আবার ফিরে এসেছে বছরের সেই সময়টা। গড়িমসি করে ফেলে রাখার পরে শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়ো। আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার। হাতে দু’সপ্তাহও সময় নেই। যত দ্রুত সম্ভব সেরে ফেলতে হবে সেই কাজ। রিটার্ন জমা তো দেবেন। কিন্তু তার আগে এর খুঁটিনাটি জেনে রাখলে সুবিধা আপনারই। কারণ গত বছর থেকে চালু হওয়া নিয়মে রিটার্ন জমায় দেরি হলেই গুনতে হবে জরিমানা। সেই বিষয়েই আজকের আলোচনা।

অগ্রিম কর জমা

চাকরিজীবীদের প্রতি মাসে বেতন থেকেই কর কেটে নেওয়া হয়। আর প্রবীণ নাগরিকদের ব্যবসা বা চাকরি থেকে আয় না থাকলে অগ্রিম কর জমা দিতে হয় না। তার বাইরে করের দায় বছরে ১০ হাজার টাকার বেশি হলে, চার কিস্তিতে তা অগ্রিম জমা করতে হবে। সেই সব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কর জমার তারিখ এবং অনুপাত এই রকম:

• ১ম কিস্তি: ১৫ জুন (১৫%)

• ২য় কিস্তি: ১৫ সেপ্টেম্বর (৪৫%)

• ৩য় কিস্তি: ১৫ ডিসেম্বর (৭৫%)

• ৪র্থ কিস্তি: ১৫ মার্চ (১০০%)

মনে রাখবেন, গত অর্থবর্ষের জন্য এই কর জমার সময় কিন্তু পেরিয়ে গিয়েছে। এ বারেরও জুনের সময়সীমা পার হয়েছে। কিন্তু তার পরেরগুলি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা দিতে হবে।

 

সময়সীমা

কর জমার পরেই আসে রিটার্ন ফাইলের প্রসঙ্গ। তবে এর জন্য সকলের সময়সীমা এক নয়।

• ব্যক্তিগত আয়করদাতা এবং যাঁদের অ্যাকাউন্ট অডিটের প্রয়োজন নেই, তাদের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে রিটার্ন জমা করতে হবে।

• সংস্থা ও অন্যান্য আয়করদাতা, যাঁদের অ্যাকাউন্ট অডিট করতে হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে সেই সময়সীমা ৩০ সেপ্টেম্বর।

 

অনলাইনে রিটার্ন

এখানকার নিয়ম অনুসারে—

• রিফান্ড পাওয়ার থাকলে, আয় যা-ই হোক না কেন, ই-ফাইলিং করতে হবে।

• আয় ৫ লক্ষ টাকা বা তার নীচে হলে এবং রিফান্ডের ব্যাপার না-থাকলে, ই-ফাইলিং বাধ্যতামূলক নয়।

• ৫ লক্ষ টাকার বেশি আয় বা কর ফেরতের (রিফান্ড) ব্যাপার থাকলে এবং আইটিআর-৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭-এর ক্ষেত্রে ই-ফাইলিং বাধ্যতামূলক।

• কারও বয়স ৮০ বছরের বেশি হলে এবং তিনি যদি আইটিআর-১ অথবা ২ ফাইল করেন, তাঁর ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।

 

কাদের জন্য কোন ফর্ম   

সকলের জন্য এক ফর্ম নয়। বরং আপনার বেতন, আয়ের সূত্র ইত্যাদির ভিত্তিতে তা আলাদা। এক নজরে দেখে নিই কার জন্য কী ফর্ম লাগবে।

আইটিআর-১ (সহজ): বেতন, বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য সূত্র (সুদ ইত্যাদি) থেকে আয় ৫০ লক্ষ টাকার মধ্যে হলে এই ফর্ম ভর্তি করতে হবে।

আইটিআর-২: যদি আপনি কোনও পার্টনারশিপ ফার্মের একজন অংশীদার হন এবং আলাদা করে নিজের কোনও ব্যবসা না-থাকে বা স্বাধীন পেশাদার হিসেবে কাজ না-করেন, তা হলে এই ফর্ম আপনার জন্য।

আইটিআর-৩: নিজের ব্যবসা থাকলে বা পেশাদার হিসেবে স্বনির্ভর হলে এবং সেখান থেকে মুনাফা করলে, এই ফর্ম লাগবে। আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের মতো স্বাধীন পেশাদারদের এটিই পূরণ করতে হবে।

আইটিআর ৪এস (সুগম): ব্যবসার ক্ষেত্রে আনুমানিক আয়ের ভিত্তিতে কর দেওয়ার সুবিধা থাকলে, তার রিটার্ন জমা দিতে এই ফর্ম লাগবে।

 

আর দেরি নয়

হাতে আর দু’সপ্তাহও নেই। তাই সময় নষ্ট না করে এখনই শেষ ল্যাপে দৌড়নো শুরু করুন। চলুন দেখে নিই এ জন্য কী কী করতে হবে—

• যতগুলি চালু সেভিংস অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তাদের সবক’টির নম্বর একটি জায়গায় লিখুন।

• কোন অ্যাকাউন্ট থেকে কত সুদ পেয়েছেন, পাসবই/ স্টেটমেন্ট থেকে সেই টাকার হিসেব করুন। একটি অর্থবর্ষে সব ক’টি সেভিংস অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে মোট সুদ ১০,০০০ টাকার কম হলে কর দিতে হয় না। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে তা যদি বেশি হয়, তা হলে দেখে নিন তার উপর কর দেওয়া হয়েছে কি না। কর দেওয়া না হয়ে থাকলে তা জমা করুন। 

• পাসবই/ ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট থেকে দেখে নিন, অ্যাকাউন্টে যে সুদ বাবদ আয় দেখা যাচ্ছে, তা আপনার দেখানো মোট আয়ের মধ্যে রয়েছে কি না।

• ডোনেশন দিয়ে থাকলে, দেখুন প্রাপকের প্যান নম্বর দিয়েছেন কি না।

• সব ক’টি টিডিএস সার্টিফিকেট জোগাড় করুন। 

• আয়কর দফতরের সাইটে গিয়ে ২৬এএস ফর্মে দেখে নিন আপনার কর এবং উৎসে কাটা করের হিসেব।

• চাকরিজীবী হলে এর সঙ্গে রাখুন ফর্ম ১৬। আর ব্যবসা থাকলে লাভ ও ক্ষতির হিসেব।

• অগ্রিম কর জমা দিয়ে থাকলে, তার চালান হাতের কাছে রাখুন। 

• ভারতে বসবাসকারী করদাতাদের ক্ষেত্রে যেমন রিফান্ডের টাকা জমা পড়ার জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য দিতে হয়, তেমনই বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের রিটার্ন দাখিলের জন্য এ বার একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য জানাতে হবে। সেখানেই জমা পড়বে রিফান্ডের টাকা।

• আয় ৫ লক্ষের বেশি হলে বা রিফান্ড পাওয়ার থাকলে, নেটেই রিটার্ন জমা দিতে হবে। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারে সড়গড় হয়ে নেওয়া ভাল।

• রিটার্নের একাধিক ফর্মের কথা আগেই বলেছি। দেখে নিন, এর মধ্যে কোনটি আপনার জন্য প্রযোজ্য। তাতে ভর্তি করুন সব তথ্য।

• শেষ দিন যত সামনে আসবে, ততই ই-ফাইলিংয়ের জন্য আয়কর দফতরের ওয়েবসাইটে চাপ বাড়বে। তাই তার জন্য বসে না-থেকে আগেভাগে রিটার্ন ফাইল করুন।

• সব কাগজ আয়কর ফাইলে রেখে দিন। পরে দেখাতে হতে পারে।  

 

নেটে রিটার্ন যাচাই

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া মানেই কাজ শেষ, তা নয়। রিটার্ন জমার ১২০ দিনের মধ্যে তার কাগজে সই করেও পাঠাতে হবে। রিটার্ন অনলাইনে দিয়ে থাকলে, এখন সেই ই-ভেরিফিকেশন করা যায় ইন্টারনেটেই।

এত দিন রিটার্ন জমার পরে যে কাগজ মিলত, তা সই করে বেঙ্গালুরুতে আয়কর দফতরের কেন্দ্রীয় প্রসেসিং সেলে (সিপিসি) পাঠাতে হত। যাতে রিটার্নের সঙ্গে তা মেলানো যায়। কিন্তু এখন রিটার্ন জমার পরে সেই কাগজ ভেরিফিকেশনের জন্য অনলাইনেই পাঠানো যাবে।

• ফোনে আসা ‘ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড’ (ওটিপি) ব্যবহার করে তা করতে চাইলে থাকতে হবে আধার কার্ড এবং তার সঙ্গে মোবাইল নম্বরও যুক্ত থাকতে হবে।

• না-থাকলেও তা করা যাবে নেট ব্যাঙ্কিং, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ডি-ম্যাট অ্যাকাউন্ট, এটিএম কিংবা ই-মেল ব্যবহার করে।

• আয় ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হলে এবং রিফান্ডের ব্যাপার না থাকলে, এই ভেরিফিকেশন ই-মেল এবং মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেই করা যায়।

• তবে মনে রাখবেন, কর জমা বা রিটার্ন নিয়ে দফতরের প্রশ্ন থাকলে, তারা ভেরিফিকেশনের অনুমতি না-ও দিতে পারে।

 

জমা পড়ল তো?  

• আয়কর দফতরের ওয়েবসাইটে (www.incometaxindiaefiling.gov.in) যান।

• জমা রিটার্নের তথ্য দেখতে ভিউ রিটার্নস/ফর্মস-এ যান।

• ‘ক্লিক হিয়ার টু ভিউ ইয়োর রিটার্নস পেন্ডিং ফর ই-ভেরিফিকেশন’ লেখায় ক্লিক করুন। 

• ‘ই-ভেরিফাই’-এ ক্লিক করুন। দেখতে পাবেন ই-ভেরিফাই করার অনেক ধরনের উপায়।

• যে পদ্ধতিতে চাইছেন (যেমন, নেট ব্যাঙ্কিং, ই-মেল ইত্যাদি), সেই উপায়ে ই-ভেরিফাই এবং সাবমিট করুন।

• আপনার ট্রানজাকশন আইডি এবং ই-ভেরিফিকেশন কোড (ইভিসি) লেখা মেসেজ দেখতে পাবেন।

• চাইলে তা ডাউনলোড করে রাখতে পারেন। এখানেই কাজ শেষ, আর কিছু করতে হবে না। 

 

অতএব...

হাতে সময় মাত্র কয়েকদিন। আর দেরি না করে চটপট সেরে ফেলুন রিটার্ন জমার কাজ। যাতে শেষ দিনে দৌড়োদৌড়ি করতে না হয়।

 

লেখক: কর ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ

(মতামত ব্যক্তিগত)