অবশেষে স্কুলশিশুদের জন্য মিড-ডে মিল প্রকল্পে বেসরকারি বন্দোবস্তের অনুমোদন দিল কেন্দ্রীয় সরকার। ২০১৭ সালের মে মাসে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিয়াও এই বৎসরের এপ্রিলে পিছাইয়া আসিয়াছিল তাহারা। এখন ফের সরকারের সিদ্ধান্ত পাল্টাইল। সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠ শ্রমিক সংগঠন জানাইয়াছে, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের সিদ্ধান্ত ‘অন্যায্য’। তাহাদের উত্থাপন করা প্রশ্নগুলি সহজ। প্রথমত, সকল শিশু যথাযথ পুষ্টি পাইতেছে কি না, ইহা স্কুলের শিক্ষক এবং অভিভাবকেরাই নজরে রাখেন। কেন্দ্রীয় পাকশালা তৈয়ারি হইলে একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে রন্ধনকার্য চলিবে, এবং উহা স্কুলে স্কুলে বণ্টনের ব্যবস্থা হইবে। প্রতিনিয়ত নজরদারি কে করিবে, জানা নাই। মিড-ডে মিলে যদি স্বাস্থ্যবিধি পালিত না হয়, তাহা হইলে উপকার অপেক্ষা অপকারের ভাগটিই অধিক হইবার আশঙ্কা। দ্বিতীয়ত, গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি স্কুলের নিজস্ব পাকশালা আছে। সেখানকার যন্ত্রপাতি এবং জ্বালানির কী হইবে? তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় পাকশালা হইতে বণ্টনের ফলে খরচের বোঝাও বাড়িবে। গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করিতে গিয়া খাবার নষ্ট হইবার আশঙ্কাও অমূলক নহে।

কিন্তু, এই সকল সমস্যাই সমাধানযোগ্য। বেসরকারিকরণের বিরোধিতা না করিয়া সেই সমাধানের পথগুলি সন্ধান করাই বিধেয় নয় কি? এই প্রশ্নের দ্ব্যর্থহীন উত্তর— না। ভারতে এমন বহু ক্ষেত্রে সরকারের উপস্থিতি প্রবল, যাহা সম্পূর্ণত বেসরকারি হাতে থাকাই বিধেয়। কারখানা হইতে পরিবহণ ক্ষেত্র সর্বত্র আর্থিক বোঝা বহিয়া বেড়াইবার দায়ও সরকারের নাই। সরকার পরিকাঠামো দিবে, নজরদারি করিবে, আর অবশিষ্ট কাজ করিবে বেসরকারি সংস্থা— ইহাই আদর্শ পরিস্থিতি। বেসরকারি ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ে, তাহাতেও সন্দেহ নাই। প্রতিযোগিতার ধর্মই কুশলতা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। কিন্তু মিড-ডে মিলের প্রশ্নটি পৃথক। কেননা, দেশের প্রতিটি শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাইতেছে কি না, তাহা নিশ্চিত করিবার দায় সরকারের। বস্তুত, পরিকাঠামো নির্মাণ ও নজরদারি বাদে কোনও একটি কাজের দায়িত্ব যদি সম্পূর্ণত সরকারের হয়, তবে তাহা শিশুদের পুষ্টি এবং সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। সেই দায়িত্ব বেসরকারি উদ্যোগের হাতে ছাড়িয়া দেওয়া যায় না। 

শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে লাভের সমীকরণ ঢুকিয়া পড়িলে পুষ্টির প্রশ্নে আপস হইবার আশঙ্কা থাকে। সেই ঝুঁকি লওয়া অনুচিত ও অনৈতিক। প্রশ্ন উঠিতে পারে, বেসরকারি সংস্থার হাতে দায়িত্বটি ছাড়িয়া দিলেও নজরদারির অধিকার তো সরকারের থাকিবে— গুণমানে আপস করা হইলে সরকার সংশ্লিষ্ট সংস্থাটিকে চাপিয়া ধরিবে না কেন? সরকার কী করিবে, তাহা পরের প্রশ্ন, কিন্তু বেসরকারি সংস্থার হাতে মিড-ডে মিলের অধিকার ন্যস্ত হইলে তাহার প্রত্যক্ষ উপভোক্তা, অর্থাৎ ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের অধিকারের পরিসরটি ছোট হইবে, তাহাতে সন্দেহ নাই। আরও গুরুত্বপূর্ণ, মিড-ডে মিলের প্রশ্নটি বহুলাংশে আলোচনাভিত্তিক অংশীদারিত্বের পথেই অগ্রসর হওয়া বিধেয়। অভিভাবক হইতে পুষ্টিবিদ, অর্থশাস্ত্রী বা অসরকারি সংস্থা, মিড-ডে মিলের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের ভূমিকা আছে, এবং থাকাই কাম্য। বেসরকারি হাতে গেলে সেই যোগদানের পরিসরটিই আর থাকিতে পারে না।