চাকরি নামমাত্র। আরও কম সরকারি চাকরি। যেটুকু শূন্যপদ রয়েছে, তা-ও নেহাতই সাধারণ মানের, বেতনও সামান্য। কিন্তু সারা দেশে কয়েক কোটি উচ্চশিক্ষিত বেকার ছুটছেন তাতেই ভাগ বসাতে। ফলে কর্মী বাছাইয়ের উপযুক্ত প্রবেশিকা পরীক্ষা কেমন হবে, তা ঠিক করতেই নাজেহাল সরকারি নিয়োগ দফতর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, যৎসামান্য চাকরির বাজার ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ির প্রবণতা ভারতে এখনও স্পষ্ট। আর, এটাই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যা থেকে এখনও তারা বেরিয়ে আসতে পারেনি। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে গত এক বছরে আরও প্রকট হয়ে ওঠা উন্নয়ন না-থাকার এই ছবি দেখে সরকারি মহলেই একটি প্রশ্ন উঠেছে। লোকসভা ভোটের আগে নরেন্দ্র মোদীর প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার সবাইকে কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কি তা হলে শুধু কথার কথা?

তথ্য-পরিসংখ্যানও দাখিল করেছেন সরকারি আধিকারিকরা। উত্তরপ্রদেশে মাত্র ৩৬৮টি তথাকথিত কম মাইনের সরকারি চাকরির জন্য ২৩ লক্ষ আবেদন পড়ার প্রসঙ্গ টেনেছেন তাঁরা। ওই রাজ্যের সরকারি নিয়োগ দফতরের ম্যানেজার প্রভাত মিত্তল বলেন, ‘‘আবেদনের বহর দেখে আমার চোখ কপালে। ওই আবেদনকারীদের ইন্টারভিউ-তে ডাকতেই লেগে যাবে তিন বছরের বেশি।’’ শুধু তা-ই নয়, ছবিটা যে আরও ঘোরালো, তা-ও তিনি স্পষ্ট করেছেন। ওই সব চাকরিতে মাইনে মাসে সাকুল্যে ১৬ হাজার টাকা। যোগ্যতা প্রাথমিক স্কুলের পাঠ শেষ করা এবং বাইক চালাতে জানা। কাজ সাধারণত চা তৈরি করা এবং বিভিন্ন সরকারি অফিসের মধ্যে ফাইল আনা-নেওয়া। অথচ ওই ২৩ লক্ষ আবেদনকারীর মধ্যে দেড় লাখই স্নাতক। এমনকী ডক্টরেট ডিগ্রিধারী অন্তত ২৫৫ জন। মিত্তলের কথায়, ‘‘এটা অবিশ্বাস্য। কেমন করে ঠিকঠাক প্রবেশিকা পরীক্ষা নেব, তার উপায় বার করাই আমাদের পক্ষে কঠিন হচ্ছে।’’ প্রসঙ্গত, এর আগে এ ধরনের সাধারণ কাজের জন্য উত্তরপ্রদেশ সরকার শেষ বার নিয়োগ করেছিল ২০০৬ সালে। এ বার আবেদনের সংখ্যা তার চেয়ে ১৬ গুণ বেশি।

একই ছবি ছত্তীসগঢ়েও। কিছু সরকারি পদে নামমাত্র কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা সে রাজ্যের সরকার গত মাসে বাতিলই করে দিয়েছে। তার কারণ ৭৫ হাজার আবেদনের বন্যা কী ভাবে সামাল দেবেন, তা ঠিক করে উঠতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। হন্যে হয়ে সরকারি চাকরি খোঁজার কারণ জানিয়েছেন আবেদনকারীরাই। উত্তরপ্রদেশের জনৈক স্নাতক সুরেশ বর্মা বলেন, ‘‘মাইনে কম হলেই বা কী। সরকারি চাকরিতে অনেক বেশি নিরাপত্তা। অন্য দিকে, বেসরকারি ক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি প্রবল।’’ 

জনসংখ্যা বিশারদরা জানিয়েছেন, ভারতে চাকরি নিয়ে এই কাড়াকাড়ির কারণ, তার বিপুল সংখ্যক অল্প বয়স্ক নাগরিক। ভারতের জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়সই ২৫ বছরের নীচে। আগামী দু’দশকে কাজের উপযুক্ত হয়ে উঠবেন আরও ৩০ কোটি মানুষ, যা প্রায় আমেরিকার জনসংখ্যার সমান। অর্থনীতিবিদরা ইতিমধ্যেই পূর্বাভাস দিয়েছেন, এই বিপুল জনসংখ্যাকে সম্পদ হিসেবে কাজে লাগাতে পারলে তবেই আর্থিক বৃদ্ধিতে চিনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারবে নয়াদিল্লি। কারণ, চিনের জনসংখ্যার সিংহভাগই বয়স্ক। কিন্তু ভারতের ওই অল্প বয়সীদের জন্য কাজের ব্যবস্থা করতে না-পারলে সম্পদ বোঝা হয়ে দাঁড়াবে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা।