বর্তমানে ভারতের ১২টি রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। এর আগে এই বিতর্কিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বিহারে— রাজনৈতিক দলের দাবি অনুযায়ী বিহারের নতুন ভোটার তালিকা থেকে ছেলেদের অনুপাতে মেয়েদের নাম বাদ পড়েছে দ্বিগুণ। পশ্চিমবঙ্গে দাবি যে খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন প্রায় নয় শতাংশ মহিলা, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা সাড়ে সাত শতাংশ। রাজনীতির পরিসরে যোগদানের অবকাশ বা তার অভাব যে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নয়, বিশেষ নিবিড় সংশোধনের উদাহরণ সেই নিয়মকেই ফের প্রমাণ করে।
আলোচ্য বইটির প্রসঙ্গে এই কথাগুলি মনে পড়ল। অপরাজিতা দাশগুপ্ত সেনগুপ্তের বইটি বর্তমান ভারতে বাঙালি মেয়েদের রাজনৈতিক যাপনের পূর্বকথন। ঘর, পরিবার আর দেশের টানাপড়েনে বাঙালি (ভদ্র)মহিলার আত্মকথন ও আত্মগঠনের লম্বা আখ্যান এই গবেষণাধর্মী বই, লেখকের পিএইচ ডি গবেষণা সন্দর্ভের বর্ধিত সংস্করণ। ঔপনিবেশিক শাসক, দেশজ (হিন্দু ও ব্রাহ্ম) সমাজসংস্কারক, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, আইনের পরিবর্তন ও ধর্মীয় বিভেদের নানা আলোচনা, মাসিক ও সাময়িক নানা পত্র, মেয়েদের নিজেদের লেখা, জনবাদী পুস্তিকার আলোচনা এবং সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে আটটি অধ্যায়ে লেখক পর্যায়ক্রমে আলোচনা করেছেন ১৮৭০ থেকে ১৯৪৭-এর মধ্যে লিঙ্গরাজনীতির সঙ্গে বিবাহ, আইন, পরিবার, গৃহ, গ্রাম ও ধর্মের সম্পর্ক।
শুরুর দিকের কিছু আলোচনা ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাস বা লিঙ্গরাজনীতি অথবা এই দুই বিষয়েই উৎসাহী পাঠকের পরিচিত। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘উওম্যান কোয়েশ্চেন’ ঊনবিংশ শতকের বাংলায় ভদ্রলোক সমাজের আত্ম-অনুসন্ধানের একটি অতি প্রয়োজনীয় ধাপ, বিদেশি শাসনের মোকাবিলায় ঘর/অন্দরমহল— মেয়েদের আলাদা বৃত্ত— হয়ে ওঠে একটি স্বায়ত্তশাসিত মণ্ডল, ভারতীয়তার মূর্ত প্রতীক। তনিকা সরকারের লেখাতেও বিয়ের বয়স, ধর্মাচরণ ইত্যাদি নানা আলোচনার মাধ্যমে মেয়ের দুনিয়ার সঙ্গে বাঙালি ভদ্রলোকের জাতীয়তাবাদী চেতনার টানাপড়েন দেখানো হয়েছে। সেই সূত্র অবলম্বন করে বর্তমান বইটি পাঠ করা সম্ভব।
আজকের সময়ের প্রেক্ষিতে বইয়ের পঞ্চম ও ষষ্ঠ অধ্যায় বিশেষ গুরুত্বের দাবি জানায়। পঞ্চম অধ্যায়ে বাঙালি মহিলার নতুন চাকরিতে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের কথা— নারীশিক্ষার প্রসারের ফলে উনিশ শতকের শেষের দিক থেকে বঙ্গ মহিলা সমাজ, আর্য নারী সমাজ ও ভারত মহিলা সমিতি ইত্যাদি সংগঠন ভদ্রমহিলাদের কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রগঠনে অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। দীপালি সঙ্ঘ, ছাত্রী সঙ্ঘ বা ১৯৪০-এর মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি-র কার্যকলাপ মেয়েদের আন্দোলনে নামার পথ সুগম করলেও তা বেশির ভাগ সময় রক্ষণশীল সমাজে মেয়েদের অবস্থানের একটি সম্প্রসারণমাত্র ছিল। ঠিক সেই কারণে, যৌনকর্ম থেকে মেয়েদের বাঁচানোর দাবি যেমন জোরালো সাড়া ফেলেছিল সমাজে, ভোটাধিকারের দাবি সমান ভাবে জনপ্রিয় হয়নি। ১৯১৮-তে সরোজিনী নায়ডু এবং ১৯২০-তে সরলাদেবী চৌধুরানী তাঁদের বক্তব্যের মাধ্যমে ভোটাধিকার দাবি করলেও, প্রাদেশিক আইনসভায় আলোচনা হয় যে, শুধু যৌনকর্মী অর্থাৎ পর্দাহীন মেয়েরাই ভোট দিতে চান। শেষ পর্যন্ত ১৯২৬-এ মেয়েদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা হয়, আজকের বিশেষ নিবিড় সংশোধন যাকে আবার প্রশ্নের সামনে এনে ফেলেছে। মনে পড়ে যাচ্ছে গত দশ বছরে বাংলায় বারংবার শোনা প্রচার, “নিজের ভোট নিজে দিন/ মা-বোনেদের বলে দিন।” ভারতে আঠারো বছরের ঊর্ধ্বে সকল মানুষের ভোটাধিকার খাতায়-কলমে থাকলেও, রাজনৈতিক দল বা সমাজ কি মেয়েদের বিচার-বিবেচনাকে যথেষ্ট মান্যতা দেয়?
এই সময়ের নারীবাদী আলোচনার একটি আন্তর্জাতিক অভিমুখও ছিল। স্বর্ণকুমারী দেবী থেকে জ্যোতির্ময়ী দেবী, সকলের লেখাতেই বাড়ির অধিকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার বিষয়ে আলোচনার যোগসূত্র দেখা যায়। ইউরোপের নারী আন্দোলনের বিষয়ে তাঁদের সুস্পষ্ট মতামত এবং কিছু ক্ষেত্রে বিভেদ প্রকাশে তাঁরা পিছপা হননি।
ফর হোম, ফ্যামিলি, অ্যান্ড নেশন: উইমেন অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব জেন্ডার ইন বেঙ্গল, ১৮৭০-১৯৪৭
অপরাজিতা দাশগুপ্ত সেনগুপ্ত
১৩৩৫.০০
ওরিয়েন্ট ব্ল্যাকসোয়ান
১৯২২ সালে পরিচারিকা পত্রিকায় এক অজ্ঞাতনামা লেখক মেয়েদের স্বনির্ভর করে তোলার উপযোগী শিক্ষার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। ১৯২৯-এ ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী মেয়েদের রোজগারের দিকে মন দিতে বলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলার দারিদ্রের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজের মূলধারা থেকে মেয়েদের আলাদা করে দেখা ক্রমে অসম্ভব হয়ে উঠতে থাকে। অথচ, এক শতাব্দী পেরিয়ে এসে মেয়েদের ঋতুস্রাবকালীন ছুটির প্রসঙ্গটি যেন আবার মেয়েদের কাজের পরিসরকে সঙ্কুচিত করে তুলতে চাইছে।
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘উওম্যান কোয়েশ্চেন’-এর জাতীয়তাবাদী সমাধান বিশেষ শারীরবৃত্তীয় পার্থক্যকে না-দেখা করেছিল। বর্তমান লেখকের বইয়ে সেই সমাধানকে প্রশ্ন করা না হলেও, বার বার দেখানো হয়েছে, ঘরে বাইরে মেয়েদের সমান চলন আসলে সম্ভব হয়েছিল ঘরকে ও পরিবারকে প্রাধান্য দিয়েই। উদাহরণস্বরূপ, লেখক ষষ্ঠ অধ্যায়ে তুলে ধরেন জ্যোতির্ময়ী দেবীর কন্যা, অশোকার কথা। আইসিএস অফিসার শৈবাল গুপ্তের সঙ্গে বিবাহের পর উচ্চশিক্ষিতা এই মহিলা একই সঙ্গে সামলান স্বামীর বিশাল পরিবারের দায়িত্ব, এবং নানা গ্রাম ও শহরে স্বামীর পোস্টিং বাবদ সরকারি মহলে ওঠাবসাও রপ্ত করে ফেলেন, শেখেন টেনিস খেলা, গাড়ি চালানো। ঘর ও বাহির (বিশেষত সেই বাহির যদি স্বামীর কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সংযুক্ত হয়) এক সঙ্গে সামলানোতে ঘরকে বাদ দেওয়ার কোনও উপায় থাকে না মেয়েদের পক্ষে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রভাবশালী অনেক পুরুষকণ্ঠে এক হতাশার ছাপ দেখতে পান লেখক। আনন্দবাজার পত্রিকা-র সম্পাদকীয়তে লেখা হয় শহরে ভিড় করে আসা অবাঙালিদের কথা, চাকরির সন্ধানে যাঁদের কাছে মার খাচ্ছেন ভদ্র বাঙালি যুবক। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের আর্থিক প্রতিপত্তি বাঙালি ভদ্রলোকের মনে নিজের অবস্থান সম্বন্ধে নতুন শঙ্কার সৃষ্টি করে— অন্দরমহলের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে এই আশঙ্কাকে নির্মূল করা যাচ্ছিল না। বইয়ের শেষ অধ্যায়ে এই আশঙ্কার সঙ্গে বোঝাপড়ার একটা পথ হিসাবে উঠে আসে ‘ফেলে আসা গ্রাম’, ‘যে দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল’— বার বার গ্রামের স্মৃতির সঙ্গে মাতৃরূপী দেশের বন্দনা, জাতীয়তাবাদী চেতনার গঠনের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করে।
‘ভদ্রলোক’ এবং ‘ভদ্রমহিলা’, এই দুই পরিচয়ের গঠনে হিন্দুধর্মের এবং সাম্প্রদায়িকতার অবদান অপরাজিতা একাধিক বার দেখিয়েছেন। সরকারি নথি, সংবাদপত্র ও মেয়েদের আত্মলিখন-নির্ভর এই বইয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাকাজের ছাপ আর একটু দেখতে পেলে বইটি সম্পূর্ণ হত। শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তনিকা সরকার সম্পাদিত কাস্ট ইন বেঙ্গল বাংলার দলিত বহুজন সমাজের ইতিহাস রচনার এক উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। বাউরি সমাজের ইতিহাস লিখেছেন মিলন রায়, মতুয়া সমাজের সংস্কারের বিষয়ে একাধিক প্রামাণ্য গ্রন্থ আছে। গবেষণাপত্র থেকে বইয়ে পরিণত হওয়ার লম্বা সময়ের যে ছাপ এই বইয়ে আছে, সেখানে দলিত বহুজন সমাজ থেকে উঠে আসা, ভদ্রমহিলার উল্টো দিকে দাঁড়ানো মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের একটা রেশ থাকলে আরও ভাল হত।
আজকের পশ্চিমবঙ্গে একই সঙ্গে বাঙালিয়ানার উদ্যাপন ও বাঙালি পরিচয়ের হিন্দুকরণের রাজনীতির সঙ্গে বাস করি আমরা। ঘর, পরিবার আর দেশের সঙ্গে বাঙালি ভদ্রমহিলা পরিচয়ের উদ্ভব ও বিবর্তনের এই ইতিহাস আমাদের বর্তমান সময়ের সামনে একটি আয়না ধরে রাখে। ইতিহাসবিস্মৃত বাঙালি এই আয়নায় বার বার তাকাতে বাধ্য।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)