দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম জার্মানি এতগুলি মাস ধরিয়া সরকার-বিহীন। তবে রেকর্ড পর্যায়ের এই সরকারবিহীনতা হয়তো শেষ পর্বে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে, কেননা চার মাসেরও পর এত দিনে ভূতপূর্ব চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল নিজের দল সিডিইউ-এর সহিত সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট পার্টি সিএসইউ-এর একটি বোঝাপড়া করিতে পারিয়াছেন। অনেকখানি জমি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের হাতে ছাড়িয়া দিয়া সরকার গঠনের আশা করিতেছেন। মাঝে একটিই বাধা: জার্মানির গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী, রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের সদস্যদের এই চুক্তির সমর্থনে নিজেদের সম্মতি জানাইতে হইবে। বিষয়টি শুনিতে জটিল, কিন্তু ইহার গুরুত্ব অনেক। গণতান্ত্রিক নির্বাচন যদি দেশকে কোনও কঠিন গাঁটে আনিয়া ফেলে, কীভাবে ধীরে এবং সংবিধানসম্মত ভাবে তাহা হইতে মুক্তির পথে অগ্রসর হইতে হয়, জার্মান প্রচেষ্টা তাহার দৃষ্টান্ত হইয়া রহিল। গত সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে এই দুই দলই মানুষের সমর্থন অনেকাংশে হারাইয়াছিলেন। কিন্তু ভোট বহুধাবিভক্ত হইয়া যাওয়ায় সংখ্যার হিসাব-মতে, এখনও এই দুই দলের পক্ষেই হাত মিলাইয়া সরকার গঠন সবচেয়ে গণতন্ত্র-সম্মত পদক্ষেপ। মের্কেলের মন ভাল নাই, তাঁহার গম্ভীর মুখভাবই প্রমাণ। কিন্তু অন্য কোনও পথও খোলা নাই।

সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা বরং খুশি। তাঁহারা বিদেশনীতি ও ফিনান্সসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দফতর অর্জন করিতে পারিয়াছেন। ক্ষমতার অলিন্দে তাঁহারা এখন শক্তিমান। তাঁহাদের নেতা মার্টিন শুলট্জ মের্কেল-বিরোধিতার চরম স্তর হইতে নামিয়া আসিয়া আপাতত সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পাইতে অতীব আগ্রহী। নীতির দিক দিয়া অবশ্য তাঁহাদের এ বার কঠিন পরীক্ষা। এত দিন ধরিয়া তাঁহারা বারংবার শ্রমিক স্বার্থের পক্ষে কথা বলিয়া আসিলেও ক্রমে ধনতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির পথই তাঁহাদের কাছে গ্রহণীয় ও আদরণীয় হইয়াছে। সুতরাং এত দিনের অনবরত মের্কেল-নীতির বিরোধিতার পর এ বার ইউরোজোন-এর সহিত বিদেশনীতি ও অর্থনীতি লইয়া তাঁহারা কেমন লেনদেন করেন, দেখিবার জন্য গোটা ইউরোপই উদগ্রীব।

জার্মানির এই ঘটনাক্রমে জার্মানরা কতখানি খুশি বলা মুশকিল হইলেও ইউরোপ বেশ প্রসন্ন। দুটি কারণে এই প্রসন্নতা। প্রথমত মের্কেলকে জার্মান দক্ষিণপন্থীরা যে কঠিন সময়ের সামনে ফেলিয়াছিলেন, তাহা হইতে তিনি বাহির হইতে পারায় ইউরোপ মোটের উপর নিশ্চিন্ত। মের্কেলের সহিত তাঁহারা বারো বৎসর যাবৎ ঘর করিতেছেন। মের্কেলের প্রতি নির্ভরতা দিয়া সেই ২০০৮ সাল হইতে ই-ইউ অর্থনৈতিক ঝড় কাটাইয়াছে। গ্রিস সংকটের সময়ে মের্কেলই নেতৃত্ব দিয়াছেন। রাশিয়াকে আটকাইতে তিনিই প্রধান ভূমিকা লইয়াছেন। সিরীয় উদ্বাস্তু সংকটের সময়ে মের্কেলই প্রধান ভার বহন করিয়াছেন। সবাই তাঁহার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন নহেন, কিন্তু শত্রুতা ঘটিলেও তাহা চেনা শত্রুতা, জানা বিপদ। এ বারের নূতন শরিকি বন্দোবস্তে যদি মের্কেলের ক্ষমতা একটু কমিয়া যায়, তাহা হইলে ইউরোপের সেই অ-বন্ধুরা আরওই খুশি হইবেন। ইঙ্গিত মোটের উপর মঙ্গলবাহী। ইউরোপ এখন ‘নিউ ডিপারচার’ বা নূতন আরম্ভের আশায় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত নূতন মের্কেল সরকারের দিকে তাকাইয়া।