• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

একুশ বছর পরে ডিভিডেন্ডে ফিরল অ্যান্ড্রু ইয়ুল

Directors of andrew yule in a press meet
সংবাদিক বৈঠকে কল্লোল দত্তের সঙ্গে অন্য ডিরেক্টররা। সুনীল মুন্সি (কর্মী সংক্রান্ত), এস স্বামীনাথন (পরিকল্পনা) এবং আর সি সেন (অর্থ)।

রুগ্ণ সংস্থার তকমা ঝেড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর পর্বে আগেই পা রেখেছে অ্যান্ড্রু ইয়ুল। সেই ভিতের উপর ভর করে ২১ বছর পরে এ বার ডিভিডেন্ড দিচ্ছে কলকাতা ভিত্তিক অন্যতম এই কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। শনিবার ২০১৪-’১৫ সালের আর্থিক ফল প্রকাশ করে ডিভিডেন্ড দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন সংস্থাটির সিএমডি কল্লোল দত্ত।

১৫২ বছর আগে স্কটল্যান্ড থেকে কলকাতায় এসে সংস্থার গোড়াপত্তন করেছিলেন অ্যান্ড্রু ইয়ুল নামে এক তরুণ উদ্যোগপতি। এক দশকের মধ্যেই পাট, চা, কয়লা, বিমার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবসা জমিয়ে ফেলেছিল সেটি। ১৯৭৯-এ সংস্থাটির জাতীয়করণ হয়। কলকাতায় সদর দফতর রয়েছে, এমন যে-সব সংস্থা ছিল, সেগুলির মধ্যে অন্যতম অ্যান্ড্রু ইয়ুল। এক সময়ে রমরমা থাকলেও সংস্থাটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষমেষ, ২০০৪-এ এটিকে রুগ্ণ ঘোষণা করে বিআইএফআর। বছর তিনেক পরে অবশ্য কেন্দ্রীয় ভারী শিল্প মন্ত্রকের অধীন এই সংস্থার পুনর্গঠন প্রকল্প অনুমোদিত হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি শেষ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল ১৯৯৩-’৯৪ অর্থবর্ষের জন্য, যা ছিল ১৮%। কল্লোলবাবু এ দিন জানান, সংস্থার পরিচালন পর্ষদ এ বার ৫% ডিভিডেন্ড দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ জন্য বিআইএফআরের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন আগেই নেওয়া হয়েছে।

পুনরুজ্জীবন প্রকল্পে কেন্দ্রের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পর থেকেই অবশ্য ধাপে ধাপে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু সংস্থাটির। সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠনের আগে ২০০৬-’০৭ সালে সংস্থার নিট সম্পদ শূন্যের নীচে নেমে যায়। দায় দাঁড়ায় প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা। পুঞ্জীভূত লোকসান ছিল প্রায় ৪৩২ কোটি। ২০০৭-’০৮ থেকেই উন্নতি হতে থাকে। ২০০৮-’০৯ সালে নিট সম্পদ দাঁড়ায় ৬.৭৫ কোটি। এবং পুঞ্জীভূত লোকসান কমতে কমতে শেষ পর্যন্ত ২০১৩-’১৪ সালে পুঞ্জীভূত মুনাফা হয় ৭.৪২ কোটি টাকা। ২০১৪-’১৫ সালে পুঞ্জীভূত মুনাফার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ২০.৩৮ কোটি এবং নিট সম্পদ ২২৪.০৬ কোটি টাকা। সংস্থার ব্যবসার পরিমাণও ১৪৬ কোটি (২০০৬-’০৭) থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৯৪.২৬ কোটি। অধীনে থাকা দুই সংস্থা ফিনিক্স ইয়ুল এবং ডিপিএসসি বিক্রি করে পাওয়া ৮৭ কোটি দিয়ে কেন্দ্রের ঋণও মিটিয়ে দিয়েছে সংস্থা।

তবে এখনও সংস্থাটি বিআইএফআরের আওতা থেকে বেরোয়নি। সিএমডি-র দাবি, আয়কর সহ কয়েকটি বিষয়ের এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। উল্লেখ্য, পুনর্গঠনের জন্য বিআইএফআরের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অবশ্য ২০১৮ পর্যন্ত।

অ্যান্ড্রু ইয়ুলের শাখা তিনটি — চা, বৈদ্যুতিক বিভাগ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং। ব্যবসা বাড়াতে চা এবং বৈদ্যুতিক বিভাগে নতুন করে লগ্নি করছে সংস্থা। গ্রিন টি-র বাজার প্রায় ৩০% হারে বাড়ছে, দাবি সংস্থার কর্তাদের। দুই বাগান— দার্জিলিঙের মিম ও ডুয়ার্সের নিউ ডুয়ার্স টি এস্টেটে তাই গ্রিন টি তৈরির জন্য ১.৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানা তৈরি করেছে তারা। প্রথমটি জুনের শেষে এবং পরেরটি জুলাইয়ে চালু হবে। এ ছাড়া চায়ের উৎপাদন বাড়াতে সব মিলিয়ে ১০০ কোটি খরচ করেছে সংস্থা। ফলে উৎপাদনশীলতা হেক্টর প্রতি ১৫০০ কেজি থেকে বেড়ে ১৮৫০ কেজি দাঁড়িয়েছে, দাবি কর্তাদের। পাশাপাশি রাজারহাটের ইকো পার্কের চা বাগানে একটি ‘টি লাউঞ্জ’ও চালু করছেন তাঁরা। উল্লেখ্য, সংস্থাটির মোট ব্যবসার প্রায় ৫০ শতাংশেরই উৎস চা।

অন্য দিকে, চেন্নাইয়ের পুরনো ট্রান্সফর্মার কারখানাটি বন্ধ করে শ্রীপেরুমপুদুরে উচ্চ ক্ষমতার (৪০০ কেভি পর্যন্ত) ট্রান্সফর্মার তৈরির জন্য নতুন কারখানা চালু করছে অ্যান্ড্রু ইয়ুল। কারখানার উৎপাদন ক্ষমতাও বাড়বে। লগ্নি হচ্ছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। বছর দু’তিনেকের মধ্যে এই ব্যবসা থেকে ৫০০ কোটি টাকা আয়ের আশা করছেন কল্লোলবাবু। পাশাপাশি পুরনো কারখানার জমি বেচে ভাল আয়ের আশা করছেন তাঁরা।

রাশিয়ার টগলিয়াট্টি সংস্থার সঙ্গে তাঁদের যে-গাঁটছড়া রয়েছে, তারই অধীনে প্রচুর এ ধরনের ট্রান্সফর্মার তৈরির বরাত সংস্থা পেয়েছে, জানান কল্লোলবাবু। আপাতত একটি বরাত চূড়ান্ত। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই দ্রুত চেন্নাইয়ের নতুন কারখানা চালু করতে ইচ্ছুক তাঁরা।

তবে কলকাতায় সংস্থাটি বিদ্যুৎ বণ্টনের ট্রান্সফর্মার তৈরি করে। কল্লোলবাবুর আক্ষেপ, ভিন্ রাজ্য থেকে ট্রান্সফর্মারের বরাত পেলেও যে-রাজ্যে কারখানাটি রয়েছে, সেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে কোনও বরাত পান না। তিনি জানান, এ রাজ্যে দরপত্রের ভিত্তিতে যে-পদ্ধতিতে বরাত দেওয়া হয়, তাতে তাঁরা অংশ নিয়েছেন। কিন্তু কখনওই নির্বাচিত হননি। তবে এ ক্ষেত্রে দরপত্র নয়। কর্নাটক, ওড়িশা বা তেলঙ্গানার মতো রাজ্যে যে-ভাবে সংস্থা মনোনয়ন (নমিনেশন) করার পদ্ধতি রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গেও তাঁরা সেই সুবিধা দাবি করেছেন।

নতুন প্রজন্মের কাছে ভিন্ন রূপে নিজেদের তুলে ধরতে চায় সংস্থা। যেমন, এক দিকে প্যাকেট-জাত চায়ের অনলাইন বিক্রি বাড়াতে ফেসবুক বা ট্যুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে হাত মেলানোর পথে হাঁটছে তারা। তেমনই আবার নতুন বৈদ্যুতিক এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য তৈরির জন্য জার্মানির গবেষণা সংস্থার সঙ্গেও গাঁটছড়া বাঁধার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থার। হ্যানোভারের মেলায় যোগদানের সূত্রেই ওই সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ অ্যান্ড্রু ইয়ুলের।

সব মিলিয়ে পুরনো মলিনতা ঝেড়ে ফেলে নতুন পথে পা রাখছে অ্যান্ড্রু ইউল।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন