বিশেষ আর্থিক অঞ্চল নিয়ে রাজ্যের তীব্র বিরোধিতায় আটকে রাজারহাটে ৫০ একর জমিতে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের পরিকল্পনা। স্থানাভাবে জেরবার উইপ্রো অবশেষে সল্টলেকের বর্তমান ক্যাম্পাসের সঙ্গে আড়াই একর জমি যুক্ত করার জন্য কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের দ্বারস্থ হয়েছে। আর, তা তারা যুক্ত করতে চায় ‘ডিজিটাল’ নজরদারির মাধ্যমে, যার নজির এখনও দেশে নেই।
২০০৪ সালে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে বিশেষ আর্থিক অঞ্চল (সেজ) তৈরির সবুজ সঙ্কেত পায় উইপ্রো। ২০০৫ সালে ১৩.৫ একর জমিতে চালু হয়ে যায় দেশের প্রথম তথ্যপ্রযুক্তি সেজ। প্রসঙ্গত এই জমির কাছেই সংস্থার হাতে রয়েছে ওই আড়াই একর জমি। কিন্তু তা বর্তমান ক্যাম্পাসের লাগোয়া নয়। ফলে ওই জমিতে পরিকাঠামো তৈরি করে তা সেজ তকমার আওতায় আনা আইনে আটকাচ্ছে। কারণ আইন অনুযায়ী সেজ তকমা পেতে একলপ্তে জমি থাকা বাধ্যতামূলক।
সেই নিয়মরক্ষা করতেই উইপ্রো ‘ডিজিটাল’ নজরদারির হাত ধরতে চায়। কেন্দ্রীয় সরকারের সেজ সংক্রান্ত অনুমোদন পর্ষদ বা বোর্ড অব অ্যাপ্রুভালস-এর কাছে আবেদন করে তারা বলেছে, দু’টি জমি পাশাপাশি না-হলেও ডিজিটাল বা যান্ত্রিক নজরদারির দৌলতে একটি ক্যাম্পাস হিসেবেই পরিচালিত হবে। সংস্থার দাবি, বর্তমান ক্যাম্পাসে ১৮ লক্ষ বর্গ ফুটের বেশি জায়গা থাকলেও তা আর ফাঁকা নেই। নতুন কর্মী নেওয়ারও সুযোগ নেই। সেই কারণেই ওই আড়াই একর জমিতে নয়া পরিকাঠামো গড়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায় সংস্থা।
উইপ্রোর এই আর্জি অভূতপূর্ব বলে মনে করছেন সেজ কর্তৃপক্ষ। কারণ দু’টি জমি যান্ত্রিক নজরদারির মাধ্যমে সংযুক্তির কোনও ঘটনা আগে ঘটেনি।
সাড়ে সাত হাজার কোটি মার্কিন ডলার ব্যবসা করা সংস্থা উইপ্রো সল্টলেক সেক্টর ফাইভে বর্তমান ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ করার সিদ্ধান্ত প্রায় বাধ্য হয়েই নিয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার কর্মী নিয়োগ করা হবে বলে গত জুলাই মাসেই রাজ্য সরকারকে জানিয়েছে তারা। সরাসরি স্থানাভাবের কথাও জানিয়েছে সংস্থা। তাতে অবশ্য রাজ্য সরকারের কোনও হেলদোল ঘটেনি।
সেজ বিতর্কে এখনও থমকে ৫০ একর জমি জুড়ে উইপ্রোর প্রস্তাবিত দ্বিতীয় ক্যাম্পাস। যে-সমস্যার জেরে আটকে ইনফোসিস প্রকল্পও। ইনফোসিসের মতো রাজ্য সরকারের সেজ বিরোধিতা নিয়ে অবশ্য সরাসরি মুখ খোলেনি উইপ্রো।
দীর্ঘ টানাপড়েনের পরে উইপ্রোর দ্বিতীয় ক্যাম্পাস গড়ে তোলার জমি বরাদ্দ করতে পেরেছিল বিগত সরকার। ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসের গোড়ায় রাজারহাটে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তৈরির জন্য জমি দেখে গিয়েছিলেন উইপ্রোর কর্ণধার আজিম প্রেমজি। তখনই তিনি জানিয়েছিলেন ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু হবে।

এর পরে ২০১০ সালে বছরের প্রথম দিনেই জমির দাম বাবদ প্রথম কিস্তির চেক জমা দেয় উইপ্রো। চেকের অঙ্ক ১৮ কোটি ৯০ লক্ষ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। কাঠা প্রতি আড়াই লক্ষ টাকা দরে ৫০ একর জমি লিজে দেওয়ার কতা জানায় রাজ্য সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর, জমির দাম ধরা হয় ৭৫ কোটি টাকা। বাকি ৬২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পরিষেবা কর ও অন্যান্য খাতে হিডকোকে দেওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১১ সালের জুন মাস নাগাদ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে নতুন সরকার সেজ গড়া নিয়ে আপত্তি তোলে। শুরু হয় বিকল্প জমির খোঁজ। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজ্যের সঙ্গে বৈঠক করেন সংস্থা কর্তৃপক্ষ। প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাজারহাটের জমি নিয়ে আলোচনা করেন উইপ্রোর দু’ই কর্তা, পার্থসারথি গুহ পাত্র ও বিজয় অগ্রবাল। সেদিন উইপ্রোর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠকের পরে পার্থবাবু জানিয়েছিলেন, ওই জমির বদলে ঘোষিত বিশেষ আর্থিক অঞ্চলে বিকল্প জমি চাইছে সংস্থা। উইপ্রোর এই চাহিদা মেটানো যে-সহজ নয়, তাও জানান তিনি। তবে লগ্নি হাতছাড়া না-করতে বিকল্প ব্যবস্থা করতে রাজ্য যাবতীয় চেষ্টা চালাবে বলে আশ্বাস ছিল।

রাজারহাটে বরাদ্দ জমির বদলে ঘোষিত বিশেষ আর্থিক অঞ্চলে জমি দেখানো হয় উইপ্রোকে। বানতলায় কলকাতা আই টি পার্কে জমি দেখানো হয় কর্তৃপক্ষকে। সেখানে অবশ্য ৫০ একর জমির সংস্থান নেই। সংস্থা সূত্রের খবর রাজ্য সরকারের তরফে ১৫ থেকে ২০ একর জমি দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জমি পছন্দ হয়নি সংস্থার। ইনফোসিসের মতোই উইপ্রোও বিশেষ আর্থিক অঞ্চলের তকমা চায়। কারণ সেজের জন্য বরাদ্দ আর্থিক ও অন্য সুযোগ-সুবিধা ছাড়া প্রতিযোগিতার বাজারে কাজ করতে রাজি নয় তারা।