নরেন্দ্র মোদীর সরকার তার দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম সর্বদলীয় বৈঠকটি ডেকেছিল লোকসভা আর বিধানসভার ভোট একযোগে করার লক্ষ্যে। সরকার বা বিজেপি যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সেটা স্পষ্ট। আবার কংগ্রেস, শিবসেনা, ডিএমকে বা তৃণমূলের মতো যে দলগুলি বৈঠকেই না গিয়ে তাদের বিরোধিতাকে প্রকাশ করেছে, এই লোকসভাতেও তাদের সম্মিলিত আসন প্রায় এক-চতুর্থাংশ। স্পষ্টতই, ‘এক দেশ এক ভোট’ নিয়ে রাজনৈতিক চাপান-উতোর প্রবল। লোকসভা আর বিধানসভার ভোট একসঙ্গে হলে পাঁচ বছরে জনগণের গণতন্ত্রের উৎসব পালনের সুযোগ অন্তত একটা কমবে। কিন্তু এর পক্ষে-বিপক্ষে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিস্তর যুক্তি-প্রতিযুক্তি রয়েছে। অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক।

এবং রাজনৈতিক। অনেকেরই ধারণা, একসঙ্গে লোকসভা আর বিধানসভার নির্বাচন হলে ভোট দুটো একই দলের বাক্সে যাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা। অবশ্য একসঙ্গে ভোট হলেও অন্য রকম ফলাফলের দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি। খুব বেশি পিছনে যাওয়ার দরকার নেই। এ বারেই লোকসভা ভোটের সঙ্গে তামিলনাড়ুর ২২টি বিধানসভা আসনেও উপনির্বাচন হয়েছে। লোকসভায় তামিলনাড়ুতে ইউপিএ-র জয়জয়কার। ৩৮টির মধ্যে ৩৭ আসনেই জয়ী তারা। বিধানসভায় কিন্তু শাসক এআইএডিএমকে বা তাদের শরিকরা ২২টির মধ্যে ১৪টিতে লোকসভার চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। জিতেছে ৯টি আসনে। তাই জনগণ লোকসভা আর বিধানসভার ভোটে তফাত করে বলেই মনে হয়। এমনকি একসঙ্গে হলেও।

তবু, একসঙ্গে ভোট হলে এই পার্থক্য করার ক্ষমতায় খানিকটা চালসে ধরতে পারে বলে অনেকেরই মত। যেমন আইডিএফসি ইনস্টিটিউটের ২০১৫-র এক সমীক্ষার রিপোর্ট খুব প্রচার পেয়েছে দেশ জুড়ে। ১৯৯৯ থেকে ২০১৪-র মধ্যে দেশে যে ২,৬০০ কেন্দ্রে একযোগে লোকসভা আর বিধানসভার ভোট হয়েছে তার ৭৭ শতাংশ আসনে দুটোতেই জিতেছে একই দল। ছ’মাসের ব্যবধানে ভোট হলে দু’বারই একই দল জিতেছে মাত্র ৬১ শতাংশ ক্ষেত্রে। সময়ের ব্যবধান বাড়লে দুটোতেই একই দলের জেতার অনুপাত কমেছে আরও।

আমি নিজে ২০১৯-এর আগেকার দু’দশকে বিভিন্ন রাজ্যের লোকসভা আর তার নিকটবর্তী বিধানসভায় বিভিন্ন প্রধান জাতীয় এবং আঞ্চলিক দলের ভোট শতাংশের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করেছি। দু’টি ভোট হয়েছে একই ক্যালেন্ডার-বছরে, এমন ৭৩ জোড়া প্রধান ক্ষেত্রে একই দলের দুই ভোট শতাংশের সম্পর্কের সহগ (কোরিলেশন কোয়েফিশিয়েন্ট) পেয়েছি ৯১ শতাংশ। পর পর দুই ক্যালেন্ডার-বছরে, এমনকি দু’বছরের ব্যবধানে এমন ভোট শতাংশের কোরিলেশন কোয়েফিশিয়েন্ট হল ৭৯ শতাংশ। কোরিলেশন কোয়েফিশিয়েন্ট হল দুই চলরাশির (সরলরৈখিক) সম্পর্কের সূচক। সম্পর্ক যত গভীর হবে, এই সহগের মান বাড়তে থাকবে। তাই এটা পরিষ্কার যে, একযোগে ভোট হলে মোটের উপর বেশি সংখ্যক ভোটার দুই ইভিএম-এ একই ছাপ দেওয়া বোতাম টিপবেন।

কিন্তু উপরের হিসেবগুলি থেকে কেবল ওটুকুই বোঝা যায়। একযোগে লোকসভা আর বিধানসভার ভোট হলে, একই ভোটারের দুই ভোট এক দলের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, ব্যস। কোন নির্বাচন কাকে প্রভাবিত করছে, লোকসভা ভোটের প্রভাবে বিধানসভার ভোট ভেসে যাবে, না কি বিধানসভার নির্বাচন প্লাবিত করবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের লোকসভার ভোটকে, সেটা বোঝা অসম্ভব। উভয়েই হয়তো প্রভাবিত করবে পরস্পরকে, কিন্তু সে ক্ষেত্রে কোনটার প্রভাব বেশি, সেটা বোঝাও অসম্ভব।

যথেষ্ট তথ্য না থাকলেও অনেকে মনে করেন একসঙ্গে ভোট হলে লোকসভা ভোটের ‘হাওয়া’ ভাসিয়ে দেবে বিধানসভার ভোটকে। বিশেষত কেন্দ্রের লড়াইতে যদি শক্তিশালী কোনও দল বা সার্বিক ভাবে প্রভাবশালী কোনও নেতা থাকেন। এতে ক্ষুণ্ণ হবে আঞ্চলিক দলের প্রতিপত্তি।

সত্যিই কি তেমন আশঙ্কা রয়েছে? ২০১৯-এ অন্ধ্রে জগন-ঝড়ে প্লাবিত হয়েছে বিধানসভা আর লোকসভা দুইই। তাই ঝড়টা দিল্লি থেকে আসবে, না সংশ্লিষ্ট রাজ্য থেকে, কে বলবে? সাম্প্রতিক অতীতে যে ক’টা রাজ্যে ঘটনাক্রমে লোকসভা-বিধানসভার ভোট একসঙ্গে হয়েছে, তার মধ্যে একটা আমাদের প্রতিবেশী ওড়িশা। নবীন পট্টনায়ক তাঁর গড় অক্ষুণ্ণ রেখেছেন সেখানে। ২০১৪-তেও প্রবল মোদী-হাওয়া যখন ভাসিয়ে দিচ্ছে ভারতবর্ষকে, সে সময়ে লোকসভায় ২১টির মধ্যে ২০টি আসন জিতেছেন নবীনবাবু। বিধানসভায় ১৪৭-এর মধ্যে ১১৭টিতে। ২০১৯-এর নির্বাচনেও বিধানসভায় প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছেন তিনি। ১১২টি আসন পেয়ে। ও দিকে লোকসভায় তাঁর দলের আসন কমে হয়েছে ১২টি। লক্ষণীয়, লোকসভার ভোটে ওড়িশায় বিজু জনতা দল আর বিজেপির ভোট শতাংশের পার্থক্য মাত্র ৪.৪। আসনের ব্যবধানও মাত্র ৪। বিধানসভায় কিন্তু তাদের ভোট শতাংশের পার্থক্য ১২-র বেশি। বিজেডি-র ভোট লোকসভার তুলনায় বিধানসভায় বেড়েছে ২%, আর বিজেপির ক্ষেত্রে কমেছে ৬%। সাধারণ ভোটাররা লোকসভা আর বিধানসভা ভোটের পার্থক্য করেন নিশ্চয়ই। নিঃসন্দেহে ওড়িশার ভোটাররা রাজ্যে প্রবল ভাবে বিজেডিকে চেয়েছেন আর এক বার, কিন্তু দিল্লিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই চাওয়াটা অনেকটাই আলগা।

আমার মনে হয়, এ ক্ষেত্রে লোকসভা ভোট বা তার হাওয়া তেমন ভাবে ওড়িশা বিধানসভার ভোটকে প্রভাবিত করতে না পারলেও, উল্টে বিধানসভার নির্বাচন সে রাজ্যের লোকসভায় কতটা প্রভাব ফেলেছে তার একটা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এমন নয় তো, এ বারের লোকসভায় ওড়িশায় বিজু জনতা দলের ভাগে ১২টি আসন জুটেছে ভোটটা বিধানসভার সঙ্গে একসঙ্গে হয়েছে বলেই? মাস ছয়েকের ব্যবধানে হলে উত্তর ও পূর্ব ভারতের উত্তাল বিজেপি হাওয়ায় তা হয়তো কমে যেত অনেকটাই। যেমন, এই তো পাঁচ-ছ’মাস আগেই মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ় আর রাজস্থানে বিধানসভায় জিতল কংগ্রেস। স্পষ্টতই অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি-র ছটফটানিতে সে সময়ে ছত্রখান হয়ে গিয়েছিল বিজেপি। ক’মাস পরেই লোকসভা ভোটে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। এই রাজ্যগুলিতে প্রায় সার্বিক ভাবেই লোকসভার আসনে জিতেছে তারা। আমি কিন্তু যথেষ্ট দ্বিধায়— কী হত এই রাজ্যগুলির চালচিত্র, যদি লোকসভা আর বিধানসভার নির্বাচন হত একসঙ্গে? এ রকমই কি হত— বিধানসভায় কংগ্রেস, আর লোকসভায় প্রবল ভাবে বিজেপি? অথবা, লোকসভার হাওয়ায় ভর করে বিধানসভাতেও জিতত বিজেপি? বা, বিধানসভায় অ্যান্টি-ইনকামবেন্সির প্রভাবে লোকসভাতেও বেশ ভাল ফল করত কংগ্রেস? না কি, পারস্পরিক প্রভাবে দুই ভোটেই ফলটা হত মাঝামাঝি কোনও স্তরের? সে ক্ষেত্রেও ফলাফল ঝুঁকে পড়ত কোন দিকে, অর্থাৎ কোন ভোটের ওজন থাকত বেশি— লোকসভার না কি বিধানসভার? এই প্রশ্নগুলির জবাব দেওয়া বেশ কঠিন। ঠিকঠাক পরিকল্পনা করে এ রকম কোনও সমীক্ষা হয়েছে বলেও জানা নেই। তাই গোটা দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি-নির্ভর রাজনৈতিক চালচিত্রের সম্ভাবনার অনুমান এক কথায় অসম্ভব।

আপাত ভাবে, এমনকি লোকসভা ভোটের ক্ষেত্রেও, নির্বাচকরা অনেক সময়ই স্থানীয় বিষয়কে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ফেলেন। সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। বিপুল সংখ্যক জনগণেশের জীবনযাপনের প্রতিটা স্তরে রাজ্যের হৃৎস্পন্দন, অনুশাসন-দুর্নীতি, শৃঙ্খলা-দুঃশাসন হয়তো অনেক বেশি মাত্রায় এবং প্রত্যক্ষ ভাবে প্রভাব ফেলে। দিল্লি ঠিক কতটা দূরে, ঠাহর করতে পারেন না অনেকেই। তাই এমন হতেই পারে যে, একযোগে ভোটের ক্ষেত্রেও রাজ্যই অনেক বেশি প্রভাবিত করবে কেন্দ্রকে। আর অঞ্চল-ভিত্তিক নানা রাজনৈতিক শক্তির বৈচিত্রে ভরা ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আঞ্চলিক শক্তিগুলির প্রভাব বেড়েও যেতে পারে এর ফলে। অবশ্য তেমনটা নাও হতে পারে। তবু, বিস্তারিত সমীক্ষা, বিশ্বাসযোগ্য বিশ্লেষণ, পরিচ্ছন্ন পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে বলেই মনে হয়।

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতার রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত