Advertisement
E-Paper

আয়ের ভুল হিসাব, ১৫.১৫ লক্ষ কোটির গরমিল! সেবি-র প্রশ্নের মুখে বিখ্যাত স্বর্ণসংস্থা, কেন সঙ্কটে পড়তে পারেন এলআইসির গ্রাহকেরাও?

রাজেশ এক্সপোর্টসকে নিয়ে সেবির অন্তর্বতিকালীন নির্দেশের প্রভাব শুধু প্রোমোটার এবং নিয়ন্ত্রকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লক্ষ লক্ষ সাধারণ বিনিয়োগকারী পরোক্ষ ভাবে এই সংস্থার সঙ্গে জড়িত। এর অন্যতম বড় অংশীদার হল এলআইসি।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ১৬:৩০
SEBI issued interim order and barred Rajesh Exports from accessing the securities market, analysts flag confidence crisis for LIC

রাজেশ এক্সপোর্টসের চেয়ারম্যান রাজেশ মেহতা। ছবি: সংগৃহীত।

রাজেশ এক্সপোর্টস। বহু বছর ধরে ভারতের অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠান। বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক এই সংস্থাটি স্বর্ণ ব্যবসার ক্ষেত্রে বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। হলুদ ধাতু পরিশোধন এবং বিশ্ব জুড়ে গয়না রফতানির মাধ্যমে সংস্থাটির বার্ষিক আয় এটিকে ভারতের বৃহত্তম তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির মধ্যে স্থান করে দিয়েছিল। কিন্তু এখন সেই রাজেশ এক্সপোর্টসই তদন্তের মুখে।

৩ জুন জারি করা একটি অন্তর্বর্তিকালীন আদেশে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সিকিউরিটিজ় অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (সেবি)’ রাজেশ এক্সপোর্টস এবং এর প্রোমোটার-চেয়ারম্যান রাজেশ মেহতার উপর শেয়ারবাজারে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির অভিযোগ, পাঁচটি অর্থবর্ষ জুড়ে হিসাবে ব্যাপক কারচুপি করেছে সংস্থাটি, যার মধ্যে ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকা ঘোষিত আয়ের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত। সেবির দাবি, টাকার অঙ্ক এতটাই বড় যে এটি অনেক দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের চেয়েও বেশি।

যদিও পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে। সেবির সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত নয়, অন্তর্বতিকালীন। রাজেশ এক্সপোর্টস এবং রাজেশ মেহতার আত্মপক্ষ সমর্থনের এবং অভিযোগগুলির জবাব দেওয়ার অধিকার রয়েছে। তদন্ত এখনও চলছে এবং চূড়ান্ত ফলাফল আসতে সময় লাগতে পারে। তবে অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হলে এর পরিণতি গুরুতর হতে পারে। সম্ভাব্য পরিণতির মধ্যে রয়েছে আর্থিক জরিমানা, অর্জিত মুনাফা বাজেয়াপ্তকরণ, দীর্ঘমেয়াদি বাজার নিষেধাজ্ঞা এবং আরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। তবে রাজেশ এক্সপোর্টসের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি ইতিমধ্যেই দালাল স্ট্রিটে আলোড়ন ফেলেছে এবং কর্পোরেট তথ্য প্রকাশ, নিরীক্ষকের তদারকি এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তবে রাজেশ এক্সপোর্টসকে নিয়ে সেবির অন্তর্বতিকালীন নির্দেশের প্রভাব শুধু প্রোমোটার এবং নিয়ন্ত্রকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লক্ষ লক্ষ সাধারণ বিনিয়োগকারী পরোক্ষ ভাবে এই সংস্থার সঙ্গে জড়িত। এর অন্যতম বড় অংশীদার হল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লাইফ ইনসিওর‌্যান্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (এলআইসি), যারা রাজেশ এক্সপোর্টসের প্রায় ১০.৮ শতংশ শেয়ারের মালিক। এলআইসি-র বিনিয়োগ আদতে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। শুধুমাত্র বড় বিনিয়োগকারী নয়, সংস্থা হিসাবে জীবনবিমার বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের অনেকটা অংশ আসে সাধারণ মানুষের প্রদেয় প্রিমিয়াম থেকে। সেবির অনুমান, এর ফলে জীবনবিমা সংস্থার যে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে, তার পরিমাণ ১২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

রাজেশ এক্সপোর্টস নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালের ১১ মার্চ, সেবি-র কাছে সংস্থাটির এক জন অংশীদারের অভিযোগ আসার পর। অভিযোগে অস্বাভাবিক বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক পাওনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, যা দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে বকেয়া ছিল বলে দাবি করা হয়েছিল। এই ধরনের দেনা প্রায়শই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ এগুলি অর্থ আদায়ে অসুবিধা বা সম্ভাব্য হিসাবরক্ষণের অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করে সেবি। ২০২৪-এর অক্টোবরে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি একটি তদন্তকারী কর্তৃপক্ষও নিয়োগ করে। পরে সংস্থার হিসাবপত্র পরীক্ষা করতে এবং ব্যবসায়ির গোষ্ঠীর দেওয়া আর্থিক তথ্য যাচাই করার জন্য ‘ফরেনসিক অডিটর বিডিও’-ও নিযুক্ত করে।

এর পরেই ৩ জুন রাজেশ এক্সপোর্টসের শেয়ারবাজারে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সেবি। সেবি-র নির্দেশের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, ২০২১-’২৫, এই পাঁচ বছরে রাজেশ এক্সপোর্টসের প্রায় সমস্ত সমন্বিত রাজস্ব এসেছে তাদের বিদেশি সহায়ক সংস্থাগুলো থেকে, মোট ঘোষিত বিক্রয়ে যার অবদান ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক সংস্থাটি ছিল ‘ভ্যালক্যাম্বি এসএ’। ‘ভ্যালক্যাম্বি এসএ’ সুইৎজ়ারল্যান্ড-ভিত্তিক একটি স্বর্ণ শোধনাগার, যেটিকে বহু বছর আগে রাজেশ এক্সপোর্টস অধিগ্রহণ করেছিল। তবে তদন্তকারীরা যখন ভ্যালক্যাম্বি এবং অন্য সহায়ক সংস্থাগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত নথি পরীক্ষা করেন, তখন তাঁরা একটি বড় ধরনের গরমিল খুঁজে পান বলে অভিযোগ।

সেবির অভিযোগ, ব্যাবসায়িক গোষ্ঠীর সমন্বিত ভাবে দেখানো রাজস্বের পরিমাণ, সহায়ক সংস্থাগুলোর নথি থেকে যাচাইযোগ্য প্রকৃত রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এর ফলে পাঁচ বছরে মোট ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার গরমিল খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারীরা। যদি অভিযোগ শেষ পর্যন্ত এটি প্রমাণিত হয়, তবে এটি ভারতের কর্পোরেট খাতে রাজস্ব জালিয়াতির সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসাবে গণ্য হবে।

তবে নথি পরীক্ষা করার সময় তদন্তকারীরা ব্যাপক অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ার কারণে রাজেশ এক্সপোর্টসের ঘটনা বর্তমানে এত মনোযোগ আকর্ষণ করেছে বলে জানা গিয়েছে। সেবি জানিয়েছে, তদন্তকারীদের চাওয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি। এ-ও অভিযোগ, গ্রাহকদের সম্পূর্ণ রেকর্ড, বিক্রেতাদের বিবরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংস্থাগুলোর আর্থিক বিবরণী পাননি ফরেনসিক অডিটর। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি তদন্তের কিছু অংশে অসঙ্গত তথ্য প্রদান এবং সহযোগিতার অভাবের দিকেও ইঙ্গিত করেছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে নথি যাচাই করার সময় অডিটরদের অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে কাজ করতে হয়েছিল।

রাজেশ এক্সপোর্টসের রাজস্ব সংক্রান্ত অভিযোগগুলোই সেবির চিন্তার একমাত্র বিষয় নয়। সংস্থাটির তরফে আফ্রিকায় অবস্থিত সোনার খনি সম্পদে ১,০৩৫ কোটি টাকার একটি বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সেবি। অন্তর্বর্তিকালীন আদেশ অনুযায়ী, সংস্থাটি এই বিনিয়োগগুলোর অস্তিত্ব এবং মূল্যায়নের সমর্থনে পর্যাপ্ত নথি সরবরাহ করতে পারেনি।

সংস্থার বিরুদ্ধে অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার্স অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে সম্পর্কিত লেনদেন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সেবি-র মতে, রাজেশ এক্সপোর্টস এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১১,৪৮৭ কোটি টাকার বিক্রয় এবং ১১,৪৮৮ কোটি টাকার ক্রয় নথিভুক্ত করেছে। তবে, তদন্ত চলাকালীন অ্যাফ্লুয়েন্স সেই লেনদেনগুলি করার কথা অস্বীকার করেছে বলে জানা গিয়েছে। অ্যাফ্লুয়েন্স নাকি তদন্তকারীদের বলেছে যে রাজেশ এক্সপোর্টস কখনওই তাদের গ্রাহক ছিল না এবং এই ধরনের কোনও চুক্তিও হয়নি তাদের মধ্যে।

এ ছাড়াও, সেবি-র আদেশে রাজেশ এক্সপোর্টসের তহবিল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অভিযোগ করেছে যে, সংস্থাটির টাকা রাজেশ মেহতার সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টগুলিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা ব্যক্তিগত ডেরিভেটিভ ট্রেডিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়। তদন্তকারীরা ৭.৪ কোটি টাকার লেনদেনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা মেহতার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়েছিল। সেই তহবিলের একটি অংশ পরে সংস্থায় ফেরত দেওয়া হয়। সেবি-র মতে, সংস্থার বোর্ড এই লেনদেনের অনুমোদন দেয়নি।

যদিও রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেড সেবি-র আনা সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে বলেছে, সেবির নির্দেশ অন্তর্বর্তীকালীন এবং সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত রাজস্বে কোনও গোলমাল নেই। একটি বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ‘‘সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত রাজস্ব সঠিক এবং রাজস্ব নিয়ে কোনও অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়া হয়নি। সেবি এবং সংস্থার মধ্যে এক ধরনের যোগাযোগের ঘাটতি এবং বিভ্রান্তি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। সংস্থা সমস্ত প্রয়োজনীয় এবং প্রাসঙ্গিক নথি জমা দিয়ে সেবি-র কাছে সব দিক স্পষ্ট থাকার চেষ্টা করেছে।’’

যদিও রাজেশ এক্সপোর্টস বর্তমানে ঋণদাতাদের চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর কানারা ব্যাঙ্ক সংস্থায় তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। কানারা ব্যাঙ্কে রাজেশ এক্সপোর্টসের বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫০৯ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই তাদের রায় দিয়ে দিয়েছেন। সেবি-র নির্দেশ প্রকাশ্যে আসার পর রাজেশ এক্সপোর্টসের শেয়ার দর ৫ শতাংশ পড়েছে। তবে সংস্থাটির শেয়ার অনেক দিন ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। গত তিন বছরে শেয়ারটির মূল্য ৮০ শতাংশেরও বেশি কমে গিয়েছে।

Sebi Financial Irregularities
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy