ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর কাজের খেসারত দিয়ে বউবাজারে আমাদের সহ-নাগরিকেরা কী ঘোর দুর্গতির কবলে পড়েছেন, তা এখন আর বিশদে বলার প্রয়োজন নেই। সপ্তাহ তিনেক হতে চলল, তাঁরা প্রায় গৃহহীনের জীবন যাপন করছেন। এঁদের অনেকেই ওই এলাকার পুরনো বনেদি পরিবার। শিশু-বৃদ্ধ-মহিলাদের নিয়ে বড় বড় বাড়িতে তাঁদের বাস। অনেকেরই পৈতৃক ভিটেয় দোল-দুর্গোৎসব হয়ে থাকে। এবারেও একাধিক পরিবারে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু হঠাৎ এক ঝটকায় তাঁদের ভদ্রাসন এবং সংসারের ভিত হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়েছে। শরণার্থীর মতো কারও আশ্রয় হয়েছে হোটেলে, কারও অন্য কোথাও। পিছনে পড়ে আছে নানা অজানা শঙ্কা। আবার তাঁরা নিজেদের ফেলে আসা বাড়িতে ঢুকতে পারবেন তো? পারলেও তা কতদিন পরে? ততদিনই বা কী হবে? প্রথমে রাজ্য সরকার, পরে মেট্রো কর্তৃপক্ষের তরফে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অনেকে তা পেয়েও গিয়েছেন। যদিও তাঁরা যে অবর্ণনীয় মানসিক চাপের শিকার, টাকা দিয়ে তার উসুল হয় না।

একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েক জন ছোট ব্যবসায়ীও। তাঁদের অধিকাংশই গয়নার নির্মাতা। আসন্ন উৎসবের মরশুমে তাঁদেরও মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। বঙ্গজীবনে বছরকার সবচেয়ে বড় উদ্‌যাপনের আনন্দ এবার হয়তো এঁদের কাউকেই স্পর্শ করবে না।

এই বিষাদময়তা যদি বিপর্যয়ের একটি দিক হয়, তবে অপর দিকটি হল রাজনীতি। আর পাঁচটি বিষয়ের মতোই এখানেও রাজনৈতিক রসদের অভাব নেই। কেন বাড়ি ভাঙল তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস সবাই মোটামুটি একমত যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ভাঙনের দায় এড়াতে পারেন না। তাঁদের অভিযোগ, মমতার ‘চাপে’ ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর রুট না বদলালে আজ বউবাজারের এই পাড়ায় বাড়িগুলির এমন দুর্দশা হত না।

রাজনীতির লোকেদের একটি বড় সুবিধা আছে। তাঁরা অনায়াসে দড়িকে সাপ বা সাপকে দড়ি বানাতে পারেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারও পেয়ে যান। কারণ নেতারা কথা বললে আর যা হোক, একটা জনমত তৈরি হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। মমতার বউবাজারে দুর্ঘটনাস্থলে যাওয়া, আর্থিক সহায়তা ঘোষণা এবং মেট্রোর সঙ্গে বৈঠক করে তাদেরও আর্থিক ক্ষতিপূরণের জন্য রাজি করানোর চেষ্টার পরেই রুট বদলকে ঘিরে তাঁর দিকে দায় ঠেলে দেওয়ার রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি কি ঠিক এই রকম? 

সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি কথা অবশ্যই বলা দরকার। মেট্রোর রুট বদলের নেপথ্যে মমতার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সাবেক পরিকল্পনায় ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোকে সরাসরি বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট বিবাদী বাগে নিয়ে যাওয়ার যে নকশা ছিল, তাতে মমতা আপত্তি করেছিলেন। সেখানকার একদল দোকানদার তাঁদের ব্যবসা সরিয়ে নিতে চান নি। রাজ্যে তখন বাম-শাসন। বিরোধী নেত্রী মমতা ওই ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ান।

তবে তিনি একা নন, দোকানদারদের ‘উপযুক্ত’ পুনর্বাসনের দাবিতে সরব ছিল কংগ্রেসও। বউবাজারে ওই এলাকার কাছেই ছিল তৎকালীন সরকারের শরিক ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য দফতর। দোকানদারদের উঠে যাওয়ার জন্য তারাও কিন্তু কোনও ‘সদর্থক’ চেষ্টা করে নি। কার্যত একটু নরম মনোভাবই ছিল তাদের।

এর পিছনে আদতে কী কারণ ছিল, সংশ্লিষ্ট দোকান-মালিকদের জাত-ধর্ম-সম্প্রদায় বিচার কতটা কী কাজ করেছিল, সেই সব প্রশ্নও আজও ঘুরছে। তবে এটা ঘটনা, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তখন বিভিন্ন দল যে যার মতো অবস্থান নিয়েছিল। মমতার প্রভাব, গুরুত্ব সবই অন্যদের চেয়ে ঢের বেশি। ফলে তাঁর প্রতিবাদ ছিল বেশি জোরালো। তিনিই এটা ঘোষণা করেছিলেন, ক্ষমতায় এলে তাঁরা এই রুট বদলে দেবেন। 

হলও সেটাই। মমতার আমলে রুট বদলাল। সেই রুটে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে গিয়ে ধস নামল। অতএব অঙ্কও সহজে মিলিয়ে দেওয়া গেল। ‘দায়’ তাহলে মমতারই!

কিন্তু রুট বদলের পিছনে বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রধান যুক্তি কী ছিল? রাজ্য বলেছিল, মহানগরের বিভিন্ন দিকে মেট্রো পরিবহণকে ছড়িয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ চলছে, তাতে একটি বড় ক্রসিং স্টেশন করতে গেলে এসপ্লানেড সঠিক জায়গা। সাবেক পরিকল্পনায় সেন্ট্রাল স্টেশনকে ক্রসিং স্টেশন হিসাবে ভাবা হয়েছিল। তাই দুদিকে প্ল্যাটফর্ম, দু’দিকে কামরার দরজা খোলার সংস্থান ইত্যাদি রেখে ওই স্টেশনটি তৈরি হয়। তখনও মেট্রোর এতখানি বিস্তারের ভাবনা ছিল না। নর্থ-সাউথ অর্থাৎ দমদম থেকে টালিগঞ্জ রুট চালু করার পাশাপাশি ভাবনা ছিল শুধু ইস্ট-ওয়েস্টের। ভেবে অবাক লাগে, ১৯৭১ সালে প্রথম ইস্ট-ওয়েস্টের কথা রেলের মাথায় আসে। এখন আরও যা যা হচ্ছে, তা অনেক পরের।

পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজ্য তাই এসপ্লানেডকে ক্রসিং স্টেশন করার প্রস্তাব দেয়। মেট্রোরও আনুমানিক হিসাব ছিল, ক্রসিং স্টেশনে ঘন্টায় কমপক্ষে ৫০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করবেন। ভিড় পরে আরও বেড়ে যাবে। সেন্ট্রালের পক্ষে যা সামাল দেওয়া শক্ত। তাছাড়া বিভিন্ন দিক থেকে এসে যাঁরা ক্রসিং স্টেশনে নামবেন, তাঁদের একাংশ উপরে উঠে এসে অন্য পরিবহণের সুযোগ নিতে চাইলেও এসপ্লানেড অর্থাৎ ধর্মতলার বিকল্প নেই। এই ব্যাপারে রাইটস-কে দিয়ে রাজ্য যে সার্ভে করেছিল, রেল বোর্ড তা মেনে নেয়। এমনকি জাপানের অর্থলগ্নি সংস্থাও বাণিজ্যিক দিক বিবেচনা করে এই রুট বদলে সায় দেয়। এতে কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ বাড়া সত্ত্বেও বাস্তবতার দিকটি কেউ অস্বীকার করতে পারে নি। ফলে শুধু মমতা ‘চাপ’ দিলেন বলেই রুট বদলে গেল, বলা  সম্ভবত অতি সরলীকরণ হবে। 

ভুললে চলবে না, মমতার সরকার বরাহনগর-ব্যারাকপুর মেট্রোর রুটকেও ঘুরিয়ে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে আনার কথা বলেছিল। যুক্তি ছিল, এটা না হলে পলতার জলের লাইন সরাতে হবে। তাতে বিপর্যয় হতে পারে। মেট্রো কিন্তু তা মানেনি। ফরাসি সংস্থাকে দিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষার পরে তারা পুরনো রুটেই লাইন বসানোর সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। বউবাজারে রুট বদলের বাস্তবতা এর থেকেই বোঝা যায়।

আমরা জানি, একাধিক ঠিকাদার সংস্থাকে ইস্ট-ওয়েস্টের ভূগর্ভস্থ কাজের বরাত দেওয়া হয়েছিল। হাওড়ার দিকে এবং গঙ্গার নীচে যে সংস্থা কাজ করেছে তাদের এই রকম কোনও সমস্যার মুখে পড়তে হয়নি। হাওড়ায় কাজের সময় সেখানকার কোনও কোনও এলাকায় বাসিন্দাদের সরাতেও হয়েছে। কিন্তু সব মিটেছে সুষ্ঠু ভাবে। কলকাতার দিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কাজ করার সময় জানবাজারে পুরনো বাড়িগুলিকে বাঁচিয়েই খনন করেছে। প্রয়োজনমতো লোকজনকে সরিয়ে কাজ হয়েছে সেখানেও। অথচ তাদের হাতেই বউবাজারে কেন সঙ্কট হল, তদন্ত হলে আমরা হয়তো তা জানতে পারব।

তবে এই ঘটনার পরে লখনউ-এর মেট্রো প্রকল্পে দায়িত্বশীল পদে থাকা এক ইঞ্জিনিয়ারের কাছে শুনছিলাম, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ভূগর্ভে মাটি কাটার সময়ে মেশিনের সামনে থেকে সর্বদা ২৫ মিটার ‘প্রোব ড্রিলিং’ করতে হয়। তাতে আগাম মাটির চরিত্র, জলস্তর ইত্যাদি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তিনি বলছিলেন, এভাবেই সেখানে ২০০ বছরের পুরনো মসজিদের তলায় ঠিকঠাক সুড়ঙ্গ কাটা হয়েছে।

কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল সে সব বিশেষজ্ঞরা জানেন। তবে আপাতত এটুকু বলতে পারি, বউবাজারের ভূগর্ভে অনেক কাদা-জল জমে আছে। তাই শস্তার রাজনীতির পোয়া বারো। 

আঁজলা ভরে তুলে নিয়ে ছুড়ে মারার এই তো প্রকৃষ্ট সুযোগ!