E-Paper

ধারণা নেই, প্রচারও না

১৮৯৪ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি গঠিত হয়, তার দু’বছর পরে গ্রিসের এথেন্সে আধুনিক অলিম্পিক্স-যাত্রার শুরু। প্রাথমিক ভাবে গ্রীষ্মপ্রধান দেশের খেলাধুলাই ছিল প্রধান সম্ভার, শীতপ্রধান দেশগুলোর কথা বিবেচনা করে পরে পাঁচটি শীতকালীন খেলা যুক্ত করা হয়: ববস্লেজ, কার্লিং, আইস হকি, নর্ডিক স্কিইং ও স্কেটিং।

অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:১৮

বিশ্ব জুড়ে সংঘর্ষ ও বিদ্বেষের আবহেও হয়ে গেল বিরাট ক্রীড়া-অনুষ্ঠান অলিম্পিক্স। ইউরোপ এশিয়া আফ্রিকার একাধিক জায়গায় যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরিস্থিতি, তবু ছিন্ন পৃথিবীকে জুড়ে রাখার প্রয়াস খেলার আনন্দেই জাগে। তারই যজ্ঞ যেন হয়ে গেল এ বারের শীতকালীন অলিম্পিক্সের মধ্য দিয়ে। এ বছর ইটালি ছিল আয়োজক দেশ, ৬ ফেব্রুয়ারি বর্ণাঢ্য উদ্বোধন দিয়ে শুরু হয়েছিল, প্রতিযোগিতামূলক খেলা চলল ২২ তারিখ অবধি। এখানেই এর পর প্রথামাফিক হবে শীতকালীন প্যারালিম্পিক্সও।

১৮৯৪ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি গঠিত হয়, তার দু’বছর পরে গ্রিসের এথেন্সে আধুনিক অলিম্পিক্স-যাত্রার শুরু। প্রাথমিক ভাবে গ্রীষ্মপ্রধান দেশের খেলাধুলাই ছিল প্রধান সম্ভার, শীতপ্রধান দেশগুলোর কথা বিবেচনা করে পরে পাঁচটি শীতকালীন খেলা যুক্ত করা হয়: ববস্লেজ, কার্লিং, আইস হকি, নর্ডিক স্কিইং ও স্কেটিং। এই খেলাগুলো শুরু হয় ১৯২৪ সাল থেকে, প্রতি চার বছর অন্তর। ১৯৩৬-এর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য পর পর দুটো আসর বন্ধ থাকে, ফের চালু হয় ১৯৪৮ থেকে। ১৯৮৬-তে অলিম্পিক কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন অলিম্পিক্স পৃথক সময়ে হবে; শেষ যৌথ অলিম্পিক্স হয় ১৯৯২-এ। শীতকালীন অলিম্পিক্স শুরু হয় ১৯৯৪ সালে, গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্স ১৯৯৬-এ যথাসময়েই হয়েছিল। এর পর থেকে দুটো খেলার আসর নিজ নিজ সময়ের চার বছর অলিম্পিক্স-চক্র অনুসারে হতে থাকে। ১৯২৪-কে শুরুর বছর ধরলে এ বছরের শীতকালীন অলিম্পিক ২৫তম, একশো বছরও পেরিয়ে গেছে তার।

শীতকালীন অলিম্পিক্সের প্রধান খেলাগুলো প্রায় সবই তুষার ও বরফের উপরে হয়। শুধু বরফ থাকলেই হবে না, খেলার মতো প্রশস্ত জায়গা থাকা চাই। এ বছর ১৬টি ইভেন্ট: আল্পাইন স্কিইং, বিয়াথলন, ববস্লেজ, ক্রস-কান্ট্রি স্কিইং, কার্লিং, ফিগার স্কেটিং, ফ্রি-স্টাইল স্কেটিং, আইস হকি, লুজ়, নর্ডিক কম্বাইন্ড, শর্ট ট্র্যাক স্পিড স্কেটিং, স্পিড স্কেটিং, স্কেলেটন, স্কি-মাউন্টেনিয়ারিং, স্কি-জাম্পিং, স্নোবোর্ডিং। আমাদের ‘অপরিচিত’ কিছু খেলা খুব আকর্ষণীয়: বিয়াথলন হল ক্রসকান্ট্রি স্কি করার সময় রাইফেল শুটিং। লুজ় হল তক্তায় চিত হয়ে মাথা উপরে রেখে স্লেজিং। আর তক্তার উপর মাথা নীচের দিকে রেখে স্লেজিং করার খেলা হল স্কেলেটন। কার্লিং অনেকটা ইনডোর লন-বোল খেলার মতো, তবে বরফের মেঝেতে লাঠি দিয়ে পাথরের বল নিয়ে খেলা। ৯২টি দেশের ২৮৭১ জন অ্যাথলিট এ বারের শীতকালীন অলিম্পিক্সে যোগ দিছেন। ভারত থেকে দু’জন: আল্পাইন স্কি-তে মহম্মদ আরিফ খান ও ১০ কিমি ফ্রি-স্টাইল ক্রস-কান্ট্রি স্কি-তে স্ট্যানজ়িন লুনদুপ। শেষোক্ত খেলাটি এ বছরেই যুক্ত হয়েছে। এক সময় ভারতে কাশ্মীর-সহ একাধিক হিমালয় উপত্যকায় স্কি, স্কেটিং হত। আজ সেই রমরমা নেই।

অলিম্পিক্স হবে আর ভূরাজনৈতিক মতভেদে কোনও দেশ বাতিল হবে না, তা যেন ভাবাই যায় না। এ বারের শীতকালীন অলিম্পিক্সেও বাদ পড়েছে রাশিয়া ও বেলারুস। দেশের হয়ে বা দেশের চিহ্ন নিয়ে খেলায় যোগ দিতে না পারলেও, টিম স্পোর্ট বাদে একক খেলাগুলোয় ব্যক্তিগত ভাবে এদের অ্যাথলিটদের যোগদানে বাধা ছিল না; রাশিয়ার তেরো জন ও বেলারুসের সাত জন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেছেন। এই অলিম্পিক্সে প্রথম বার যোগ দিয়েছিল আফ্রিকার বেনিন ও গিনি-বিসাউ এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি।

অলিম্পিক্স-কর্মকর্তারা বিতর্কের মুখে পড়েছেন আমেরিকার ‘আইসিই’ উপস্থিতির জন্য। সম্প্রতি সে দেশের মিনিয়াপোলিস শহরে দুই সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু তথা হত্যার খবরে বিশ্ব উত্তাল, সেই আবহে ‘আইসিই’-র উপস্থিতি অস্বস্তিকর বটেই। যদিও বলা হচ্ছে আমেরিকার খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্যই কেবল আইসিই এজেন্টদের নিয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু আমেরিকার খেলোয়াড়রাও স্বস্তিতে নেই। ইটালিতে প্রতিবাদও হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। অনলাইন টিকিট কেনায়, কিছু এলাকায় হোটেলের ওয়েবসাইটে বাধা আসছে।

বন্ধ হয়নি অ্যাথলিটদের অসদুপায়ও। প্রথম দিনেই ধরা পড়েন কিছু পুরুষ স্কাই জাম্পার। তাঁদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক ইনজেকশনের ব্যবহারে যৌনাঙ্গ ফুলিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে, ঢোলা পোশাক পরে ‘জাম্প’ করলে খেলায় সুবিধা মিলবে। প্রতিযোগিতা থেকে এঁদের বাতিল করা হয়েছে। আবার উল্টো দিকে আশা জাগায় এই তথ্য, চল্লিশের কোঠার অ্যাথলিট ভন লিন্ডসে প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিলেন হাঁটু প্রতিস্থাপনের পর।

এই অলিম্পিক্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট, জিম্বাবোয়ের প্রাক্তন অলিম্পিয়ান সাঁতারু ক্রিস্টি কভেন্ট্রি আশা প্রকাশ করেছেন আগামী দিনে রাশিয়া অংশগ্রহণ করবে, কারণ “আমরা রাজনীতি বুঝি, শূন্যে বাস করি না, আওয়ার গেম ইজ় স্পোর্টস।” এত বড় একটা খেলার আসর নিয়ে ভারতে জনপরিসরে, এমনকি সমাজমাধ্যমেও তাপ-উত্তাপ নেই। বেশির ভাগ খেলা সম্বন্ধে লোকের ধারণাও নেই। কিন্তু এক বার পরিচয় হলে এই নতুনত্বে মন ভরবেই। চাই ভারতের অলিম্পিক কমিটির একটু তৎপরতা, সরকার ও গণমাধ্যমেরও আগ্রহ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

winter olympics Olympics Games

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy