২০২৬ সালের ছ’মাস পার হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, সোনার দাম আবার প্রায় বছরের শুরুর অবস্থানে ফিরেছে। বছরের শুরুতে এই মূল্যবান ধাতুর যে দাম ছিল, তা কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে— যা ২০২৫ সালে দেখা ৬৫ শতাংশ উল্লম্ফনের তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। তবে জেপি মরগ্যান গ্লোবাল রিসার্চ এখনই সোনা নিয়ে আশা ছাড়ছে না। সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের চতুর্থ ত্রৈমাসিকের শেষ নাগাদ এর গড় দাম প্রতি আউন্সে ৬,০০০ ডলারে পৌঁছোবে (গ্রামপ্রতি প্রায় ২০ হাজার টাকা) এবং ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তা বেড়ে ৬,৩০০ ডলারে দাঁড়াবে। এর অর্থ হল, জেপি মরগ্যানের এই পূর্বাভাস যদি সঠিক প্রমাণিত হয়, তবে বিনিয়োগকারীরা বর্তমান ৪,৩০০ ডলারের দাম থেকে বছরের শেষে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পেতে পারেন। বিনিয়োগকারীদের জন্য এই খবর আনন্দের হলেও সোনার দামে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি চাপে ফেলতে পারে সাধারণ মানুষকে।
জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সোনায় যে মূল্যবৃদ্ধি আশা করা হচ্ছে, তার তুলনায় ২০২৭ সালে এটি তুলনামূলক ভাবে কম রিটার্ন বা মুনাফা দিতে পারে। সোনার দামে বড় ধরনের কোনও পরিবর্তন বা উত্থান-পতন যদি ঘটে, তবে তা ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর পিছনে মূলত তিনটি বিষয় কাজ করবে— ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সোনা কেনার প্রবণতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত শক্তি।
আরও পড়ুন:
২০২৬ সালে সোনার দাম কেন চাপের মুখে পড়েছে? আমেরিকা-ইরান সংঘাত সোনার বাজারের পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের উত্তেজনার জেরে, বিশেষ করে হরমুজ় প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে সোনার দাম প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। তেলের উচ্চমূল্য মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এর ফলে সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সোনা এমন একটি সম্পদ যা থেকে কোনও সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায় না। তাই সুদের হার যখন বেশি থাকে এবং তা উচ্চ পর্যায়েই থাকার সম্ভাবনা থাকে, তখন বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনার আকর্ষণ কমে যায়।
এ বছর সোনার ‘স্পট প্রাইস’ বা তাৎক্ষণিক বাজারদরের ওঠানামার পিছনে বেশ কিছু বিষয় ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে আমেরিকার ফেডারেল রিজ়ার্ভের সুদের হার বিষয়ক প্রত্যাশা, তেলের দাম, মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের মান, বাণিজ্য সংক্রান্ত উদ্বেগ, ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কট এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির ব্যাপক হারে সোনা কেনা। অনুকূল ও প্রতিকূল, উভয় ধরনের প্রভাবের এই মিশ্রণের ফলে ২০২৬ সালের বেশির ভাগ সময় জুড়ে সোনার দাম কোনও নির্দিষ্ট অভিমুখে এগোতে পারেনি।
বর্তমানে সোনা দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি সীমার মাঝখানে আটকে পড়ে এক অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। সংবাদমাধ্যম ‘ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেপি মরগ্যানের ‘বেস অ্যান্ড প্রেশাস মেটালস’ বিভাগের প্রধান গ্রেগ শিয়ারার বলেছেন, “সোনা বর্তমানে কারিগরি দিক থেকে এক ধরনের ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’ বা অনিশ্চিত অবস্থানে আটকে রয়েছে। এটি আউন্সপ্রতি ৪,৩৪০ ডলারের কাছাকাছি থাকা ২০০-দিনের ‘মুভিং অ্যাভারেজ’-এর উপরে অবস্থান করছে। কিন্তু আউন্সপ্রতি ৪,৭৩০ ডলারের ৫০ দিনের ‘মুভিং অ্যাভারেজ’-এর নীচে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। বাজারের এই ধীরগতির এবং স্থবির অবস্থার মাঝে ও জ্বালানিচালিত মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় ফেডারেল রিজ়ার্ভের সুদের হার বাড়ানোর আশঙ্কার কারণে, অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর কাছে সোনা এখন খুব একটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।”
স্বল্পমেয়াদি প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, জেপি মরগ্যানের গবেষকেরা দীর্ঘমেয়াদি এমন কিছু ইতিবাচক কারণ দেখছেন যা সোনার দাম বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। ইরান, ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার মধ্যেকার ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত সোনার দাম বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে থাকলেও বর্তমানে আমেরিকা-ইরান শান্তিচুক্তি পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। টানা তিন দিন ধরে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৪,৩০০ ডলারের উপরে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, এর নেপথ্যে রয়েছে সদ্য স্বাক্ষরিত আমেরিকা-ইরান শান্তিচুক্তি। এই চুক্তিতে অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি গুটিয়ে ফেলার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে দাবি। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের সম্ভাব্য সমাপ্তি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সোনার দামে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাধারণত তেলের দাম এবং ডলারের দাম কমলে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে সোনা। ডলারের দাম এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফলে যাঁরা ডলারের বাইরে অন্য মুদ্রা ব্যবহার করেন, তাঁদের জন্য সোনা কেনা সাশ্রয়ী হয়ে পড়েছে। তেলের দাম ৪ শতাংশেরও বেশি কমেছে। এর মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলারের নীচে নেমে দু’মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে ১৯ জুন সুইৎজ়ারল্যান্ডের আমেরিকা-ইরান চুক্তিটি যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকর না হয়, তবে এই প্রবণতা দ্রুত উল্টে যেতে পারে। ফলে এই মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।