দেশের তরুণদের চিরাচরিত পেশাগত পথের বাইরে গিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানালেন ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরণ। তিনি উল্লেখ করেছেন, পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে কেবল ডিগ্রির ওপর নির্ভর করে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা আর সম্ভব না-ও হতে পারে। সংবাদসংস্থা এএনআই-এর একটি পডকাস্টে কথা বলার সময় তিনি ভারতের তরুণ সমাজকে এই পরামর্শ দিয়েছেন।
নাগেশ্বরণ মন্তব্য করেছেন, অনেক শিক্ষার্থীই শিক্ষার একটি একমুখী বা রৈখিক ধারা অনুসরণ করে চলেছেন, অর্থাৎ স্নাতক হওয়ার পরই হয় তাঁরা উচ্চশিক্ষার দিকে হাঁটছেন কিংবা ইউপিএসসি-র মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। অথচ এই সিদ্ধান্ত বা ডিগ্রি আদৌ কোনও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে কি না, তা তাঁরা বিবেচনা করছেন না।
আরও পড়ুন:
নিজের এবং বন্ধুর সন্তানদের দেওয়া পরামর্শের প্রসঙ্গ টেনে নাগেশ্বরণ আরও জানিয়েছেন, ভারতে ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, কাঠমিস্ত্রির কাজ বা বৈদ্যুতিক কাজের মতো কারিগরি পেশাগুলিকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ সুইৎজ়ারল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চিনের মতো দেশগুলিতে কারিগরি দক্ষতাকে অনেক বেশি সম্মান এবং গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টার কথায়, ‘‘বিশ্বায়নের যুগে সফ্টওয়্যার, কম্পিউটার সায়েন্স এবং এমবিএ শিক্ষার ক্ষেত্রে এক ধরনের বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেত। কিন্তু সেই সময় এখন আর নেই।’’ নাগেশ্বরণ দাবি করেছেন, ভবিষ্যৎ মূলত কারিগরি দক্ষতা, সফ্ট স্কিল এবং এমন সব পেশার দখলে থাকবে যেখানে মানুষের বিচার-বিবেচনা ও সরাসরি উপস্থিতি অপরিহার্য।
আরও পড়ুন:
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে নাগেশ্বরণ এক জন তরুণ রন্ধনশিল্পীর সঙ্গে হওয়া কথোপকথনের কথা উল্লেখ করেন। ওই তরুণ অন্য পেশায় কর্মরত বন্ধুদের সঙ্গে নিজের তুলনা করে নিজেকে পিছিয়ে পড়া বলে মনে করছিলেন। নাগেশ্বরণ তাঁকে পরামর্শ দেন যেন তিনি বন্ধুদের সমাজমাধ্যম পোস্ট দেখে নিজের উন্নতির বিচার না করেন। কারণ, রান্নার দক্ষতা কৃত্রিম মেধা বা এআই দিয়ে প্রতিস্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন। ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেছেন যে, আগামী দিনগুলিতে কাউন্সেলিং (পরামর্শদান), সেবা-শুশ্রূষা (কেয়ারগিভিং) এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি)-র মতো পেশাগুলি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কর্মসংস্থানের সঙ্গে স্বাস্থ্যের বিষয়টিকেও যুক্ত করেছেন নাগেশ্বরণ। দেশ সমৃদ্ধ হওয়ার আগেই কি অসুস্থ হয়ে পড়ছে? এ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। ‘ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে’র তথ্যের উল্লেখ করে তিনি জানান যে, স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বেশ কিছু সূচকে উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থূলতার হার বেড়েছে। তিনি জানিয়েছেন, কায়িক শ্রমহীন জীবনযাপন, শারীরিক পরিশ্রম এবং দেরিতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস এই প্রবণতার জন্য দায়ী।
নাগেশ্বরণের মতে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কেবল প্রযুক্তি এবং পরিকাঠামোর উপর নির্ভর করে না, বরং এর জন্য প্রয়োজন সুস্থ ও কর্মক্ষম নাগরিক। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান এবং আয় বৃদ্ধির জন্য শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতা অপরিহার্য। ভারতের তরুণ সমাজের প্রতি তাঁর বার্তা— এমন সব দক্ষতা অর্জনে মনোযোগ দেওয়া উচিত, যা প্রযুক্তি সহজে প্রতিস্থাপন করতে পারে না এবং পেশাগত যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের জন্যও সমান ভাবে মনোযোগ দেওয়া উচিত।