যও।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy