উৎপাদন শিল্পে কর্মকাণ্ড বাড়লে অনেকে কাজ পায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যে এই শিল্পে বিনিয়োগের খরা চলছে তা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল সরকারি-বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের নিয়োগ। কারণ, সেখানে প্রথম দফার ক্যাম্পাসিংয়ে এ বারও মুখ বাঁচাল সেই তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পই। আর গত কয়েক বছরের মতোই প্রথম রাউন্ডে এ বারও অনুপস্থিত উৎপাদন শিল্প।
রাজ্যের সরকারি, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সদ্য শেষ হয়েছে প্রথম দফার ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ। এবং প্রত্যাশামতোই সব নিয়োগকর্তা তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের। প্রথম সারির ১২টি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সব মিলিয়ে ১৮টি সংস্থা এসেছে। পলিক্যাব ছাড়া সকলেই তথ্যপ্রযুক্তি ও তার সহায়ক শিল্পে যু্ক্ত। টিসিএস, কগনিজেন্ট-এর মতো বড় সংস্থার পাশাপাশি রয়েছে পারসিস্ট্যান্ট সিস্টেমস, ওয়েবস্কিটার্স জাতীয় মাঝারি সংস্থাও। সংশ্লিষ্ট সূত্রে খবর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বেসু ও কল্যাণী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেও নিয়োগে এগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পই।
সরকারি, বেসরকারি মিলিয়ে রাজ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ৮০টি। বছরে গড়ে ২৩,০০০ পড়ুয়া বেরোচ্ছে। ৫০% সিভিল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল-সহ ‘কোর’ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী। বাকিরা তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক-সহ অন্যান্য শাখার। নিয়োগ সংস্থা নোকরি ডট কমের সমীক্ষা বলছে, গত বছরের তুলনায় এ বার সার্বিক ভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে ১৩% নিয়োগ বেড়েছে। যার ছাপ পড়েছে রাজ্যের ক্যাম্পাস ইন্টারভিউতেও। কিন্তু যোগ্য হয়েও শুধু উৎপাদন শিল্পে লগ্নির অভাবে এ বারও মার খাচ্ছেন এই শিল্পের প্রকল্পে কাজ করতে আগ্রহী রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা।
নতুন পুঁজি ও আনকোরা উৎপাদন বা পরিকাঠামো প্রকল্পের অভাবে বেসরকারি সংস্থার নিয়োগে টান পড়ার ছবি সারা দেশেই আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। কারণ, স্থানীয় শিল্পমহলের মতে, অন্য রাজ্যে কারখানার সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনই এক সঙ্গে সব সংস্থার হাল খারাপ হয় না। ফলে অন্তত কিছু নিয়োগ হয়। আর এ রাজ্যে মাত্র কয়েকটি সংস্থা টিমটিম করছে। ফলে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউতে উৎপাদনে যুক্ত সংস্থার হাজিরাও তলানিতে। বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এমসিকেভিআইই-এর ডিরেক্টর পরাশর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘উৎপাদন শিল্প এ রাজ্যে নেই বললেই চলে। ভিন্ রাজ্যের সংস্থা প্রথমে নিজের রাজ্যের পড়ুয়াদেরই নিয়োগ করে। বাড়তি প্রয়োজনে পা রাখে পশ্চিমবঙ্গে।’’
এক শিল্পকর্তার মতে, নতুন প্রকল্প না-হলে রাজ্যের সদ্য পাশ করা ইঞ্জিনিয়াররা কাজ পাবেন না। টাটাদের ন্যানো কারখানা হোক বা জিন্দলদের ইস্পাত প্রকল্প কিংবা সেজ জটে আটক ইনফোসিস ক্যাম্পাস। লগ্নির সঙ্গেই রাজ্য হারিয়েছে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ। মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ তুষার বসুর দাবি, এখানে প্রকল্পের অভাবে উৎপাদন বা পরিকাঠামোর মতো ‘কোর শিল্পে’ ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা কমছে। দেড় দশকেরও বেশি সময় চলছে খরা। অন্ধকারে রূপোলি রেখা একটিই। বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গার্গী মেমোরিয়ালের প্রধান বোধিসত্ত্ব বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি মূলত এ রাজ্যের প্রকল্পের জন্যই নিয়োগ করছে। অর্থাৎ অন্তত তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রকল্প টানতে সফল কলকাতা। প্রায় একই সুরে ন্যাসকমের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান নিরুপম চৌধুরি জানিয়েছেন, ফের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের নজরে ফিরে আসছে এ শহর।