মোবাইল ছাড়ো, বই ধরো— যে উপদেশ এত কাল বিশেষজ্ঞরা দিয়ে এসেছেন আগামী প্রজন্মের প্রতি, সম্প্রতি কর্নাটক সরকার তার প্রচার অভিযানে সেই বার্তাটিকেই তুলে ধরেছে। শুধুমাত্র বার্তা প্রদানই নয়, ১৬ বছরের কমবয়সি শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন এবং সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটার ইঙ্গিতও দিয়েছে। এই পদক্ষেপ জরুরি আগামী প্রজন্মের স্বার্থেই। অনিয়ন্ত্রিত মোবাইলের ব্যবহার, বিশেষত সমাজমাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অবাধ প্রবেশ বিরাট সংখ্যক শিশু-কিশোরকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে শুধুমাত্র বৌদ্ধিক বিকাশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, প্রায় মাদকাসক্তির সমান এই নেশা ক্রমশ তাদের একাংশকে উস্কে দিচ্ছে অপরাধপ্রবণতার দিকেও। দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগরদের বৃহৎ অংশ ক্রমশ অ-সুস্থ হয়ে পড়লে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হয় অভিভাবকের ভূমিকায়। কর্নাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার এ ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শকের ভূমিকাটি নিয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের উপস্থিতিতে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া স্পষ্ট করে দিয়েছেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অপরাধপ্রবণতা হ্রাস, এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধেই এই পদক্ষেপের পরিকল্পনা। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারও নাবালকদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কঠোর আইন আনার ভাবনাচিন্তা করছে।
এই পথে ভারতই প্রথম হাঁটছে না। বস্তুত কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের এ-হেন পদক্ষেপ করতে চাওয়ার মূলে রয়েছে অস্ট্রেলীয় সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। অস্ট্রেলিয়াই বিশ্বে প্রথম দেশ, যারা ষোলো বছরের কমবয়সিদের জন্য সমাজমাধ্যম নিষিদ্ধ করতে আইনি পথে হেঁটেছে। সে দেশের যোগাযোগমন্ত্রী জানিয়েছেন, ছোটদের অনলাইন সুরক্ষা নিশ্চিত করাই অভিভাবকদের দুরূহতম চ্যালেঞ্জ। বলা হয়েছে জনপ্রিয় সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলি ছোটদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে না-পারলে তাদের উপর ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার জরিমানা চাপতে পারে। এর পরেই ফ্রান্স পনেরো বছরের নীচে সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে চেয়ে বিল পাশ করেছে। একই পথে হাঁটছে ডেনমার্ক, নরওয়ে, মালয়েশিয়াও।
সমাজমাধ্যম আসক্তি যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মনোযোগের অভাব, ঘুমের ব্যাঘাত, ডিজিটাল হেনস্থা, অবসাদের জন্য দায়ী— এত দিনে প্রমাণিত। তাই শুধুমাত্র সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ঘোষণায় আবদ্ধ না থেকে প্রযুক্তিগত উন্নতির মাধ্যমে গোড়াতেই বয়স যাচাইকরণের কাজটি নিখুঁত ভাবে করতে হবে। কর্নাটক সরকার প্রাথমিক ভাবে সেই কাজ শুরু করেছে। তবে সমাজমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক ভাবে মোবাইল নিয়ন্ত্রণ এক কথা নয়। লক্ষণীয়, কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী শুধুমাত্র সমাজমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ নয়, মোবাইল নিয়ন্ত্রণের কথাও বলেছেন। প্রশ্ন উঠছে, অতিমারি-পরবর্তী কালে সমগ্র বিশ্ব যেখানে ডিজিটাল শিক্ষার পথে পা বাড়াতে চাইছে, সেখানে মোবাইল নিয়ন্ত্রণের ভাবনাটি কতখানি বাস্তবসম্মত। পশ্চিমের অনেক দেশে একটি নির্দিষ্ট বয়সের নীচে শিশুদের মোবাইল, অ্যাইপ্যাড, ল্যাপটপ-ভিত্তিক শিক্ষা থেকে সরে এসে ফের কাগজ-কলমের শিক্ষায় জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ, দেখা গিয়েছে প্রথমটির অত্যধিক ব্যবহারে শিক্ষার মান নিম্নগামী হয়েছে। সুতরাং এখন প্রয়োজন, উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)