এতক্ষণে নিশ্চয় সবটাই আপনি শুনেছেন ও দেখেছেন। পার্শ্বশিক্ষকেরা মার খেয়েছেন। পুলিশ তাঁদের বেধড়ক মেরেছে। অবশ্য এ আর নতুন কী! এখন তো ‘দিদিকে বলো’-র জমানা। এক হ্যালোতেই অভাব-অভিযোগ সব মিটে যাচ্ছে।  সদ্য পেরিয়েছে  ৭৩তম  স্বাধীনতা দিবস। লালকেল্লায় পুলিশ বাহিনীর কুচকাওয়াজ ও প্রদর্শিত ডেয়ারডেভিল স্টান্টে মুগ্ধ তামাম বঙ্গ। আর সেই রেশ কাটতে না কাটতেই পুলিশ হাতে তুলে নিল লাঠি।

আপনার কাছে সবিনয় প্রশ্ন, শিক্ষকদের এ ভাবে অসম্মান করার বিচার কী? এই অতর্কিত আক্রমণের কারণ কী? জন্তু-জানোয়ারের মতো শিক্ষকদের এ ভাবে খেদিয়ে দেওয়ার মধ্যে ঠিক কোন কৃতিত্ব লুকিয়ে আছে? 

মাননীয়া, যে মহিলা শিক্ষকেরা মার খেলেন তাঁদের তো আপনার চেনার কথা। ওঁরা রান্না করেন। ঘর সামলান। তার পরে দৌড়তে দৌড়তে স্কুলে পৌঁছন। প্রতি শনিবার খুঁজে আনেন স্কুলছুট পড়ুয়াদের। প্রতিদিনই ঘর আর বিদ্যালয়ের লড়াই। তার পরে আবার আন্দোলনে যোগদান! পরিবারেই নানা কথা উঠেছে—‘তুমি ওই আন্দোলনে না গেলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে?’ কিংবা ‘ঘর-সংসার ফেলে ওই সবই করে বেড়াও!’ 

তার পরেও মেয়েগুলো পেশাগত আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। পার্শ্ব, ঊর্ধ্ব, অধ, সহকারী যে পরিচিতিতেই ওঁদের বাঁধা হোক না কেন, আসলে ওঁরা শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দেন। এমনই এক জন মহিলা শিক্ষক লজ্জায়, ভয়ে, অপমানে, যন্ত্রণায় পুলিশের সামনে হাতজোড় করে বলছেন, ‘মারবেন না!’ কিন্তু সে আর্তি বোধহয় পুলিশ শুনতে পায়নি। লাঠির আঘাতে মাটিতে গড়াগড়ি খেলেন ওঁরা। বাচ্চা কোলে নিয়ে বহু মহিলা দৌড়ে লাঠি থেকে বাঁচার এবং বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। এমন দৃশ্য কি প্রত্যাশিত ছিল? সত্যি করে বলুন তো, আপনি নিজেও কি এটা সহ্য করতে পারছেন? 

আপনি তো জানেন, পুলিশের লাঠি শরীরে নয়, দগদগে ক্ষত তৈরি করে মনে। কী মর্মান্তিক বেদনা তার! আজও গুগলে সার্চ করলেই মিলে যায় আপনার সেই সাদা-কালো ছবিগুলো। ১৯৯৩ সাল। রাইটার্সে  সারাদিন ধর্না দিচ্ছেন। বিকেলের দিকে চরম ধাক্কাধাক্কির মুহূর্ত।  আপনার উপর নেমে এল পুলিশের আঘাত। আপনার  যন্ত্রণা হচ্ছে। আপনি কাঁদছেন। তার পরেও সব নির্মমতাকে ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছিল আপনার অন্য কণ্ঠস্বর। মূক ও বধির দীপালি বসাকের ধর্ষকের শাস্তির দাবিতে আপনার একক স্লোগান। 

পুলিশ তখনও ছিল। এখনও আছে। এবং একই ভূমিকায়। রাষ্ট্রের  নির্দেশের তল্পিবাহক। ন্যায় বা শপথের নয়। মাস ছয়েক পরে ফের আপনাকে আটকানো হয়েছিল পুলিশ দিয়েই। সে দিন ছিল ২১শে জুলাই। টি বোর্ড বিল্ডিংয়ের সামনে, ব্রেবোন রোডে। রাইটার্স বিল্ডিং থেকে ঠিক একশো মিটার দূরে। সে বারেও আপনি আহত হয়েছিলেন। মাননীয়া, আপনি কি ভুলতে পেরেছেন সেই সব  আঘাত?   

আপনি তখন স্ট্রিট ফাইটিং পলিটিশিয়ান নামে ঘরে বাইরে চর্চিত হতে শুরু করেছিলেন। ময়দানে নেমে লড়াই ছিল একমাত্র অস্ত্র। সত্যিই তো, আন্দোলন তো আর ঘরে বসে হয় না। রাস্তাকেই বেছে নেওয়া হয়। যেমনটা আপনিও বেছে নিয়েছিলেন একাধিক বার। ২০০৬ সালে টানা ২৬ দিন অনশন। ২০০৮ সালে ১৬ দিনের ধর্না। 

সাম্প্রতিক কালেই  কেন্দ্র ও সিবিআইয়ের ‘অতিসক্রিয়তার’ বিরুদ্ধে ধর্নায় বসলেন আপনি। ধর্না মঞ্চ থেকেই আপনি বললেন, ‘এ রাজ্যের পুলিশ আমার গর্ব। সবরকম পরিস্থিতিতে পুলিশ কাজ করে। রাজ্য পুলিশ আমাদের সম্পদ।’ আপনি আরও বললেন, ‘বিনা কারণে কাউকে হেনস্থা মানব না। প্রত্যেক মানুষের সম্মান আছে।’ কিন্তু যা বললেন, তা কি শুধু পুলিশের উদ্দেশেই? বাকিদের জন্য নয়?

ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন, তবে কি জানেন, শিক্ষকদেরও সম্মান আছে। মহিলাদেরও একটা মর্যাদা আছে। বিনা কারণে পুলিশের এমন হেনস্থা শিক্ষককুল কেন মেনে নেবে, বলুন তো? সব রকম পরিস্থিতিতে আপনার পুলিশ কাজ করে থাকলে সত্যিই তা প্রশংসনীয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও ভুল বা অন্যায়ের জন্য পুলিশ ক্ষমা চাইছে, এমনটা কখনও দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। কোথাও ধর্ষণের হুমকির রিপোর্ট লেখাতে গেলে অফিসার হেসে ফেলেন। যেন বেশ একটা মজার কথা বলা হয়েছে। কোথাও আবার ১৭ দিন ধরে  অপেক্ষা করতে হয় ধর্ষণের এফআইআর লেখাতে। সেই সব পুলিশ শাস্তি পায়? তাদের বিরুদ্ধে আদৌ কি কোনও বিভাগীয় তদন্ত হয়?    

পেশাগত সুবিচার চাওয়ার অধিকার সকলের আছে। আন্দোলনের দাবি সব নাগরিকের জন্মগত অধিকার। শিক্ষকদের অনেক  সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তাই কিছু বলা যাবে না, এমন কোনও বিধান তো নেই। দাবি ন্যায্য না অন্যায্য তা নিয়ে চলুক গঠনমূলক আলোচনা। কিন্তু আপনার ‘গর্বের’ পুলিশ, ‘আমাদের সম্পদ’ পুলিশ শিক্ষকদের বেদম পিটিয়ে মুখ বন্ধ করে দেবে? ধর্না মঞ্চ থেকে তাড়িয়ে দিতে পারলেই কি স্তিমিত হয়ে যায় দাবির ভাষা? 

আন্দোলন মোকাবিলা করার জন্য হাজারও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি রয়েছে। পার্শ্বশিক্ষকদের দাবি, তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়েছে।  যদি তাই হয় তবে তাঁদের সঙ্গে বসে সময়সাপেক্ষে একটি সিদ্ধান্ত নিতেই পারত বিভাগীয় দফতর। তা কেন হল না এত দিনে? এই মুহূর্তে  পার্শ্বশিক্ষকদের অপমান এ রাজ্যের সব শিক্ষিত মানুষের অপমান। শিক্ষকদের সম্মান আজ পুলিশের লাঠির ডগায় এসে পড়েছে। এ এক জাতীয় লজ্জা। আপনি জানেন, শিক্ষক আর ‘মব’ এক নয়। আপনাকে বিনম্র অনুরোধ, পারলে আপনার দফতরের পুলিশকে যদি এটা একটু বুঝিয়ে বলেন!   

যে সমাজে পুলিশ শিক্ষকদের সম্মান দেয় না, নির্বিচারে লাঠি চালায় শিক্ষিকাদের উপরে সেই সমাজের পড়ুয়ারা কী শিখবে, বলুন তো? মাননীয়া পুলিশমন্ত্রী, আপনি নিজেও তো এক জন মহিলা। আপনিই বলুন, কালো ব্যাজ আজ নয় তো কবে পরব?

পুনশ্চ: এ বঙ্গ বরাবর ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনের মহৎ ক্ষেত্র। ফলপ্রসূ পরিসমাপ্তির সফল তীর্থস্থানও বটে। অবহেলা ও যাতনার কোনও স্ফুলিঙ্গ নেই। এ এক অন্তঃসলিলা চোরাস্রোত। কে ভেসে যায় আর কে মসনদে আসে তা সবসময় বোঝা যায় না। একমাত্র  ন্যায়ের কক্ষপথে মানানসই বিচরণ স্থায়ী হয়। আসলে ক্ষমতার রাশ বড্ড পিচ্ছিল। ঊর্ধ্ব আর অধঃ নিয়ত স্থান বদলায়। তৃতীয় স্বর নতুন সমীকরণ খোঁজে।   

 

লেখক রঘুনাথগঞ্জ হাইস্কুলের শিক্ষিকা