×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৮ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

হাঁড়ির হালই তা হলে লক্ষ্য?

বেশির ভাগ বিজেপি-শাসিত রাজ্যের আসল পরিস্থিতি জানা জরুরি

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২৫ জানুয়ারি ২০২১ ০৪:৫৫

রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলটি যদি ক্ষমতায় আসে, রাজ্যের ঠিক কী লাভ হবে? এই প্রশ্নটা কথার কথা নয়— এর একটা ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত আছে। পশ্চিমবঙ্গে যখনই রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে, তার সঙ্গে সঙ্গেই একটা কোনও বড় পরিবর্তনও ঘটেছে। সদ্য-স্বাধীন, দ্বিখণ্ডিত রাজ্য বিধানচন্দ্র রায়ের আমলে দেশ গঠনের তাগিদ পেয়েছিল; বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পেয়েছিল ভূমি সংস্কার। দশ বছর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ক্ষমতায় এলেন, তখনও কিন্তু কৃষিজমি সংক্রান্ত নীতিতে একটা মস্ত পরিবর্তন এল। প্রশ্ন হল, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ভাবনার স্তরে এমন কোনও পরিবর্তন আসবে কি?

তার ইঙ্গিতমাত্র নেই। নির্বাচনের মাস পাঁচেক যখন বাকি, তখন সে দলের প্রধান নেতা শক্তিক্ষয় করছেন অমর্ত্য সেনের মতো চিন্তাবিদকে ‘জমিচোর’ বলে। দলের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ্যে জানাচ্ছেন, দলের কর্মীরা আক্রান্ত হলে উত্তরপ্রদেশীয় পন্থায় আক্রমণকারীদের সরিয়ে দেওয়া হবে সুপরিকল্পিত দুর্ঘটনা ঘটিয়ে। তর্কের খাতিরে নাহয় ধরলাম এ সবই কথার কথা। কিন্তু এই অপ্রয়োজনীয় কথার বাইরে আর তো কিছু পাই না আমরা। কোভিড-উত্তর সময়ে বাংলাকে কী ভাবে তাঁরা গড়ে তুলবেন? কী ভাবে সামাল দেবেন বেকার সমস্যা? হাওড়া বা শিলিগুড়ির মতো যে শহরগুলি প্রায় অর্ধ শতক ধরে উন্নয়নের প্রসবযন্ত্রণা ভোগ করছে, তাদের হাল ফেরাবেন কী ভাবে? এ নিয়ে বিজেপি নেতারা একটি বাক্যও ব্যয় করেন না।

এবং এ সবই পুরনো প্রশ্ন। আমাদের তো উচিত সামনে তাকানো— সেখানেও কম প্রশ্ন অপেক্ষা করছে না। আয়লা-আমপানের স্মৃতি এখনও টাটকা, উষ্ণায়িত পৃথিবী ভবিষ্যতেও বহু কঠিন সমস্যার সামনে দাঁড় করাবে। প্রান্তিক মানুষ, গরিব কৃষকদের বাঁচাতে ঠিক কী পরিকল্পনা নেওয়া উচিত? তথ্যপ্রযুক্তি হোক বা জৈবপ্রযুক্তি, আর্থিক সমৃদ্ধির ট্রেন আমরা বারে বারে ধরতে পারিনি। সামনের দশ-কুড়ি বছরে পশ্চিমবঙ্গে কোন প্রযুক্তি, কোন শিল্পে সরকারি বিনিয়োগের দরকার? এ সব নিয়েও বিজেপি নেতাদের মুখে একটাও কথা শুনিনি।

Advertisement

দুর্নীতি অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের একাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাকে দলে টেনে সে ব্যাপারে কোনও কথা বলার নৈতিক অধিকারও কি হারায়নি বিজেপি? সারদা বা রোজ় ভ্যালি যে মানুষগুলিকে সর্বস্বান্ত করে ছেড়েছিল, তাঁদের সুবিচার পাওয়ার আশাও তাই বিশ বাঁও জলে। এবং এ প্রশ্নে মনে করিয়ে দেওয়া ভাল, সততার প্রশ্নে বিজেপির রেকর্ড অন্য দলগুলির মতোই জঘন্য, হয়তো আরও বেশি খারাপ। মধ্যপ্রদেশে মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রভর্তি কেলেঙ্কারি (ব্যপম) বা কর্নাটকের খনি কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত আর্থিক ক্ষতি ও প্রাণহানির সংখ্যা যে কোনও সংবেদনশীল মানুষের শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেবে।

বিজেপির একাধিক নেতা দাবি করেছেন, বহু দিন পর কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকলে বাংলার সোনার দিন আসবেই। তেমনটা হতে পারত, যদি কেন্দ্রে একটা গণতন্ত্রকামী সরকার থাকত, যারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাস করে। নরেন্দ্র মোদীর সরকার তার উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে— সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের হাতে পুঞ্জীভূত করে চলেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই একনায়কতন্ত্র কায়েম হলে কী সর্বনাশ হতে পারে, তা সত্তরের দশকে বাংলা দেখেছে। কেন্দ্রের যথেচ্ছাচার প্রতিরোধ করার চেষ্টাও যদি রাজ্য না করে, ফল ভুগতে হয় সাধারণ মানুষকে। কেন্দ্র যে সব সময় রাজ্যের কথা শুনবেই, সে কথাও জোর দিয়ে বলা মুশকিল। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দল থাকা সত্ত্বেও শরণার্থী সমস্যায় জেরবার বাংলায় টাকা এবং অন্যান্য রসদ আনতে কালঘাম ছুটে গিয়েছিল বিধানচন্দ্র রায়ের।

তবে, কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই দল ক্ষমতায় থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্দশা কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, তার মোক্ষম উদাহরণ বর্তমান অসম। নাগরিক পঞ্জির নামে হাজার হাজার মানুষ— যাঁদের অধিকাংশই বাংলাভাষী— নির্বাসিত হয়েছেন ডিটেনশন ক্যাম্পে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে শরণার্থী সমস্যার প্রেক্ষিতে অসমের চেয়েও বাংলা ভুগেছে বেশি। আমাদের রাজ্যে আরও অনেক বেশি মানুষ আছেন, যাঁদের পক্ষে চাইলেই তিন পুরুষের সমস্ত পরিচয়পত্র বার করে দেখানো সম্ভব নয়। ঘটনাচক্রে যদি কেন্দ্র এবং পশ্চিমবঙ্গে একই সঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তা হলে এই মানুষগুলির ভাগ্যে সম্ভবত অসীম দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে।

এই প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন একেবারে অনিবার্য হয়ে উঠেছে— এই রাজ্যে দল হিসেবে বিজেপির কি আদৌ কোনও স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য আছে? স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কতটুকু ক্ষমতা আছে? তৃণমূল কংগ্রেস পুরোপুরি ভাবেই বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক দল। বামফ্রন্টের মুখ্য দলগুলির বাঙালি নেতারাও বহু দশক ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। জ্যোতি বসুর সময়ে তো বটেই, তাঁর পরেও বাংলার নেতাদের কথা উড়িয়ে দেওয়ার সাধ্য ছিল না গোপালন ভবনের। এমনকি, কেন্দ্রে জোট সরকার থাকার সময় কংগ্রেসের সদর দফতরেও তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব কম ছিল না। সে কথা মনে রেখে বিধানচন্দ্র রায়, জ্যোতি বসু বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কাদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত, সে নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা করাটা জরুরি— আমাদের নিজেদের স্বার্থেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই মুহূর্তে ক্ষমতায় রয়েছেন, সুতরাং বিধানচন্দ্র রায় বা জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে মানুষ যতটা সহানুভূতির সঙ্গে দেখবেন, মমতার ভাগ্যে হয়তো ততটা সহানুভূতি জুটবে না। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে, সহস্রাব্দের শুরু থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে বাংলার সবচেয়ে প্রভাবশালী মুখটি মমতার। তাঁকে জোটসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য কংগ্রেস ও বিজেপি কাড়াকাড়ি করেছে; তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়ে থাকার সময়ে বাংলার ভাগে বরাদ্দ একটু বেশিই জুটেছে; এবং চৌত্রিশ বছর পর বামপন্থীদের ক্ষমতাচ্যুত করে মমতা আন্তর্জাতিক খবর হয়েছেন। গোটা ভারতে এহেন সাফল্য ক’জন রাজনীতিক পেয়েছেন?

ঐতিহাসিক সাফল্যের নিরিখে একটি দলকে দশকের পর দশক ক্ষমতায় রেখে দিলে যে ভুগতে হয়, সে শিক্ষা আমরা পেয়েছি। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাস এটাও শেখায় যে, অপরিপক্ব নেতার হাতে ক্ষমতাভার গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। বঙ্গ বিজেপি কাকে মুখ্যমন্ত্রী পদে দেখতে চায়, তা এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু যাঁদের নাম উঠে আসছে, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর প্রচুর মিল। বাংলার এই নেতাদের মতো বিপ্লব দেবও ছিলেন সঙ্ঘ-প্রচারক। সঙ্ঘের আশীর্বাদেই তাঁর মসনদপ্রাপ্তি। কিন্তু সঙ্ঘসেবা আর রাজ্যচালনা যে এক জিনিস নয়, সে কথা ত্রিপুরার মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। ত্রিপুরার গ্রামীণ বেকারত্ব এখন দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কেন্দ্র এবং রাজ্যে এক দল থাকা সত্ত্বেও ত্রিপুরার হাল ক্রমে খারাপ হচ্ছে। দুর্ভাগ্য অবশ্য শুধু পূর্বাঞ্চলেরই নয়। উত্তরপ্রদেশের অবস্থা দেখুন। ভারতের সর্ববৃহৎ রাজ্য, সেখানেও কোভিড শুরু হওয়ার আগে থেকেই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ক্রমেই কমেছে। মুখ্যমন্ত্রী ব্যস্ত থেকেছেন গোশালার উন্নয়নে। সংখ্যালঘু এবং দলিতদের নির্যাতন, বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের উপর অত্যাচার, বাক্‌স্বাধীনতা হরণ, এ সব কথা ছেড়েই দিলাম।

ত্রিপুরা থেকে উত্তরপ্রদেশ, অধিকাংশ বিজেপি শাসিত রাজ্যে এই হাঁড়ির হাল কেন? মুখ্য কারণ হল, রাজ্যগুলির নিজস্ব নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা না থাকা। অভিজ্ঞতাহীন, রাজনৈতিক পুঁজিহীন, সম্পূর্ণ ভাবে দিল্লির মুখাপেক্ষী মুখ্যমন্ত্রীরা ‘নাম কা ওয়াস্তে’ ক্ষমতায় থাকলে যা হওয়ার, তা-ই হয়েছে। ঘরের মানুষদের কাছে হয়তো দাপট প্রচুর, কিন্তু টিকিটি পুরোপুরি বাঁধা দিল্লির কাছে। পশ্চিমবঙ্গেও এর অন্যথা হওয়ার কোনও কারণ দেখি না।

রাজ্য রাজনীতিতে ‘বহিরাগত’ শব্দটি ঘিরে প্রচুর আলোচনা চলছে। বাংলায় বিজেপির প্রতিটি সভা, প্রতিটি পদযাত্রা দেখলেই বোঝা যাবে, কেন্দ্রীয় নেতাদের বাদ দিয়ে রাজ্য নেতৃত্ব এক পা চলার কথা ভাবতে পারেন না। তাঁরা ক্ষমতায় এলে এই নির্ভরতা বাড়বে বই কমবে না। রাজ্যকে কমজোরি করে তোলার এই প্রক্রিয়াটি একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। গত একটি বছর ধরে বিজেপি ডাক দিয়েছে ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’-এর। যে নীতি বাস্তবায়িত হলে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোটিই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এবং তার ধাক্কা এসে পড়বে আমাদের বাঙালি সত্তার উপরেও। তালাপাতার সেপাইরা ক্ষমতায় থাকলে, বিপন্ন হবে বাঙালির ভাষা থেকে বাঙালির পুঁজি। বাঙালির অর্থনৈতিক পুঁজি এমনিতেই নেই, আপাতত সম্বল শুধু রাজনৈতিক পুঁজি। সেটিও চলে গেলে দেউলিয়া হওয়া ছাড়া গতি নেই।

কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি, ইংল্যান্ড

Advertisement