এপ্রিল মাসের গোড়ায় বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু যে ইজ়রায়েলের জাতীয় নির্বাচনে জিতিয়া আসিলেন, সকলেই বলিতেছে সেই জয় ঐতিহাসিক। কেন? কেননা পর পর পাঁচ বার ইজ়রায়েলে প্রধানমন্ত্রী হওয়া একটি রেকর্ড ঘটনা, সেই দেশে প্রথম বার। অন্য ভাবে দেখিলেও ইতিহাস। বাম-বাদী (এমনকি মধ্যবাদী) রাজনৈতিক শিবির হইতে সেই দেশের শেষ প্রধানমন্ত্রী আসিয়াছিলেন কুড়ি বৎসর আগে, অর্থাৎ গত শতাব্দীতে। একবিংশ শতকের ইজ়রায়েল জানিয়াছে যে, দুর্নীতি কিংবা মানুষ-ঠকানো চক্রান্ত, কোনও কিছুই ক্ষমতায় আসিবার এবং বসিবার প্রতিবন্ধকতা নয়, দেশের সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে মন দেওয়াও জিতিয়া আসিবার পথরোধক নয়— একাদিক্রমে ক্ষমতায় থাকাই ক্ষমতার একমাত্র অর্থ। এই শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা ইজ়রায়েলবাসী এবং সেই সূত্রে সমগ্র পৃথিবীতে যে রাজনীতিকরা ছড়াইতে সফল হইয়াছেন, নেতানিয়াহু তাঁহাদের পুরোভাগে স্থান দাবি করিবেন। কিন্তু ইতিহাসবোধ একটি অন্য কারণেও এই নির্বাচনী ফলাফলকে ঐতিহাসিক বলিবে। কয়েক দশকব্যাপী প্যালেস্তাইন-ইজ়রায়েল রক্তাক্ত সংঘর্ষের পরও, দুই পক্ষের উগ্র জাতীয়তাবাদীদের আক্রমণপরায়ণতা দেখিবার পরও, ইজ়রায়েল দেশটির একটি অংশ বিশ্বাস করিত যে, কোনওমতে একটি রাজনৈতিক মধ্যপন্থা আবিষ্কার করা সম্ভব, হয়তো দুই-রাষ্ট্র সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। নেতানিয়াহুর দুই দশকব্যাপী নেতৃত্ব তাহা ভুলাইয়া দিয়াছে। বর্তমান প্রজন্ম একটি ভিন্ন বাস্তবে আস্থা রাখিতে শিখিয়াছে। যে বাস্তব বলে, যত জোর খাটাইবে ততই ফল পাইবে। ‘বিনা রক্তে নাহি দিব সূচ্যগ্র ভূমি’র নীতি হইতে এখনকার ইজ়রায়েলের নীতি এক কাঠি বাড়া— শত্রুপক্ষের রক্ত ও ভূমি, উভয়ই নিজেদের করতলগত করিতে তাহারা আগ্রহী ও তৎপর। অর্থাৎ, এক দীর্ঘ সময়ে যে ভাষা ও ভাবনা দিয়া প্যালেস্তাইন-ইজ়রায়েল সম্পর্ক আলোচিত হইত, এই রেকর্ড জয়ের পর ইজ়রায়েলের ভিতরে এবং বাহিরে সেই ভাষা ও ভাবনার বিলয় ঘটিল বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। ঐতিহাসিক, নিশ্চিত ভাবেই। 

বাস্তবিক, জ়ায়নিজ়ম-এর আদর্শ কোনও একমুখী বা একস্তরীয় আদর্শ নহে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইজ়রায়েলের জন্মের মধ্যেই সেই বিভিন্ন ধারার বীজগুলি উপ্ত ছিল। নেতানিয়াহুর পাশাপাশি আর এক ঐতিহাসিক ও দীর্ঘ প্রতিপত্তিশালী নেতা বেন-গুরিয়নের কথা ভাবিলেই প্রতীত হইবে, কোথায় সেই বহু ধারার বহতা স্রোতের উৎস। দুর্ভাগ্য, লিবারাল ও তুলনায় সহিষ্ণু সেই ধারাটি আজ সে দেশে টিমটিমে প্রান্তিক হইয়াছে, সংঘর্ষ নিরসনের স্বপ্নটি নিবিতেছে। নেতানিয়াহুর প্রবর্তিত ‘পার্মানেন্ট কনফ্লিক্ট’ বা স্থায়ী সংঘাতের আদর্শকে এই পরিপ্রেক্ষিতেই বোঝা জরুরি। ইহার ফলে আরব দেশগুলির সহিত সম্পর্ক রক্ষায় কোনও অসুবিধা হইবে বলিয়া তাঁহারা মনে করেন না। ইজ়রায়েলের পরিস্থিতি ‘ইউনিক’— এই নীতিতে ভর রাখিয়া তাঁহারা প্রত্যয়ী আন্তর্জাতিকতা করিতে চান। বহির্বিশ্বে, এমনকি আরব বিশ্বেও প্যালেস্তাইন সর্বপ্রিয় নহে, যাহার অর্থ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কথা ছাড়িয়াই দেওয়া যায়, এমনকি পশ্চিম এশিয়াতেও বন্ধু খুঁজিতে ইজ়রায়েলকে বেগ পাইতে হইবে না। সুতরাং এক নূতন সংঘাতকেন্দ্রিক বিশ্বদর্শনের অগ্রপথিক হিসাবে ইতিহাসে নেতানিয়াহুর স্থান জুটিয়া গিয়াছে।