ইতিহাসের পর এই বার বিজ্ঞানের পালা। বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার সহিত যাঁহারা যুক্ত আছেন, এই বার তাঁহাদের স্থির করিবার পালা, এত কাল ধরিয়া বিজ্ঞান বলিতে যাহা জানিয়া আসিয়াছেন, সেই সমস্ত ধুলায় মিশাইয়া মোদীতন্ত্রের প্রচারিত গালগল্পগুলিকে বিজ্ঞান বলিয়া পড়িতে এবং পড়াইতে তাঁহারা রাজি কি না। কৌরবদের জন্মরহস্য, গণেশের মস্তকরহস্য— ইত্যাদিকে তাঁহারা বিজ্ঞান পাঠ্যক্রমে কতটা গুরুত্ব দিতে রাজি। অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নাগেশ্বর রাও একা নন, কেবল বিজ্ঞান কংগ্রেসে উপস্থিত ‘পণ্ডিত’বর্গই নন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং নিজের মুখে বিষয়গুলিকে প্রচার করিবার দায়িত্ব লইয়াছেন। বিজ্ঞান কংগ্রেসে এই বৎসর আর সব ছাড়িয়া এই আশ্চর্য ‘ভারতীয়’ উদ্ভাবন লইয়া একের পর এক সেশন অনুষ্ঠিত হইতেছে, এবং সেই সব সেশনে চমকপ্রদ তথ্য উপস্থিত সকলের চক্ষু কপালে তুলিতেছে। উপস্থিতির হার যাহাতে কমিয়া না যায়, তাহা নিশ্চিত করিতে আয়োজক বিশ্ববিদ্যালয়টি নিজের ছাত্রছাত্রীদের হাতে হাতে পরবর্তী সিমেস্টারের জন্য অতিরিক্ত ক্রেডিট এবং উপস্থিতির প্রমাণপত্র বিলাইবার বন্দোবস্তও করিতেছে। বাঘা বাইনের ভাষা ধার করিয়া বলা যায়, ব্যবস্থা ভালই। এই পরিবেশ যে জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চার জন্য অতিশয় অনুকূল, তাহা আর বলিবার অপেক্ষা করে না। বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসন দেশের সমাজ ও অর্থনীতির অঙ্গনে অসংখ্য দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখিয়া যাইতেছে। তন্মধ্যে এই মিথ নামক মিথ্যাজ্ঞানচর্চাকে অন্যতম প্রধান হিসাবে ধরিতে হইবে। কাহাকে বিজ্ঞান বলে, আর কাহাকে ইতিহাস— দেশবাসীকে তাহা ভুলাইয়া দিবার জন্য যে ব্যাপক হিন্দুত্ববাদী আয়োজন চলিতেছে, তাহার মূল্য সম্ভবত ভারতকে একাধিক প্রজন্ম ধরিয়া বহন করিতে হইবে।

এত দিন ধরিয়া যাহা ছিল বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন প্রয়াস, এই বৎসরের বিজ্ঞান কংগ্রেস তাহাকে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদায় ভূষিত করিল। বিজ্ঞানচর্চার অন্দরের লোকরা বহু দিনই বিজ্ঞান কংগ্রেস বিষয়ে লঘু ধারণা পোষণ করেন, কেননা সেখানে প্রধানত সরকারি দাক্ষিণ্যের বিতরণ ঘটে, এবং সরকারি প্রসাদের মুখাপেক্ষীদের সমাগম দেখা যায়। কিন্তু সরকারি প্রসাদ বলিতে যখন বিজ্ঞানের নামে অবিজ্ঞানচর্চা, মিথের নামে মিথ্যার বেসাতি, তখন স্বভাবতই অনৈতিকতা অন্য মাত্রায় উঠিয়া যায়। এই বলয়ের বাহিরে যাঁহারা আছেন, লজ্জা ও গ্লানিতে তাঁহারা ইতিমধ্যেই প্রতিবাদ মিছিল বাহির করিয়াছেন, স্লোগানে প্ল্যাকার্ডে নিজেদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করিতেছেন। কিন্তু প্রতিবাদ কেবল মৌহূর্তিক বিষয় নয়। প্রতিবাদ একটি ধারাবাহিক প্রতিঘাত না হইলে কাজ হয় না। একমাত্র তবেই গণেশ-মার্কা গালগল্পকে বিজ্ঞানের গণ্ডির বাহিরে বহিষ্কার করা সম্ভব। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের মুখোশধারী অবিজ্ঞানের মধ্যে যুদ্ধটি অত্যন্ত গুরুতর, ইহার গতিপ্রকৃতি ও ফলাফল নির্ভর করিতেছে প্রতিবাদীদের কর্মকাণ্ডের উপরই।

বিজ্ঞানীদের বাহিরে যে বৃহত্তর নাগরিক সমাজ, তাহারও বিরাট দায়িত্ব। স্বাধীনতার পর পরই যে দেশ স্বল্প মূলধনে, বহু প্রতিকূলতার মোকাবিলা করিতে করিতে বিজ্ঞানচর্চায় সামগ্রিক আত্মনিয়োগ করিয়াছিল, দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহে ও তত্ত্বাবধানে কিছু অসামান্য প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিয়াছিল, এবং নিতান্ত অল্প সময়ের মধ্যে সেই সকল প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বের মানচিত্রে সম্মানস্থানে আনিয়া দিয়াছিল, আজ তাহা অদৃষ্টের পরিহাসে গোটা বিশ্বের রসিকতার লক্ষ্য। সুতরাং, কেবল স্মরণ নহে। পুরানো সম্মান কর্পুরের মতো উবিয়া যাইবার আগে তাহার কিছুমাত্র রক্ষা করা যায় কি না, তাহা দেখিতে হইবে। পাণ্ডব-কৌরব রাম-রাবণ দিয়া রাজনীতি হইলে হউক, বিজ্ঞান বা ইতিহাস বলিয়া তাহাদের গৌরবায়ন চলিতে পারে না।