সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

চার আনায় ইচ্ছে

পুজো মানে দেদার মজা, কেনাকাটা। কিন্তু বহু কলেজপড়ুয়ার দুঃখ, বাবা-মা হাতে গোনা টাকা দেন। ইচ্ছে সত্ত্বেও কিছু কেনার কথা বলতে বাধো বাধো ঠেকে বাড়ির বৌয়ের। তাঁদের সমস্যা, নিয়মিত নিজের আয় না-থাকা। অথচ টুক-টাক হাতে আসা টাকা জমানোর রাস্তা জানা থাকলে অপূর্ণ থাকে না সেই স্বপ্ন। কৌশল শেখালেন অমিতাভ গুহ সরকার

investment
—ফাইল চিত্র।

Advertisement

আর মাত্র দু’সপ্তাহ। তার পরেই অন্তত চার দিনের জন্য সারা বছরের ঝামেলা-ঝক্কি, রোজকারের গতানুগতিক জীবন থেকে মুক্তি। চারপাশে পুজো পুজো গন্ধ। ঢাকের বাদ্যি। নতুন জামাকাপড়। জমাটি আড্ডা-খাওয়াদাওয়া। প্যান্ডেলে ঘোরা। কিন্তু যাঁরা রোজগার করেন না, তাঁদের অনেকেই মুখ চুন করে ঘুরে বেড়ান। এই সবের জন্য কি সব সময়ে বাবা-মা, স্বামীর কাছে হাত পাততে ভাল লাগে? তা যখন লাগে না, তখন বরং কৌশলটা একটু বদলান। শুরু করুন বছরের প্রথম মাস থেকে। হাত খরচ, টিউশন বা কোনও ছোটখাটো অস্থায়ী কাজ করে আয় করা টাকা, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী বা অন্য যে কোনও কারণে পাওয়া উপহার—উৎস যা-ই হোক না কেন, টাকা হাতে এলেই জমান। যা দিয়ে অন্তত এই কটা দিন নিজের ইচ্ছেমতো কেনাকাটা করতে পারবেন ঘুরতে-বেড়াতে পারবেন, কাটাতে পারবেন নিজের মতো। আজ তাই দেখব যে সব পড়ুয়া বা গৃহবধূদের নিজস্ব নিয়মিত আয় নেই, তাঁরা কী করে তৈরি করবেন তহবিল। মাঝেমধ্যে হাতে আসা টাকা দিয়েই। এতে শুধু যে কিছুটা টাকা জমবে, তা-ই নয়। তৈরি হবে পরবর্তী জীবনে সঞ্চয়ের অভ্যেসও।

ছোট্টদের সঞ্চয়

যদিও এই লেখা ছোটদের সমস্যা বাতলে দেওয়ার জন্য নয়। কারণ তারা মা-বাবার সঙ্গেই আনন্দ করে। তবু প্রথমে তাদের দিয়েই শুরু করি। মূলত জমানোর অভ্যাস প্রসঙ্গে।  ভাবছেন যে একেবারে বাচ্চা আবার কোথা থেকে টাকা জমাবে? তাদের জন্য তো অভিভাবকই রয়েছেন। অনেকে আবার বাচ্চাদের হাতে টাকা পয়সা দিতে চান না। কেউ ভাবেন এত ছোট থেকে হাতে টাকা দিলে খরচের অভ্যাস তৈরি হবে। কারও ভায় টাকা খোয়া যাওয়ার। অথচ ভেবে দেখুন, সকালে উঠে দাঁত মাজতে হবে এটা তো আপনি হাতে ধরে শেখাচ্ছেন। তেমনই ঘরের তাকে পড়ার বইয়ের সঙ্গে যদি টাকাপয়সা জমানোর জন্য ভাঁড় রেখে দেন আর বাচ্চাকে এক-দু’টাকা হাতে দিয়ে বলেন সেখানে জমা করতে, দেখবেন অভ্যাস তৈরি হতে বেশি দিন লাগবে না। বরং এটাকে তারা মজার খেলা হিসেবেই নেবে।

পুজো বা জন্মদিনে বড় অঙ্কের টাকা হাতে এলে অবশ্য ভাঁড়ে রাখা সম্ভব নয়। সেটা আপনাকেই ব্যাঙ্কে বা অন্য কোনও খাতে সঞ্চয় করতে হবে। কিন্তু ছোটদের ক্রমাগত জমিয়ে যাওয়া দু’পাঁচ টাকা দিয়েই দেখবেন বেশ কয়েক বছর পরে বড় তহবিল তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আর দশ বছর বয়স হলে ছোটদের সেভিংস অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা তো রয়েইছে। আর এ ভাবেই কয়েক বছর পরে যে টাকা জমবে, তা দিয়ে হয়তো দেখা গেল কচির পছন্দের সাইকেল কেনা হয়ে যাচ্ছে।

ছোট্ট ছোট্ট পায়ে...

মাসে জমা মেয়াদ (মাসে) মোট জমা মেয়াদ শেষে
৫০০ ৬০ ৩০০০০ ৩৫৯৬৭
১০০০ ৬০ ৬০০০০ ৭১৯৩৪
১০০০ ১২০ ১,২০,০০০ ১,৭৩,৭০৬
১০০০ ৮৪ ১,৬৮,০০০ ২,১৬,৯২৯

* রেকারিং ডিপোজিটের সুদ ৭% ধরে। । সব হিসেব টাকায়।

কৈশোরের লগ্নি

ছোটবেলায় বলেছি হাতে আসলেই টাকা ভাঁড়ে ফেলার বা সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখার কথা। তেমনই কৈশোরে পা দিয়ে তৈরি করতে হবে লগ্নির মানসিকতা। অনেক সময়েই বাবা-মায়েরা মনে করেন, এই বয়সে আবার লগ্নি কী শিখবে! ফলে দেখা যায় পরে গিয়ে দায়িত্ব না-চাপলে তার অভ্যাসও তৈরি হয় না। কিন্তু শেষে গিয়ে যখন দায়িত্ব চাপে, তত দিনে অনেক দেরি হয়ে যায়।

তাই মোটামুটি ১৩ বছরের পর গিয়ে সেভিংসের থেকে আর একটু এগিয়ে ভাবতে হবে। সে জন্য খোলা যেতে পারে রেকারিং বা পিপিএফ। সেভিংসের টাকা রাখার মধ্যে দিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিভিন্ন পরিষেবার সঙ্গে হাতেখড়ি হয়েছে আগেই। আজকাল বেশির ভাগ ব্যাঙ্কেই ছোটদের নেট ব্যাঙ্কিং বা কার্ড ব্যবহারেরও অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে সেগুলিতে সড়গড় হওয়া যাবে। এ বার ওই নেট ব্যাঙ্কিংয়েই খুলে দিন রেকারিং। মোটামুটি নবম-দশম শ্রেণিতে গিয়ে পুজোর সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়ার টাকাটা জোগাড় হয়ে যাবে সেখান থেকেই। আবার হাতে টাকা এলেই খরচ করে ফেলার প্রবণতা কমবে। উৎসাহ তৈরি হবে জমানোয়।

কলেজে পা দিয়ে

এখন বহু ছেলেমেয়েই হাতখরচ বাবদ প্রতি মাসে বাবা-মায়ের কাছ থেকে ভাল টাকা পায়। অনেকে আবার নিজে পড়া চালানোর সঙ্গেই টিউশনি করে বা আংশিক সময়ে কাজ করে টাকা রোজগার করে। টাকা হাতে আসে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার প্রায় পুরোটা খরচ হয়ে যায়। কিন্তু সেই টাকা থেকেই কিছুটা করে সরিয়ে রাখলে বড় তহবিল তৈরি করা সম্ভব। তখন হয়তো দেখা যাবে, পড়ার সময়ে ফটোকপি করা বা বই কেনার জন্য বাবা-মাকে বলতে হচ্ছে না। তেমনই পুজো, বেড়াতে যাওয়ার সময়ে করা যাচ্ছে হাত খুলে খরচও। আবার চাইলে কয়েক বছর ধরে জমিয়ে কেনা যাবে দামি জিনিসও।

যেমন ধরুন, কেউ ১৭-১৮ বছর বয়স থেকে ব্যাঙ্কে বা ডাকঘরে মাসে ৫০০ টাকা করে জমাতে শুরু করলেন। এ ভাবে বছরে জমবে ৬,০০০ টাকা (সুদ বাদে)। পাঁচ বছর জমাতে পারলে তা দাঁড়াবে ৩০,০০০ টাকায়। ওই টাকার সঙ্গে সুদ ও নিজের আর কিছু টাকা যোগ করলে বেশি ভাল একটা ল্যাপটপ কেনা সম্ভব। আর যদি মাসে হাতে আসার টাকার মধ্যে ৫০০ টাকার বদলে ১,০০০ রাখা যায়, তা হলে দ্বিগুণ টাকা হাতে আসবে। যা দিয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বেরিয়ে আসাও যাবে। বাবা-মায়ের উপরেও চাপ তৈরি হবে না। আবার নিজে কিছু করার আনন্দও আসবে।

গৃহবধূর সঞ্চয়

এতো গেল না-হয় ছোটদের সঞ্চয়ের কথা। কিন্তু তাদের সেই অভ্যাস যিনি তৈরি করবেন, সেই মায়েরাও হাতে আসা অল্প টাকা দিয়েই গড়ে তুলতে পারেন তহবিল। হাতখরচ, উপহার হিসেবে পাওয়া টাকা বা সংসার খরচ থেকে বাঁচানো সম্বলটুকুই তাঁদের ছোট শখ-আহ্লাদ মেটানোর চাবিকাঠি। যার জোরে প্রতিটি ছোটখাটো প্রয়োজনে বারবার হাত পাতার দরকার পড়ে না। ছোটবেলা থেকে সঞ্চয়ের অভ্যেস থাকলে তো কথাই নেই। তা হলে আপনি জানেন কোথায় কী ভাবে টাকা রাখা যায়। কিন্তু না-জানলে এখনও সময় রয়েছে। এ বারের পুজোয় হবে 

না। কিন্তু পুজোর পরেই তৈরি করতে হবে নিজেকে। এ জন্য—

• প্রথমেই সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। কারণ বাড়িতে টাকা রাখাই যায়, কিন্তু তাতে সুদ মেলে না। আবার  তা খরচও হয়ে যায়।

• হাতে বাড়তি টাকা থাকলেই তা জমা করে দিতে হবে ওই অ্যাকাউন্টে।

• দেখে নিন কোন খরচ কমাতে পারলে মাসের শেষে কিছু টাকা বাঁচানো যাবে।

• প্রতি মাসেই যে সংসার খরচের পরে একই টাকা থাকবে, তা নয়। কিন্তু যদি হাতখরচ পান, তার অন্তত ১০%-২০% নিয়মিত জমানোর ব্যবস্থা করুন। খুলতে পারেন ৩-৫ বছরের রেকারিং। এমনিতে রেকারিংয়ে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক জমাতে হয়। তবে অনেক ব্যাঙ্কে এখন বিভিন্ন অঙ্ক জমার ব্যবস্থাও থাকে। অর্থাৎ, চাইলে এক মাসে সেখানে ৫০০ টাকা দিলেন। কিন্তু পরের মাসে ১,০০০ টাকা দিতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রথমে যে টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন, প্রতি মাসে অন্তত সেই টাকা দিতেই হয়। তাই শুরুতেই খুব বেশি টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলবেন না। পরে হাতে টাকা না-থাকলে সমস্যা হতে পারে।

• আর যদি সাধারণত রেকারিং খোলেন, তা হলে সেভিংস থেকেই টাকা কেটে নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারেন। এতে ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকা জমার ঝক্কি কমবে। আজকাল প্রায় সকলেই স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন। সেখানেই অ্যাপ বা নেট ব্যাঙ্কিং শিখে নিতে পারলে ব্যাঙ্কে দৌড়তে হবে না।

• আর একটু বড় মেয়াদে জমানোর কথা ভাবলে মিউচুয়াল ফান্ডে এসআইপি করতে পারেন। খুব কম মেয়াদের জন্য এই পথে হাঁটবেন না।

• অনেক গৃহবধূরই লগ্নি, ব্যাঙ্কের কাজকর্ম নিয়ে সে ভাবে জ্ঞান থাকে না। এই সুযোগে তা-ও জেনে যাবেন। তা পরে নিজের তো কাজে লাগবেই, বাচ্চাকেও শেখাতে পারবেন।

খরচে রাশ

উপরের বলা কথাগুলি তখনই ফল দেবে যদি খরচে রাশ টানা যায়। হাতে টাকা এলেই, আমার কোনও দায়-দায়িত্ব নেই ভেবে দেদার খরচা করে ফেললাম, এই ধরনের মানসিকতার পরিবর্তন করা দরকার। গৃহবধূদের তা-ও কিছুটা জমানোর প্রবণতা থাকে, কিন্তু স্কুল-কলেজে পড়ার সময়ে টাকা সরিয়ে রাখার কথা ভাবতে প্রায় কেউ-ই চায় না। তখন নজর থাকে দামি মোবাইল, বাইরে খাওয়া, ব্র্যান্ডেড জামাকাপড়ের দিকে। অথচ, কিছু ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হলে মন্দ নয়! হাতে টাকা এলে নিশ্চয় শখ-আহ্লাদ মেটাতে তা খরচ করবেন। কিন্তু তাতে খানিকটা লাগাম থাকাই ভাল।

উপরি পাওনা

উপরে বলা সাইকেলের জন্য কথা সঞ্চয়ের হাতেখড়ির একটা উদাহরণ মাত্র! কিন্তু বড় হয়ে চাকরি জীবন শুরুর পরে ছোটবেলার সেই ভাঁড়ে টাকা জমানোর অভ্যাসই পরবর্তী জীবনের পাথেয় হবে। বাজে খরচ করার প্রবণতা কমবে। বরং হাতে অতিরিক্ত টাকা এলেই তা জমিয়ে রাখতে ইচ্ছে করবে। আর প্রতি পদক্ষেপে জমানো সেই টাকাই দেখা যাবে কোনও প্রয়োজনে বা বিপদে কাজ লাগছে। তাই প্রথমে খুব বেশি টাকা নিয়মিত লগ্নি করা হয়তো হবে না, কিন্তু সেটা শুরু করা উচিত। অন্তত নিজের শখ পূরণের জন্য হলেও।

লেখক বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ

(মতামত ব্যক্তিগত)

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন