পর পর দুটো দিন। উনিশ আর বিশ— শনি আর রবি। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে, অথচ মনে হচ্ছে এই গতকাল ঘটে গিয়েছে।

এই দু’দিনে দুটো ঘটনার ধাক্কা এসে লেগেছে সারা পৃথিবী জুড়ে, তবে প্রথম ঘটনার কেন্দ্রে ছিল আমাদের দেশ— ভারত; আর দ্বিতীয়টার কেন্দ্রে আমেরিকা বা আরও পরিষ্কারভাবে ‘নাসা’ থাকলেও, প্রভাব পড়েছে প্রকৃত অর্থে গোটা বিশ্বে!

দ্বিতীয় বিষয়টা হল অ্যাপোলো মহাকাশযানের চাঁদে পৌঁছনো, মানুষের প্রথম পা-রাখার দিন চাঁদের মাটিতে। ২০ জুলাই, ১৯৬৯।

আর প্রথম ঘটনার দিন ছিল শনিবার, ১৯ জুলাই, ১৯৬৯— ইন্দিরা গাঁধী দেশের ১৪টা বড় ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্ত করলেন। মোট আমানতের পরিমাণ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ। তখনও পর্যন্ত স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া ছিল সরকারের আওতায়। একমাত্র স্টেট ব্যাঙ্ক। জন্ম: ১৮০৬ সাল। ব্যাঙ্ক অব ক্যালকাটা নাম ছিল তখন। তিন বছর পরে ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গল নাম হয়। ১৯৫৫ সালে সরকার ব্যাঙ্কটি অধিগ্রহণ করে, তখন নাম ছিল ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্ক, পরে নাম পাল্টে স্টেট ব্যাঙ্ক হয়েছে। একা এই ব্যাঙ্কের আমানতের পরিমান ছিল ব্যাঙ্কশিল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি— মোট আমানতের ২৩ শতাংশের কাছাকাছি।

ইন্দিরা গাঁধী অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে জাতীয়করণের কাজ সেরে ফেলেন। এই পর্যন্ত ইতিহাসের বিষয়। সেই ইতিহাসের ৫০ বছর ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই পালন করা হচ্ছে। সগর্বে এবং দেশজুড়ে। বিদেশের লোকজনও খুশিমনে পালন করছেন। সেমিনার, আলোচনায় চারদিক ব্যস্ত...অথচ পঞ্চাশ বছর আগের চেহারা ঠিক এরকম ছিল না।

দেশে ব্যাঙ্ক-ব্যবস্থা তখন শোচনীয়। প্রতি সপ্তাহে একটা করে ব্যাঙ্ক উঠে যাচ্ছে, অর্থাৎ ‘ফেল’করছে।

পক্ষে লোক ছিল, বিপক্ষেও প্রবল বাধা। অর্থনীতির পণ্ডিত বলবেন, ‘এটা তো স্বাভাবিক! একটা বড় পদক্ষেপ, যদি সফল না হয় সেটাও তো মানুষ দেখবে।’ ঠিক কথা, অবশ্যই দেখবে… প্রথা ভাঙার খেলায় সব মানুষ যেতে চায় না এটাও সত্যি। যেটা এতদিন ধরে চলছে, মানুষও ভাল-মন্দ মিশিয়ে তার সঙ্গে চলছে, সেটা থাকাই যেন ভাল, অন্ততনতুন কিছু করার ঝুঁকি নেই সেখানে!

কিন্তু এখানে ঠিক সেটা হল না। আরও কিছু হল। আর ৫০ বছর পরে তার গুরুত্ব কিছুমাত্র কমেনি— এক নতুন পথে এগিয়েছে দেশের রাজনীতি।

‘কামরাজ প্ল্যান’অনুযায়ী মোরারজি দেশাই ১৯৬৩ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ালেও ১৯৬৭ সালে ইন্দিরা গাঁধীর সরকারে উপপ্রধানমন্ত্রী হিসাবে আবার যোগ দেন। দায়িত্ব নেন অর্থমন্ত্রকের।

দেশে ব্যাঙ্ক-ব্যবস্থা তখন শোচনীয়। প্রতি সপ্তাহে একটা করে ব্যাঙ্ক উঠে যাচ্ছে, অর্থাৎ ‘ফেল’করছে। আমানত উধাও, যারা ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন, তাঁরা রাতারাতি সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসছেন।

আরও পড়ুন:ব্যক্তিগত তথ্য সরকারি সম্পত্তি নয়: অর্থনীতিবিদ প্রণব বর্ধন

 

ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডের ডিরেক্টর বলেছিলেন, ‘‘ভারতের মতো এত বিপজ্জনক ব্যাঙ্কিং-ব্যবস্থা যে দেশে চালু আছে, তাদের অত্যন্ত সাবধানে ব্যাঙ্কিং চালানো উচিত এবং প্রয়োজনও বটে।’’ ইনি ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ লর্ড জন মেনার্ড কিন্‌স। বক্তব্যটি প্রায় নিশ্চিত ভবিষ্যতবাণীর মতো কাজ করেছে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত।

তবু মোরারজি কয়েকটি পদক্ষেপ করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের আগে ৫০ বছর দেশে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হয়েছে।উঠে গিয়েছে।আর ১৯৪৭ থেকে ’৬৯-এর মধ্যে তার প্রায় এক তৃতীয়াংশ। মোরারজি ৩২৮ থেকে ব্যাঙ্কের সংখ্যা ৬৮-তে নিয়ে আসেন।

কিন্তু ইন্দিরা গাঁধী তখন আরও অনেকটা এগিয়ে ভাবছেন। ভাবছেন সমাজতন্ত্রের কথা, তাঁর বাবা জওহরলাল নেহরুর স্বপ্নের কথা— আর তাঁর ভাবনাকে ক্রমশ আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দলের মধ্যে ক্রমশ তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার চেষ্টা। ‘সিন্ডিকেট’-এরসক্রিয়তা ক্রমশ বাড়ছে।

ইন্দিরা সক্রিয় হলেন। পর পর ঘটনাগুলো ঘটে গেল। ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ, মোরারজি দেশাইকে অর্থমন্ত্রী থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ভিভি গিরিকে নির্দল প্রার্থী হিসাবে রাষ্ট্রপতি পদে সমর্থন করা। যেখানে সঞ্জীব রেড্ডি দলের প্রার্থী সেখানে দাঁড়িয়ে ‘বিবেকের ভোট’চাইলেন ইন্দিরা।

একা ইন্দিরা? না, একা নন। অবাধ্য অশান্ত সময়ে তাঁর পাশে এক হচ্ছে কংগ্রেসের নতুন প্রজন্ম। রয়েছেন পিএন হাকসার এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নরের দল। যাঁরা গোপনে তৈরি করেন ব্যাঙ্ক-রাষ্ট্রায়ত্তকরণের কাগজপত্র।

আরও পড়ুন: অস্বস্তি হলেই ঘটনা ‘সাজানো’!

 

খেয়াল করবেন, ইন্দিরা যখন ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্তকরণের অর্ডিন্যান্স পাশ করছেন, তার পরদিন পর্যন্ত ভিভি গিরি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদে আছেন। বোঝা যায়, গিরি নির্বাচনে জিতবেন কি নাসে ব্যাপারেইন্দিরা তখন নিশ্চিত ছিলেন না।

কিন্তু ঘটনার পিছনে এই আঁকিবুকিগুলো আমরা কেউ মনে রাখি না, মনে রাখার কথাও নয়।

ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ ভারতের অর্থনীতির জগতে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য এবং বৈপ্লবিক কাজ। রাজনীতির জগতেও। আর ওই ’৬৯ সালের নভেম্বর মাসে ইন্দিরা গাঁধী কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হন; তৈরি হয় ইন্দিরা কংগ্রেস।

ব্যাঙ্ক জাতীয়করণকে কেন্দ্র করে রাজনীতির নতুন যুগ শুরু হয় ওই ১৯৬৯-৭০ সালে। বাকিটা ইতিহাস।