সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে খুব বড় সাফল্য পেল ভারত। দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে হওয়া সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার আড়াই মাসের মাথায় জইশকে সবচেয়ে বড় প্রত্যাঘাতটা করল ভারত। শুধু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাফল্য নয়, খুব বড় কূটনৈতিক জয়ও সূচিত হল ভারতের  জন্য।

জইশ-ই –মহম্মদের প্রধান মৌলানা মাসুদ আজহারকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী’ তকমা দিয়ে দিল রাষ্ট্রপুঞ্জ। মাসুদকে বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ করে দেওয়ার এই প্রয়াস বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে আসছিল নয়াদিল্লি। ক্রমশ সমর্থন বাড়ছিল ভারতের প্রস্তাবের পক্ষে। আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স— আগেই মাসুদের বিরুদ্ধে ভারতের বক্তব্যকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের আর এক স্থায়ী সদস্য চিন বেঁকে বসছিল বার বার। শুধুমাত্র চিনের বাধাতেই আটকে যাচ্ছিল মাসুদের মতো ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রস্তাব। সে বাধাও এ বার সরে গেল ভারতের সামনে থেকে। চিন আর ওজর-আপত্তি তুলল না। মাসুদ আজহার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ঘোষিত হল।

দু’দশকের আখ্যান যেন একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করল। ১৯৯৯ সালে ভারতীয় বিমান ছিনতাই করে তালিবান-শাসিত তদানীন্তন আফগানিস্তানের কন্দহর বিমানবন্দরে আটকে রেখেছিল এই মাসুদের শাগরেদরা। মাসুদের মুক্তির বিনিময়ে পণবন্দি বিমান ফিরে পায় ভারত। সেই থেকে নিরন্তর প্রয়াস নয়াদিল্লির তরফে ছিল মাসুদকে কোণঠাসা করার জন্য। কুড়ি বছর পেরিয়ে এসে মৌলানা মাসুদ আজহারকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা দেওয়া গেল।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও নানা ভাবে পদক্ষেপ ভারত করেছে। কাশ্মীর উপত্যকায় নিরন্তর অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসের মূলোচ্ছেদ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কখনও নিয়ন্ত্ররেখা পেরিয়ে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হয়েছে। কখনও সরাসরি পাক ভূখণ্ডে বোমাবর্ষণ করেছে ভারতীয় বায়ুসেনা। কিন্তু মাসুদ আজহারকে বিশ্ব জুড়ে নিষিদ্ধ করেল দিতে পারার সাফল্য সম্ভবত ধারে ও ভারে আগের সব প্রত্যাঘাতের চেয়ে অনেক বেশি।

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

আরও পড়ুন: ভারতের বিপুল কূটনৈতিক জয়, অবশেষে রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী তালিকায় মাসুদ

আবার বলছি, শুধু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাফল্য নয়, এটা ভারতের খুব বড় কূটনৈতিক সাফল্যও। যে চিন বার বার ভেস্তে দিচ্ছিল মাসুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রয়াস, সেই চিনের অবস্থানটাকে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেওয়া সহজে সম্ভব হয়নি। অবিরাম চলতে থেকেছে একটা কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, যা নিয়ে প্রকাশ্যে বড়াই খুব বেশি হয়নি। গোটা পর্বটা পরিণত কূটনীতির পরিচয় দিচ্ছে।

মাসুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার প্রশ্নে যে সব দেশ বার বার ভারতের পাশে দাঁড়াচ্ছিল, সেই আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি আন্তর্জাতিক সমীকরণে যে মেরুতে অবস্থান করে, চিনের অবস্থান তার ঠিক বিপ্রতীপে। এই দুই মেরুকে একবিন্দুতে আনতে পারা মোটেই সহজ কথা ছিল না। জটিলতা গভীর ছিল দক্ষিণ এশিয়ার নিজস্ব সমীকরণেও। মাসুদ আজহারের আশ্রয়দাতা তথা প্রতিপালক পাকিস্তান ঘোষিত ভাবেই চিনের ঘনিষ্ঠতম মিত্রদের অন্যতম। বহাল তবিয়তে পাকিস্তানে থাকা মাসুদ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ঘোষিত হলে সবচেয়ে ধাক্কাটা যে সেই ঘনিষ্ঠ মিত্রের গায়েই লাগবে, তা জেনেও মাসুদকে বাঁচাতে আর উদ্যোগী হল না চিন— এই ঘটনার কূটনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর।

চিনের সঙ্গে যাবতীয় সংঘাত যে ভারত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে, এমন নয়। সীমান্ত নিয়ে সংঘাত তো রয়েছেই। ডোকলামে অভূতপূর্ব সংকট ঘনিয়ে ওঠার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। চিনা প্রেসিডেন্ট শি চিনফিংয়ের স্বপ্নের প্রকল্প ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এর তীব্র বিরোধিতা করার অবস্থানে ভারত এখনও অনড়। এত কিছুর মাঝেও মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে চরম প্রস্তাবটা পাস হয়ে যাওয়ার পথে চিন বাধা হয়ে দাঁড়াল না। এর নেপথ্যে কতখানি কূটনৈতিক প্রয়াস ক্রিয়াশীল ছিল, তা বুঝে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অতএব অভিনন্দন প্রাপ্য নয়াদিল্লির।