বেদিতে বসেছেন দেবী দুর্গা। চারদিকে ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনি। ভিতর থেকে ভেসে আসছে ধূপের গন্ধ আর ধোঁয়া। মুখরিত চারদিক। বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে এ বার কেন যেন সকলেরই নজর দূরের সেই নিভৃত পল্লি, জন্ম-জন্মান্তরের ছিটমহল বলে পরিচিত সদ্য স্বাধীনতার ছোঁয়া পাওয়া কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়ার দিকে। এই উৎসবটা যেন এ বার এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। ৬৮ বছরের বন্দি ছিট-জীবনে ঠিক কত বছর আগে পুজো হয়েছে, তা মনে নেই কারওরই। তাই স্বাধীন বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডে এ বারই প্রথম দুর্গোৎসব হিসেবে পালন করছেন তাঁরা। সোমবার সকালে স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন এই এলাকা দাসিয়ারছড়ার দু’টি মন্দিরে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছে। এই এলাকার যে সব পরিবার ভারতে চলে যাবে, তাদের জন্য বাংলাদেশে এটাই শেষ পুজো। যাঁরা এখানেই থেকে যাবেন, তাঁদের কাছে এটাই প্রথম দুর্গা উৎসব। স্থানীয় হরেকৃষ্ণ’র বাড়িতে তৈরি করা হয়েছে একটি মন্দির। এখানে বেলতলায় বসে পুরোহিত কমলেন্দু ভৌমিক ঘণ্টি বাজিয়ে ও মন্ত্রপাঠ করে পুজো করছেন। মন্দিরের পাশেই বসেছিলেন হরেন্দ্রচন্দ্র বর্মণ। তাঁর কথায়: ‘‘হামরা ভারতে চলি যামো। বাংলাদ্যাশোত এইটায় শ্যাষ পূজা। আনন্দের সাতে করমো।’’
দাসিয়ারছড়ার কামালপুরে টিনের চালা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে আর একটি মন্দির। সামনে কারুকাজ করা বাঁশের বেড়া। ভিতরে বসানো দুর্গাপ্রতিমা। মন্দিরে প্রবেশের পথে টুকিটাকি কাজ করছেন আফছারউদ্দিন (৬০)। তাঁর কথায়: ‘‘এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ কম। তাই হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশেই আমারা কাজ করি। কাজের শেষে পুজোর আনন্দ করি।’’ কামালপুরের এই মন্দিরের জমি দান করেছেন স্থানীয় বিপুলচন্দ্র বর্মণ। তিনি বলেন, ‘‘শুনেছি, এখানে অনেক আগে পুজো হয়েছে। আমরা দেখিনি। বাংলাদেশে এটাই প্রথম পুজো, তাই জমি দিয়েছি। এখন থেকে প্রতি বছর পুজো করব।’’ গৃহবধূ পারুল রানি, সবিতা রানি ও সুন্দরী বালাদের বাবার বাড়ি বাংলাদেশে। বিয়ে হয়েছিল ভারতের দাসিয়ারছড়ায় এই ছিটে। তাঁরা জানান, বিয়ে হওয়ার পর পুজো দেখেননি। এ বারই প্রথম। খুব ভাল লাগছে বলে জানান তাঁরা। পুজো কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্রনাথ বর্মণ ও সাধারণ সম্পাদক বাবলুচন্দ্র বর্মণ জানান, তাঁরা হিন্দু-মুসলমান মিলেই এই উৎসব পালন করছেন। প্রতিমা তৈরি করেছেন ফুলবাড়ির মন্টু বর্মণ। পুজো করবেন ধনরঞ্জন পুরোহিত।
ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের নেতা ও দাসিয়ারছড়া ইউনিট আওয়ামি লিগের সভাপতি আলতাফ হোসেন জানান, এখানে হিন্দু পরিবারের সংখ্যা ১৬৫। লোকসংখ্যা ৫৫০। হিন্দু-মুসলমান মিলিত ভাবে পুজো উদযাপন করছেন। মন্দির কমিটির সভাপতি হরেকৃষ্ণ বর্মণ বলেন, সরকারি অনুদানের জন্য পুজো হচ্ছে। এখানে হিন্দু কম। তাই মুসলমানরাও চাঁদা দিচ্ছেন। ছিটে কখনও উৎসব হয় না। পুজোকে ঘিরে মানুষ মেতে উঠেছে।
এ তো গেল সদ্য স্বাধীন হওয়া দাসিয়ারছড়াবাসীর পুজোর খবর। কিন্তু বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলও মেতে উঠেছে ঢাক-ঢোলের রবে।
মন্দিরে-মণ্ডপে ঢাকের বোলে যেন ধ্বনিত হচ্ছে বাঙালি হিন্দুদের বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ার। দেশের ২৯ হাজার ৬৭৪টি পুজোমণ্ডপে এ বার পুজো হচ্ছে, যা গত বারের চেয়ে বারোশো বেশি। প্রায় সব মণ্ডপই এখন উত্সবে মাতোয়ারা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ দল বেঁধে পুজো দেখতে আসছেন। সোমবার বিকাল থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়।
সপ্তমীর সন্ধ্যায় বিভিন্ন মণ্ডপে ভক্তিমূলক সঙ্গীত, রামায়ণ পালা, আরতি-সহ নানা অনুষ্ঠান হল সাড়ম্বরে। রামকৃষ্ণ মঠ মিশনের মুখপাত্র জানান, প্রতি বছরের মতো এ বারেও ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ মিশনে বুধবার মহাষ্টমীতে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী কুমারী পুজো। পাঁচ দিনের শারদ উত্সব শেষ হবে বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে। ঢাকার ধানমণ্ডির সর্বজনীন পুজো উদযাপন কমিটি সাধারণ সম্পাদক দিলীপ চৌধুরী বলেন, ‘‘হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, সবাই মিলে আমরা এই উৎসবটাকে উপভোগ করব। এ বার প্রশাসন অনেক সচেতন। তারা বার বার আমাদের নিয়ে মিটিং করছে যাতে এই এলাকার পরিবেশ ভাল থাকে। প্রশাসনের দিক দিয়ে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছি।’’
তবে পুলিশের সন্দেহ, আপাত ভাবে সব স্বাভাবিক মনে হলেও যে কোনও মুহূর্তে দুষ্কৃতীর হামলা অমূলক নয়। তাই পুলিশের কড়া নজরদারিও রয়েছে মণ্ডপ-মন্দির ঘিরে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কর্তা বেনজির আহমেদের কথায়, নাশকতার আশঙ্কায় ঢাকার সাতটি ঝুঁকিপূর্ণ পুজামণ্ডপ-সহ সারা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ পুজোমণ্ডপে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে র্যাব। এ সব মণ্ডপে বিদেশিদের আসা-যাওয়ায় আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এ বার। পুলিশ জানায়, রাজধানী ঢাকার ২২২টি মণ্ডপের মধ্যে এ বার সাতটি মণ্ডপ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম অভিজাত এলাকা বনানী পুজোমণ্ডপ। মেটাল ডিটেক্টর ও ডগ স্কোয়াড নিয়ে মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব হাতে নিয়েছে র্যাব।